সাইরেন : তোমাদের এখন হেলিয়ম যেতে হবে। উজ্জ্বল দিন আসবে। চাঁদের উপাসনা সার্থক হবে।
টেলশিনেরা : হে সুন্দরী চন্দ্রদেবী, তোমার ভাই আকাশে উদিত হবার সঙ্গে সঙ্গে তার উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সর্বত্র। গ্রাম, নগর, পাহাড়, প্রান্তর, নদী সমুদ্র সব আলোকিত হয়ে ওঠে সে আলোয়। সব দ্বীপপুঞ্জগুলি কুয়াশামুক্ত হয়। তখন ফীবাসের যৌবনোজ্জ্বলমূর্তি পরিদৃশ্য হয়। আমরাই প্রথম স্বর্গস্থ দেবতাদের মানুষের আকারে দেখার জন্য সাধনা শুরু করি।
প্রাতিয়াস : ওদের বড়াই করতে দাও, দেবতাদের গুণগান করতে দাও। সূর্যালোক থেকে সব প্রাণের উদ্ভব হয় স্বীকার করি। কিন্তু সারা জীবন ধরে মানুষ যা কিছু সৃষ্টি করে তা সব ক্ষণস্থায়ী। তা সব তুচ্ছতায় বিগলিত হয়ে যায়। এমনকি কঠিন ব্রোঞ্জনির্মিত মূর্তিও ভূমিকম্পে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। মানুষের সব শ্রমই পণ্ড হয় একদিন। একমাত্র এই সমুদ্রই তোমাকে দান করতে পারে এক উন্নত জীবন। (প্রোতিয়াস নিজেকে এক বিরাট রঙিন মাছে রূপান্তরিত করল) আমার পিঠের ওপর চাপো। আমি তোমাকে প্রাচীন সমুদ্রদেবতার কাছে নিয়ে যাব।
থেলস্ : ওঁর কথা শোনো। সেখানে যাও। অসংখ্য রূপের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়ে তুমি একদিন মানুষের আকার ধারণ করবে। প্রথম মানুষ হিসাবে সৃষ্ট হবে।
হোমুনোলাস প্রোতিয়াসের পিঠের উপর চাপল
প্রোতিয়াস : বিদেহী আত্মারূপে তুমি অনন্ত জলরাশির সঙ্গে ছড়িয়ে থাকবে। তুমি হবে স্বাধীন, অবাধ এবং চিরমুক্ত। এর বেশি কিছু চেও না। মানুষের আকার একবার পেলেই অসংখ্য বাধা আর অপরিপূর্ণতায় আবদ্ধ হয়ে পড়বে তুমি।
থেলস্ : তবু সবাই তাই চায়। মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে মহত্ত্ব লাভ করতে চায়।
প্রোতিয়াস : তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দীর্ঘদিন বাঁচে। যেমন তোমাকে দেখছি। কয়েক শত বছর ধরে বাঁচতে।
সাইরেনরা : (পাহাড়ের উপর থেকে) দেখো দেখো। চাঁদকে ঘিরে কেমন ছোট ছোট মেঘখণ্ডগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। ওরা যেন প্রেমের তাড়নায় উড়ে বেড়ানো লঘুপক্ষ কপোত। আমাদের উৎসবটা মুখর হয়ে উঠবে আনন্দে।
নেবেউস : তোমরা যাই ভাব, ওরা আসলে বনকপোতের দল। এক আশ্চর্য আবেশে ওরা আমার কন্যার রথের চারপাশে ভিড় জমায়।
শিল্পী ও মার্সি (জলজ জন্তুর দল) : সাইপ্রাসের উপকূলের কাছে গভীর সমুদ্রগর্ভে আমরা জলদেবী সাইপ্রিসের রথটিকে সযত্নে রক্ষা করে চলেছি। এবং রাত্রিকালে সেটিকে ঢেউ-এর উপর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাই। ঈগল অথবা পাখাওলা উড়ন্ত সিংহ অথবা কোনও প্রলয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ভয় করি না আমরা।
সাইরেনরা : হে নেরেউস পরীরা, চক্রাকারে নাচতে নাচতে এসে আমাদের ঘিরে ফেলল। ডোরাইদরাও এস, আদিমাতা গ্লেটিয়াসকে নিয়ে এস। তিনি হচ্ছেন মানবিক মাতার মতোই স্নেহময়ী।
ডোরাইদরা : হে চন্দ্রদেবী, আমাদের আলো দাও, ছায়া দাও। আমাদের যৌবনসৌন্দর্যকে কুসুমিত করো। আমাদের প্রিয়তম সাথীদের আমরা নিয়ে এসেছি পিতৃপুরুষের কাছে প্রার্থনা করার জন্য। (নেরেউসের প্রতি) এই সব যুবকদের আমরা সমুদ্রতরঙ্গের ভয়ঙ্কর কবল হতে রক্ষা করেছি। যত সব জলজ আগাছা আর শ্যাওলার উপর তারা শুয়েছিল। আজ তারা জীবন ফিরে পেয়েছে। নিবিড় চুম্বনের দ্বারা তারা কৃতজ্ঞতা জানাবে আমাদের। সে দেবী, তুমি তাদেরও দয়া করো।
নেরেউস : তোমরা দুদিক থেকে লাভবান হলে। তোমাদের উপকারের প্রতিদান হিসাবে কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ দুই-ই পেলে।
নেরেউস : যা পেয়েছ তা দিয়ে আনন্দ করো। কিন্তু আমি তোমাদের কোনও বর দিতে পারব না। তা সে বর একমাত্র দিতে পারেন জিয়াস। এই তরঙ্গায়িত সমুদ্রে কোনও প্রেম কখনও দাঁড়াতে পারে না। ওদের প্রতি তোমাদের আসক্তি কমে গেলে ওদের স্থলভাগে পাঠিয়ে দাও।
ডোরাইরা : হে সুন্দর যুবকগণ, তোমাদের ছেড়ে দিতে হবে। তবু শপথ করে বলছি তোমাদের আমরা ভালোবাসি। আমরা চিরন্তন সত্যকে চাই। কিন্তু দেবতারা আমাদের তা দেবেন না।
যুবকরা : আমরা এই মৎস্যজীবী যুবকরা তোমাদের প্রেমের প্রতিদানস্বরূপ চিরদিন তোমাদের ভালোবেসে যাব। আমরা নূতন জীবনের আস্বাদ পেয়েছি যা আগে কখনও পাইনি। (রথের উপর গ্নেটিয়ার আবির্ভাব)
নেরেউস : হে আমার প্রিয় কন্যা, এসেছ?
গ্লেটিয়া : হে পিতা, আজ কী আনন্দ! হে বর্ণালী মৎস্যকনারা থামো। নাচো।
নেরেউস : তারা এইমাত্র চক্রাকারে নাচতে নাচতে চলে গেল। অন্তরের গভীরতম অনুভূতির কোনও খবর রাখে না তারা। তারা একবার যদি আমাকে সেখানে নিয়ে যেত। আনন্দের বস্তু একবার দেখে আমি সারাজীবনের নীরস নিরানন্দ দিনগুলো ভুলতে পারতাম।
থেলস্ : আমি বড় আনন্দ অনুভব করছি অন্তরে। আজ আমি সত্য ও সৌন্দর্যের পূর্ণ মিলন দেখছি স্বচক্ষে। জল থেকেই হয় এ বিশ্বের সৃষ্টি। জলই সবকিছু বাঁচিয়ে রাখে। হে সমুদ্রমাতা, যদি তুমি মেঘাকর্ষণ না করো তাহলে নদীগুলো জলপূর্ণ হবে না, তাহলে কোনও কিছুই বাঁচবে না।
নেরেউস : এখনও ঘুরে ঘুরে নাচছে তারা। তবে তার মুখোমুখি নেই তারা প্রেমিকদের সঙ্গে। গ্লেটিয়ার রথটা এখন দূরে নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে। প্রকৃত ভক্তি ও ভালোবাসা এমনি করে উজ্জ্বল তারকার মতো দূরে ও নিকটে জ্বলজ্বল করতে থাকে।
