ফোর্কিয়াদরা : এই প্রেতটার বুদ্ধি আছে।
মেফিস্টোফেলিস : আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি কোনো কবি তোমাদের গুণগান করেনি। করবেই বা কি করে? তোমাদের রূপের কোনও ছবি নেই, কোনও প্রতিমূর্তি নির্মিত হয়নি অন্যান্য দেবদেবীদের মতো।
ফোর্কিয়াদরা : স্তব্ধনিবিড় নির্জনতায় ঢাকা এই অন্ধকার গুহায় যুগ যুগ ধরে পড়ে আছি আমরা। ওসব কিছু ভাবতেই পারি না।
মেফিস্টোফেলিস : তাহলে কি করে কি হবে? এখানে তোমরা কাউকে দেখতে পাবে না। কেউ তোমাদের দেখতে পাবে না। তোমরা এমন কোথাও উঠে যাও যেখানে আছে শিল্প আর সমৃদ্ধি। সেখানে তোমাদের মূর্তি নির্মিত হবে।
ফোর্কিয়াদরা : থামো থামো। স্বপ্ন জাগিও না। আমদের মনে। কি লাভ তাতে? আমরা অন্ধকারের জীব অন্ধকারেই থাকতে চাই চিরকাল। আমরা নিজেদের ভালো করে চিনি না। অপরকেও চিনতে চাই না।
মেফিস্টোফেলিস : তোমাদের আমি একটা চোখ আর একটা দাঁত দিতে পারি। তোমাদের তিনটে মাথা তা ভাগ করে নেবে।
ফোর্কিয়াদরা : তুমি একটা চোখ বন্ধ করো।
মেফিস্টোফেলিস : তাই করলাম। এবার আমাকে দেখো। ঝগড়া বিশৃঙ্খলার অধিষ্ঠাত্রী দেবীর একচক্ষু পুত্র আমি।
ফোর্কিয়াদরা : আর আমরা তার কন্যা। আমাদের তিনজনের একটামাত্র চোখ ছিল, এখন হয়েছে দুটো। দুটো দাঁত। কি সুন্দর লাগছে সব কিছু।
মেফিস্টোফেলিস : এ রূপ আর কাউকে দেখাব না। একেবারে নরকে গিয়ে শয়তানদের ভয় দেখাব। (প্রস্থান)।
চতুর্থ রাত্রি
ঈজিয়ান সাগরের তীরবর্তী পার্বত্য গুহা
আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছিল
সাইরেনরা : এর আগে তাদের কৃষ্ণকুটিল যাদুবিদ্যাদ্বারা বদমাশ থেসালীয় বুড়ির অসৎ উদ্দেশ্যে তোমাকে নিচের দিকে টানতে থাকে। তার জন্য তুমি বেঁকে গেছ ধনুকের মতো। তোমার বুকে কত কুঞ্চনরেখা দেখা দিয়েছে। কিন্তু সুন্দরী চাঁদ, আর ভয় নেই। এবার অবাধে বিচ্ছুরিত করো তোমার কিরণমালা।
নেরেইদরা ও ট্রিটনরা : আরও উচ্চরবে গান গেয়ে সমুদ্রের গভীরতম প্রদেশের জীবদের ডাক। যখন প্রবলবেগে ঝড় বইতে থাকে তখন আমরা সমুদ্রের গভীরে চলে যাই। আমরা সেখানে গান গাই, মণি-মাণিক্য ও রত্নরাজির দ্বারা ভূষিত কবি নিজেদের। এই রত্নরাজি হলো জলমগ্ন জাহাজের ভেসে যাওয়া সম্পদ।
সাইরেনরা : সমুদ্রের শান্তশীতল জলতলে কত রকমের মাছ খেলা করে। কিন্তু তোমরা মাছের থেকে ভিন্ন এক প্রাণী।
নেরেইদরা ও ট্রিটনরা : এখানে আসার আগে আমরা এ ব্যাপারটা অনেক চিন্তা করেছি। ভেবেছি আমরা কারা? হে আমাদের প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আরও দুরে চলো। দেখিয়ে দাও তোমরা মাছের থেকে ভিন্ন কোনও জীব। (প্রস্থান)
সাইরেনরা : ওরা পালিয়ে গেছে এখান থেকে সামোগ্রেসে। অনুকূল বাতাস ওদের সাহায্য করেছে। ওরা সেখানে কি করবে কে জানে? আশ্চর্য দেবতা ওরা। ওরা নিজেদের বার বার নূতন করে গড়ে তোলে। কিন্তু নিজেদের দেহ ওরা দেখতে পায় না। হে চাঁদ, মধ্য আকাশে তুমি স্থির হয়ে কিরণ দিতে থাকো। যেন এ রাত্রি এখন শেষ না হয়, যেন দিনের আলোর তীক্ষ্ণ তাড়না অনুভব না করি।
থেলস (হোমুনোলাসকে) : আমার ইচ্ছা আমি তোমাকে প্রাচীন নেরেউসের কাছে নিয়ে যাই। তার আস্তানা থেকে আমরা খুব দূরে নেই। সে বড় একগুয়ে। বদমেজাজই তার একমাত্র ঘৃণ্য রোগ। এই ধরনের লোকদের কেউ সন্তুষ্ট করতে পারে না। ভবিষ্যতের কথা বলতে পারে বলে লোকে শ্রদ্ধা করে এবং অনেকে অনেক উপকারও পেয়েছে তার কাছ থেকে।
হোমুনোলাস : তাহলে আর দেরি বা দ্বিধা না করে তার কাছে চলো। কাঁচের জারে আমার আগুন এখনও নিভে যায়নি।
নেরেউস : আমি আমার কানে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনছি না? সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধ জাগছে আমার মধ্যে। ঐ সব মানুষগুলো ছোট হয়ে দেবতার মতো আকাশচুম্বী উচ্চাশায় মত্ত হয়ে ওঠে। প্রাচীনকালে আমি সৎ ব্যক্তিদের কিছু উপকার করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু পরে দেখলাম আমার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
থেলস্ : হে সমুদ্রসংলগ্ন প্রবীণতম ব্যক্তি, আমরা তোমাকে শ্রদ্ধা করি। তুমি বিজ্ঞ, আমাদের নিরাশ করে তাড়িয়ে দিও না। মানুষের আকার ধারণকারী এই অগ্নিপুঞ্জকে দেখো। এ তোমার কাছে কিছু পরামর্শ চায়।
নেরেউস : কি পরামর্শ? মানুষ সৎ পরামর্শকে শ্রদ্ধা করেছে? অমনোযোগীর কানে জ্ঞানের কথা বৃথাই ঝরে পড়ে। মানুষ আগের মতোই স্বেচ্ছাধীন রয়ে গেছে। তারা যা খুশি তাই করে চলে এক বিদেশী নারীর কামনায় মত্ত হয়ে ওঠার আগে প্যারিসকে আমি সাবধান করে দিয়েছিলাম। সে যখন গ্রীসদেশে পা দিয়েছিল তখন তাকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। আমি তখন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম, অশেষ দুঃখের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম অসংখ্য নরহত্যা, অগ্নিকাণ্ড ও ট্রয়নগরীর ধ্বংসের কথা যা শুনে হাজার বছর ভয়ে শিউরে উঠবে পৃথিবীর মানুষ। আমার কথা খেলাচ্ছলে উড়িয়ে দেয় সে। স্বাধিকার প্রমত্ত প্যারিস নিজের কামনার দাস হয়ে ছুটে চলে তার পিছনে; ফলে পতন ঘটে ইলিয়াম নগরীর। পিন্ডারাসের ঈগলরা উল্লসিত হয়ে ওঠে নরমাংসের ভূরিভোজে ইউলিসিসকেও আমি যাদুকরী ও ক্যালিপসোর কথা বলে সাবধান করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতেও কোনও ফল হয়নি তার। অবশ্য পরে সে দেশে অতি কষ্টে প্রত্যাবর্তন করে।
থেলস্ : এই ধরনের হঠকারী আচরণ বিজ্ঞ লোকের সত্যই বেদনার কারণ হয়ে ওঠে। তবু যারা সদাশয় ব্যক্তি তারা পরোপকার করে থাকেন। অমিত অকৃতজ্ঞতার মাঝে বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতাও তাঁদের সব শ্রমকে সার্থক করে তোলে। আমরা যা জানতে চাইছি তা তুচ্ছ ব্যাপার নয়। এই বালকটি পৃথিবীর মাটিতে জন্মলাভ করতে চায়।
