মেফিস্টোফেলিস : তা যদি করতে চাও নিজের চেষ্টায় তা করো। এখানে নরক থেকে যে ভূতের দল আসে তার মধ্যে দার্শনিকদেরও পাবে। কিন্তু কোনও ফল হবে না তাতে। নিজের চেষ্টায় সত্যকে খুঁজে পাবার জন্য কাজ শুরু করে দাও।
হোমুনোলাস : সৎ পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করতে নেই।
মেফিস্টোফেলিস : তাহলে তোমার পথে তুমি চলে যাও। পরে দেখা হবে। (উভয়ের প্রস্থান)
অ্যানাকজাগোরাস (থেলস্কে) : তোমার অনমনীয় মনকে নরম করা গেল না। তুমি বোঝার চেষ্টা করো।
থেলস্ : যে কোনও বাতাসের কাছে বড় বড় ঢেউরা আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু পাহাড় থেকে তারা দূরে থাকে। পাহাড়ের কাছে নত হয় না তারা।
অ্যানাকজাগোরাস : উষ্ণ উত্তপ্ত বাষ্পরাশি থেকেই ঐ সব পাহাড়ের উৎপত্তি হয়।
থেলস্ : আর্দ্রতা বা জল থেকেই জৈব জীবনের উৎপত্তি হয়।
হোমুনোলাস : আমি কি তোমাদের সঙ্গে যেতে পারি? আমি মানুষ হতে চাই।
অ্যানাকজাগোরাস : বলো থেলস্, তুমি কি একরাতের মধ্যেই কর্দমাক্ত জল থেকে ঐ সব পাহাড়গুলো তুলে এনেছ?
থেলস্ : প্রকৃতি ও তার চিরপ্রবহমান শক্তি কখনও দিনরাতি প্রভৃতি কোনও কালখণ্ডের সীমা বা শাসন মেনে চলে না। প্রকৃতি আপন নিয়মে সব বস্তুকে সৃষ্টি করে চলে।
অ্যানাকজাগোরাস : কিন্তু পৃথিবীর গর্ভনিহিত বিরাট আগ্নেয় শক্তি বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে পৃথিবীর বুক ফাটিয়ে অগ্নদগারের সময় ঐ পাহাড়গুলোকে তুলে দেয়।
থেলস্ : কিনতু তার ফলে কি হবে? পাহাড়গুলো তো দাঁড়িয়েই থাকবে। এ বিবাদে শুধূ অনর্থক সময় নষ্ট হয়।
অ্যানাকজাগোরাস : এই সব পার্বত্য অঞ্চলে মার্মিডন, পিগমি, এন্মেটেস, অঙ্গুলিপ্রমাণ ক্ষুদ্রাকার প্রভৃতি কর্মঠ প্রাণীরা বাস করে। তারা সব সময় কর্মব্যস্ত থাকে। (হোমুনোলাসকে) তুমি কখনও বড় হতে চাওনি। আত্মপ্রসাদের মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছ। তুমি তোমার মনকে সংযত করতে পারলে আমি তোমাকে ঐ সব ক্ষুদ্রকায় কর্মঠ মানুষদের রাজা করে দেব।
হোমুনোলাস : কিন্তু থেলস্ কি বলেন?
থেলস্ : আমি এ পরামর্শ দেব না। কারণ ছোট পথে ঘোট কাজই হয়। বড় পথ ছোট মানুষকেও বড় করে তোলে। কারণ ওখানে গোলমাল লেগেই আছে। প্রথমে বড় বড় সারস পাখিরা ঠোঁট দিয়ে ছোট ছোট পিগমিদের ঠোকরাত, পা দিয়ে মাড়াত। তখন পিগমিরা প্রতিশোধ বাসনায় উন্মত্ত হয়ে তীর-ধনুক দিয়ে সারস পাখিদের নির্বিচারে হত্যা করে থাকে। তাদের পালক দিয়ে মাথার শিরস্ত্ৰণ সাজায়। তখন সারস পাখিরা পালিয়ে যায়।
অ্যানাকজাগোরাস : (একটু থেমে) আমি পাতালবাসী কোনও দেবতার শক্তিতে বিশ্বাসী নই। আমি চাই উধ্বতম কোনও দৈবশক্তির সাহায্য। ডায়েনা, লুপ ও হিকেট এই ত্রিনামধারিণী হে চন্দ্রদেবী, তুমি যেমন তোমার স্নিগ্ধ কিরণ-জাল ছড়িয়ে দাও, যেমনি সমস্ত মায়ার আবরণ ত্যাগ করে তোমার প্রাচীন শক্তির স্বরূপ উদ্মঘাটিত করো। (একটু থেমে) আমার কথা কি দেবী শুনতে পেয়েছেন তাঁর কক্ষপথে? আমার আকুল আবেদন কি আকাশে গিয়ে পৌঁছেছে? ঐ দেখো চন্দ্রদেবীর গোলাকার সিংহাসনটা ক্রমশই বড় হয়ে এগিয়ে আসছে, কাছে আসছে। যেন এক বিশাল রক্তবর্ণ অগ্নিগোলক। কিন্তু আর এগিয়ে এসো না। তাহলে এ পৃথিবীর জলভাগ স্থলভাগ সব পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। থেসালীয় পাইথেলেসদের মতো ধ্বংস হয়ে যাব আমরা। কিসের গর্জন শুনতে পাচ্ছি? বক্স না মত্ত প্রভঞ্জন? তবে কি কোনও অন্যায় কথা বলে ফেলেছি? ক্ষমা করো দেবী।
থেলস : এই লোকটি কত কি যে দেখতে পায় ও শুনতে পায়। কিন্তু কি ঘটল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। সময়টা দুর্যোগঘন হলেও চাঁদ মেঘমুক্ত অবস্থায় শান্তভাবে কিরণ দিচ্ছে আগের মতো।
হোমুনোলাস : ঐ দেখো, অদূরবর্তী ঐ গোলাকার সূচল মাথা পাহাড়টায় পলাতক পিগমিরা আশ্রয় নিয়েছে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম চাঁদ থেকে ঐ পাহাড়টা হঠাৎ পড়ে গেল। ঐ পাহাড়টার মধ্যে যারা ছিল সব নিষ্পেষিত হয়ে গেল।
থেলস্ : চুপ করো। যাও, তুমি সমুদ্রে যাও, এখানে তোমার স্থান হবে না। তুমি পিগমিদের রাজা বা প্রশাসক হওনি ভালোই হয়েছে। (সকলের প্রস্থান)।
মেফিস্টোফেলিস : (পাহাড়ের উল্টোদিকে উঠে) ওক গাছে ঘেরা এই খাড়াই পাহাড়টায় আমাকে কি উঠতে হবে?
ড্রায়েদ : শান্ত হও। এখানেই ভালো থাকবে। অন্য কোথাও তুমি আর কোনও চাতুর্য দেখাতে পারবে না। আর বাড়ি যেতে চেয়ো না। এখানে এই সব সুপ্রাচীন ওক গাছের মাঝে থেকে যাও। তাদের শ্রদ্ধা করো।
মেফিস্টোফেলিস : প্রয়োজনই কোনও স্থানকে স্বর্গ করে তোলে। কিন্তু অদূরে ঐ গুহার মধ্যে কি এক অদ্ভুত আকারের বস্তু রয়েছে বোঝা যাচ্ছে না।
ড্রায়েদ : ওরা হচ্ছে ফোর্কিয়ারা। সাহস থাকে তো যাও তাদের কাছে। কথা বলো ওদের সঙ্গে।
মেফিস্টোফেলিস : কেন যাব না? অবশ্য স্বীকার করছি ওদের দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। এখন কুৎসিত জীব আমি কখনও দেখিনি। নরকেও আশা করা যায় না। এই সুন্দর গ্রীসদেশে এমন জীব বেমানান। আমাকে দেখে বাদুড়ের মতো ওরা কিচমিচ করছে। প্রাচীনতার জন্য তাদের খ্যাতি আছে এখনও।
ফোর্কিয়াদরা : কই আমাকে একটা চোখ দাও তো। দেখি কে আমাদরে মন্দিরে এল।
মেফিস্টোফেলিস : হে ত্রিমূর্তিধারিণী দেবীরা, তোমরা তিনমুখে আমার আশীর্বাদ করো। আমি দূর অজানা দেশ থেকে আসছি। আমি বহু দেবদেবী দেখেছি ওপসরীয়া প্রভৃতি বহু জায়গায়। তোমাদের মতো কোনও দেবী কোথাও দেখিনি।
