শিরণ : তোমার মন্দির আজও তোমাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ম্যান্টো : এখনও সমান গতিতে ছুটে চলেছ তুমি?
শিরণ : তুমি যখন শান্ত হয়ে বসে থাকো, আমি তখন চঞ্চল গতিতে ছুটে চলার মধ্যে আনন্দ পাই।
ম্যান্টো : আমি বসে বসে প্রতীক্ষা করি আর আমার চারদিকে অশান্ত কালের ঢাকা আবর্তিত হয়। কিন্তু এ কে?
শিরণ : আজকের রাত্রির ঘূর্ণাবর্তে ও তোমার কাছে এসে পড়েছে। ও হেলেনার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। তাকে ও লাভ করবেই। কিন্তু কোথায় কিভাবে তাকে পাবে তা জানে না। তবে ও তার সত্যিই যোগ্য।
ম্যান্টো : সে অসম্ভবকে কামনা করে আমি তাকে ভালোবাসি।
শিরণ : হে হঠকারী এগিয়ে এস। ভবিষ্যতের এক সুখসম্ভার প্রতীক্ষায় আছে তোমার জন্য। এই অন্ধকার পথ তোমাকে নিয়ে যাবে পার্সিফোনোতে। অলিম্পাস পাহাড়ের সানুদেশে সে প্রতীক্ষায় থাকবে। একবার অতীতে আমি অর্ফিয়াসকে লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম সেখানে। সাহসের সঙ্গে ভাগ্য পরীক্ষা করো। (অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে নামল)
তৃতীয় রাত্রি
পেলেউসের উত্তরাঞ্চল (আগের মতো)
সাইরেনরা : পেলেউস নদীর শীতল তরঙ্গমালায় অবগাহন করো। জলকেলি করো। স্তোত্রগান হচ্ছে। কত হতভাগ্যদের উদ্ধার করি আমরা। জল ছাড়া জীবনের কোনও অর্থ হয় না। নীল ঈজিয়াস সাগরের ঢেউ-এর আরও আনন্দ আছে। আছে আরও উজ্জ্বলতা। (ভূমিকম্প) একি, নদীর ঢেউগুলো উল্টোদিকে বইছে। নদীর বুক কাঁপছে প্রবলভাবে। পাথুরে কূলগুলো ফেটে যাচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে। চলো, পালিয়ে যাই আমরা, এখানে থাকা নিরাপদ নয়। ভূমিকম্প ভয় দেখাচ্ছে আমাদের। আমরা সমুদ্রে গিয়ে অবাধে জলকেলি করব, সমুদ্রে স্নান করে রাত্রির স্নিগ্ধ শিশিরে সজীব হয়ে উঠব আমরা। আমরা যথাশক্তি প্রয়োগ করে উপরে ওঠার চেষ্টা করছি।
স্ফিংক্স : এ কী ভীষণ কম্পন! এক ভয়ঙ্কর কম্পনের প্রবলতায় সব কিছু কাঁপছে দুলছে। চারদিকে ভীতিবিহ্বল জীবরা ছোটাছুটি করছে। কিন্তু আমরা কোনও স্থান পরিবর্তন করব না। আমরা এখানেই অধিষ্ঠিত থাকব। কি আশ্চর্য, একটা বিরাট প্রাসাদের চূড়া উপরে উঠছে। সেই প্রাচীন বৃদ্ধ যিনি এক গর্ভবতী নারীর জন্য সমুদ্রের মাঝখানে ডেলস দ্বীপের সৃষ্টি করেন তিনিই এ ভূমিকম্প সংঘটিত করেন। অসহিষ্ণু আটলাসের মতো তিনি পৃথিবীর সবুজ আঁচলটাকে ওলটপালট করে দিচ্ছেন। নদীর কূল, জল সব এক হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সম্মুখস্থ উপত্যকাও ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যেন এক দৈত্য কাঁধে এক বিরাট বোঝা নিয়ে টলতে টলতে আসছে। কিন্তু আমাদের কাছে আর এগোতে পারবে না।
সীসমস : এ কাজ আমার একার। এর জন্য যা কিছু প্রশংসা সব আমার প্রাপ্য। আমি যদি মাঝে মাঝে এভাবে পৃথিবীকে না কাঁপিয়ে তুলি তাহলে পৃথিবী কখনও এত সুন্দর থাকতে পারে না। আমি যদি অত চেষ্টা করে একইভাবে না কাঁপাতাম তাহলে পাহাড়গুলো উঁচু মাথায় ছবির মতো ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকত না। আমি অনেক সহ্য করে সমুদ্রের গম্ভীর হতে পাহাড়গুলোকে টেনে তুলেছি।
স্ফিংক্স : আমরা তার সাক্ষী আছি। এইভাবে টেনে না তুললে পাহাড়গুলোকে পাহাড় বলে মনেই হতো না। এক ঘন বন চারদিকে প্রসারিত করে এই সব পাহাড়ের মুখগুলোকে ঢেকে রেখেছে। তার মাঝখানে আমরা স্ফিংক্সবেশে নিরাপদেই বাস করছি। আমাদের আসন কেউ টলাতে পারবে না।
গ্রিফিনরা : চারদিকে সোনা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে অন্ধকারে। এমেটরা, তাড়াতাড়ি যাও। তা না হলে অন্যেরা দেখে ফেলবে।
এমেটদের কোরাস : থাক পাহাড়। পাহাড় ডিঙিয়ে ঝর্ণার ধারে গিয়ে চকচকে সোনাগুলোকে কুড়িয়ে আনন। একটু কষ্ট করো।
গ্রিফিনরা : নাও নাও, তাড়াতাড়ি সোনা কুড়িয়ে জড়ো করো। যারা সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম তারাই সবচেয়ে বেশি সম্পদ লাভ করে সঞ্চয় করে।
পিগমিরা : আমরা কোথা হতে কেমন করে এসেছি তা বলতে পারব না। তবে আমরা এখানে ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত। আমাদের মতো খর্বকায় নরনারীদের ধরিত্রীমাতা পুবে-পশ্চিমে সৃষ্টি করে আমাদের জীবনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমাদের সুখ ও সৌভাগ্য দান করেছেন।
পিগমিদের প্রধান : এখন আমাদের একমাত্র শত্রু হলো ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসা ঐ সব বক ও সারস পাখিগুলো। তাড়াতাড়ি শক্তি সঞ্চয় করে তীর-ধনুকসহ ঐ সব শত্রুদের সম্মুখীন হও। ওরা সংখ্যা অগণ্য। ওদের তীরবিদ্ধ করো। ওদের পালক আমাদের শিরস্ত্রাণে শোভা পাবে।
সারস পাখিরা : কে আমাদের বাঁচাবে? কে আমাদের মুক্ত করবে পরাধীনতার বন্ধন থেকে নিষ্ঠুর পিগমিরা আমাদের সকলকে হত্যা করছে। আর্তের ভয়ার্ত চিৎকারে আকাশ-বাতাস মুখরিত। তাদের প্রতি অপরিসীম ঘৃণা নিয়ে আমরা চলে যাচ্ছি।
মেফিস্টোফেলিস : আমরা সহজেই উত্তরে ডাইনিদের দমন করেছি। কিন্তু এই বিদেশে আমার কোনও শক্তি নেই। জায়গাটার নাম ব্লকর্সবার্গ। জায়গাটা মন্দ নয়। এখানে এক সমতলবর্তী বনপথের উপর দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ একটা পাহাড় পেয়ে গেলাম। পাহাড়টা ওদিকের স্ফিংক্সটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের সানুদেশে চারদিকে আগুন জ্বলছে আর ল্যামি নামে অদ্ভুত ধরনের মেয়েরা নাচগান ও হৈ-হুঁল্লোড় করছে। ডাইনিদের রাজা হেনরি আর রানি ইলস পাহাড়ের উপর পাথরের সিংহাসনে বসে আমাকে লক্ষ করছে। কোথাও কোনওভাবে পালাবার উপায় নেই। আমি লুকিয়ে আড়াল থেকে ওদের নাচগান দেখে এক গোপন আস্বাদ পাচ্ছি।
