হোমুনোলাস : এই জলজগতে যা কিছু দেখছি তাই সুন্দর দেখাচ্ছে।
প্রোতিয়াস : এই আর্দ্র জলজগতেই তোমার জীবনদীপ থেকে সুন্দর ধ্বনি উত্থিত হচ্ছে।
নেরেউস : নৃত্যরত এই জনতার মধ্য হতে কি এক রহস্য উঘাটিত হচ্ছে আমাদের চোখের সামনে? রানির পায়ের কাছে কি এক অগ্নিশিখা জ্বলছে আর নিবছে। মনে হচ্ছে প্রেমের চপলমতি আবেগের দ্বারা দীপ্ত ঐ অগ্নিশিখা।
থেলস্ : ও হচ্ছে হোমুনোলাস। প্রোতিয়াস ওকে ভুল পথে নিয়ে গেছে। ঐ প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা হলো ওর অন্তরের জ্বলন্ত কামনার ব্যাকুলতা। রানির সিংহাসনের কাছে অধৈর্য হয়ে আবেদন জানাচ্ছে। কিন্তু ও চলে যাচ্ছে বলে আলোটা নিভে যাচ্ছে।
সাইরেনরা : নৈশ সমুদ্রতরঙ্গের মাঝে আলোর কি চমৎকার খেলা! হে অনন্ত সমুদ্রের আলোক-পরিবৃত্ত অগণ্য তরঙ্গমালা, হে অনন্ত জলরাশি, তোমরা আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করো। হে ক্ষিতি, অফ, মরুৎ, তেজ নামধারী শক্তি-চতুষ্টয়, তোমাদের প্রণাম।
তৃতীয় অঙ্ক
স্পার্টা। মেনেলাসের রাজপ্রাসাদ
বন্দিনী ট্রয়রমণীদের কোরাসসহ হেলেনার প্রবেশ ।
হেলেনা : বহু প্রশংসিত ও বহু নিন্দিত আমি হেলেনা দূর বিদেশ হতে পসেডনের কৃপায় অসংখ্য সমুদ্রতরঙ্গে প্রবলভাবে দোলায়িত হবার পর অবশেষে স্বদেশের উপকূলে এসে উঠেছি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আনন্দে আত্মহারা হয়ে নিচে দাঁড়িয়ে আছেন বীর যোদ্ধা মেনেলাস। সে উন্নত প্রাসাদ, তোমাকে একদিন আমার পিতা টিন্ডারাস প্যালাস পর্বত হতে ফিরে এসে নির্মাণ করেন এবং তোমার মাঝেই আমি একদিন ভগিনীসম ক্লাইতেমেস্ত্রে, ক্যাস্টর ও পোলাক্সের সঙ্গে খেলাধুলা করে দিন দিনে বেড়ে উঠি। আজ আমাকে গ্রহণ করো। একদিন মেনেলাস এই প্রাসাদেই আমাকে বধূরূপে বেছে নেন। তারপর এক দস্যু সুদূর ফার্জিয়ায় অপহরণ করে নিয়ে যায় আমাকে। তারপর হতে সে অভিশপ্ত দুর্ঘটনা ঘটে যায় তা নিয়ে এক বিরাট রূপকথা গড়ে ওঠে।
কোরাস : হে সুন্দরী, যে অতুলনীয় সৌন্দর্যরূপসম্পদ তুমি লাভ করেছ তা অবহেলা করো না। কারণ সবচেয়ে বলদর্পিত বীরও এই সৌন্দর্যের কাছে নত হয়ে আত্মসমর্পণ করে।
হেলেনা : যাক। এখন আমার স্বামী তাঁর নগরে নিয়ে যাবার আগে জাহাজে করে এখানে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য কি তা এখনও বুঝতে পারিনি আমি। আমি কি শুধু তাঁর স্ত্রী হয়েই থাকব না রানি হব আবার? অথবা সমগ্র গ্রীকদেশে আবার সুদীর্ঘকাল ধরে যে দুঃখ-বিপর্যয় ভোগ করে তার জন্য আমাকে বলি দেবেন? আমার জগৎজোড়া সৌন্দর্যের খ্যতি ও আমার নিয়তিকে এক করে তার ভুল অর্থ করে আমাকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকেন আমার স্বামী। স্বদেশে ফেরার পথে জাহাজে আমার সামনে বসে থেকেও একটা কথাও বলেননি আমার সঙ্গে। অবশেষে ইউরোতাসের উপকূলে জাহাজ থামলে তিনি আমাকে বললেন, আমি আমার যোদ্ধাদের নিয়ে এখানেই নেমে পড়ছি। এই জাহাজে করে তুমি ল্যাসিডিমনের সমভূমিতে অবস্থিত প্রাসাদে গিয়ে ওঠ। পরে আমি সেখানে যাব। সেখানে দাস-দাসীরা আমার ও তোমার পিতার দেওয়া সঞ্চিত ধনসম্পদ রক্ষা করে রেখেছে। সেখানে সব কিছুই ভোগ করতে পাবে।
কোরাস : সেই সব সঞ্চিত ধনরাশি ভোগ করো এখন। তুমি প্রাসাদের অভ্যন্তরে গিয়ে দাসদাসীদের কাছে গিয়ে বলো। অমূল্য রত্নরাজিতে মণ্ডিত হয়ে উঠুক তোমার দেহসৌন্দর্য।
হেলেনা : আমার স্বামী তারপর গম্ভীরভাবে নীরসভাবে আরও বলেন, সব ধনরত্ন দাসীদের কাছ থেকে বুঝে নিয়ে দেবপূজার জন্য নির্দিষ্ট পাত্রগুলো নিয়ে ঝর্না থেকে পবিত্র জল নিয়ে আসবে। শুকনো জ্বালানি কাঠ ও তীক্ষ্ণ একটি ছুরি ঠিক করে রাখবে। কিন্তু তিনি পূজার বলির জন্য কোনও পশুর কথা বললেন না। আমি কিছু বুঝতে পারছি না। সব দেবতার বিধানের উপর ছেড়ে দিচ্ছি। দৈব বিধানে যা হবার হবে। আমাদের তা সহ্য করতেই হবে। অনেক সময় বলির উপর উদ্যত খড়গ কোনও শত্রু বা দেবতার হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হয়ে যায়।
কোরাস : হে রানি, কে হবে না হবে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করবেন না। সাহস অবলম্বন করুন। আশীর্বাদ ও অভিশাপ অপ্রত্যাশিতভাবেই আসে মানুষের জীবনে। যুদ্ধ, ট্রয়নগরীর ধ্বংস, মৃত্যুর বিভীষিকা প্রভৃতির কথা কিছুই জানতে চাই না আমরা। আপনার মতো একজন জগতের শ্রেষ্ঠ রূপবতী ও দয়াবতী রমণীর সাহচর্যে আমরা ধন্য। মুক্ত আকাশের তলে প্রদীপ্ত সূর্যালোক উদ্দীপিত আপনার দেহসৌন্দর্য অবলোকন করে আমরা তৃপ্ত।
হেলেনা : যা ঘটে ঘটুক। অবিলম্বে আমি প্রাসাদে যাব। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় কেন ভয় হচ্ছে আমার? শৈশবে যে সহজ নির্ভীকতার সঙ্গে আমি এখানে ওঠানামা করতাম আজ তা খুঁজে পাচ্ছি না কেন?
কোরাস : হে আমার প্রিয় বোনেরা, দুঃখিনী বন্দিনী, সব দুঃখ ঝেড়ে ফেলো। তোমাদের যে রানি হেলেনা দীর্ঘকাল পরে তাঁর পিতৃগৃহে প্রবেশ করছে, তার আনন্দে অংশগ্রহণ করো। তোমাদের মুক্তিদাতা দেবতাদের ধন্যবাদ দাও। নিজেদের দুর্গপ্রাকারে যে বন্দিনী একদিন উদ্বাহু হয়ে মুক্তি কামনা করতেন আজ তিনি মুক্তপক্ষ বিহঙ্গের মতো উড়ে এসেছেন আনন্দে। আসলে এক দেবতাই তাকে ছিন্নমূল করে ধরে নিয়ে যায় এবং আজ তাঁকে এই প্রাচীন অথচ অধুনা অলঙ্কৃত পিতৃগৃহে এনে দিয়েছে। তাঁর যৌবনদিনের অকথ্য অশেষ দুঃখবেদনার অবসান ঘটেছে।
