শিরণ : এসব কথা আর বলতে চাই না। এখন নেস্টর ও প্যালাসকে কেউ শ্রদ্ধা করে না, যেন তারা লেখাপড়া শেখেনি।
ফাউস্ট : যিনি আতঁকে উদ্ধার করেন, মানুষের দেহমনের ক্ষত সারিয়ে দেন, যার কথা মানুষের অন্তরের মর্মমূলকে আলোকিত করে আমি তাকেই বরণ করে নিতে চাই।
শিরণ : যখন বীরেরা আমার কাছে আসত, পরামর্শ চাইত, আমি আমার জ্ঞান ও নীতি উপদেশের দ্বারা তাদের সাহায্য করতাম। কিন্তু আজকাল সে কাজ আমি যাজক আর বাঁচাল বুড়িদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি।
ফাউস্ট : তোমর কথা শুনে বেশ বোঝা যায় তুমি একজন প্রকৃত মহৎ লোক। যিনি নিজের প্রশংসার কথা শুনতে চান না, যিনি মনে করেন তাঁর চারপাশে আজও তার সমকক্ষ ব্যক্তি অনেক আছে।
শিরণ : মনে হচ্ছে তুমি সাধারণ মানুষ ও রাজা-রাজড়া সবাইকে মিষ্ট কথায় তুষ্ট করতে পার।
ফাউস্ট : তবে আশা করি একটা কথা তুমি আমায় বলবে। অতীত গৌরবের অনেক কিছু তুমি দেখেছ। এখন বলো, সেকালের সব বীরদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে?
শিরণ : গ্রীকদের মধ্যে এক-একজন বীর এক-একদিকে খ্যাতি লাভ করেন। যেমন ক্যাস্টর ও পোলাক্স দেহগত শক্তি ও বীরত্বে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন এবং বিজ্ঞ ও চিন্তাশীল শাসকরূপে জেসন খ্যাতি লাভ করেন। সর্বশ্রেষ্ঠ বীণাবাদকরূপে মানুষের মন জয় করেন অর্ফিয়াস। আবার বিক্ষুব্ধ সমুদ্রবক্ষে দিনরাত জাহাজচলনায় সর্বাপেক্ষা। পারদর্শী ছিল লাইনেউস।
ফাউস্ট : কিন্তু হার্কিউলেসের নাম না করে তার প্রতি অন্যায় করেছ তুমি।
শিরণ : স্বর্গলোকে ফীবাস, অ্যারেস, হার্মিসের লীলা আমি দেখিনি। তবে মর্ত্যভূমিতে দেখেছি এক দেবতার লীলা। কী অপূর্ব তাঁর যৌবনসমৃদ্ধ রাজকীয় রূপ! অবশ্য তিনি তাঁর অগ্রজ ও সুন্দরী রমণীদের কিছুটা বশীভূত ছিলেন। কোনও গাথা তাঁর গুণগান ঠিকমতো করতে পারে না, কোনও মর্মরপ্রস্তর ঠিকমতো তাঁর প্রতিরূপ নির্মাণ করতে পারে না।
ফাউস্ট : সবচেয়ে সুন্দর পুরুষের কথা বললে। এবার সবচেয়ে সুন্দরী এক নারীর কথা বলো।
শিরণ : নারীর সৌন্দর্যে কোনও বস্তু আছে বলে আমি মনে করি না। আমি হচ্ছি গুণের উপাসক। দেহগত রূপলাবণ্য যখন গুণাবলির সঙ্গে মিলিত হয় তখনি তা। আকর্ষণ করে মুগ্ধ করে আমাদের। এ বিষয়ে আমি হেলেনাকে শ্রদ্ধা করি, যাকে আমি একদিন আমার পিঠে বহন করেছিলাম।
ফাউস্ট : তাকে বহন করেছিলে?
শিরণ : আমার এই পিঠে?
ফাউস্ট : আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এ বিষয়ে আরও কিছু বলো। এই হেলেনা হচ্ছে আমার কামনার ধন। একমাত্র উচ্চাশার বস্তু। কোথায় তাকে নিয়ে গিয়েছিলে?
শিরণ : ব্যাপারটা এমন কিছু কঠিন নয়। দস্যুদের হাত থেকে হেলেনার ভাই ডিসকুরী যখন তাকে উদ্ধার করতে এসেছিল তখন আমি সেখানে ছিলাম। ডাকাতদের ভয়ে ভাই-বোনে যখন পালাচ্ছিল তখন জলাভূমি তাদের গতিরোধ করে। তখন হেলেনা ডুবে যেতে যেতে আমার মাথার চুল ধরে। আমি তাকে আমার পিঠে করে বহন করে উদ্ধার করি। সে আমার মিষ্ট কথায় ধন্যবাদ দেয়। কী অপূর্ব তার যৌবনসৌন্দর্য।
ফাউস্ট : তার বয়স কত?
শিরণ : ভাষাতাত্ত্বিকরা নিজেদের যেমন প্রতারণা করে তেমনি তোমাকেও প্রতারিত করেছে। পৌরাণিক সুন্দরীদের কোনও বয়স নেই। তাদের রূপ চিরন্তন। সকল যুগের কবিরা তাদের প্রয়োজন অনুসারে স্মরণ করে। তাদের বয়স বাড়ে না। লাবণ্য ম্লান হয় না।
ফাউস্ট : তাহলে কালের বন্ধনে তাকে আবদ্ধ করো না। একদিন ফেবার দ্বীপপুঞ্জে একিলিস তাকে যেমন দেখেছিল, আরও সে কালের সব বন্ধনকে অস্বীকার করে ঠিক তেমনিই আছে। অনন্ত রূপযৌবনা এই নারীর প্রেম লাভ করা এক পরম সৌভাগ্যের কথা। আমি কি আমার সারা জীবনের কামনার নিবিড়তার দ্বারা তাকে লাভ করতে পারব না? সেই অক্ষয় দেবীপ্রতিমাসম মূর্তিকে তুমি দেখেছ স্বচক্ষে। আমি দেখেছি। স্বপ্নে। আমার সমগ্র অন্তরাত্মা বাঁধা পড়ে গেছে তার রূপের বাঁধনে। তাকে না পেলে আমি বাঁচব না।
শিরণ : হে অতিথি, তুমি মরণশীল মানুষ বলেই এত আবেগ অনুভব করছ। আমাদের মনে হচ্ছে তুমি উন্মাদ। তবু মনে হচ্ছে তোমার আশা পূরণ হতে পারে, বছরে একবার করে আমি ম্যান্টোর বাড়ি যাই তার বাবার চিকিৎসার জন্য। তুমি যদি ধৈর্য ধারণ করে অপেক্ষা করতে পার তাহলে মনে হয় সে তার শক্তি দিয়ে তোমার মনের রোগ সারাতে পারবে। তার সে ক্ষমতা আছে।
ফাউস্ট : কিন্তু আমার এ রোগ সারবে না। আমার লক্ষ্য হচ্ছে বিরাট। আমি লক্ষ্যভ্রষ্ট হব না কখনও।
শিরণ : কিন্তু তার রোগনিরাময় ক্ষমতাকে অবহেলা করতে পার না। তাড়াতাড়ি নামো, এসে গেছি।
ফাউস্ট : উপলখণ্ডে আকীর্ণ এই নদীবক্ষের উপর দিয়ে এই রাত্রিতে কোথায় নিয়ে এলে?
শিরণ : এই সেই স্থান যেখানে একদিন গ্রীস আর রোম তাদের শক্তি পরীক্ষা করে। এখানে অলিম্পাস প্রাসাদের পদতল বিধৌত করে পেলেউস নদী বয়ে গেছে। ধীরে ধীরে বালুকাবেলায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় এ দেশ। রাজা-রাজড়ারা সব কোথায় পালিয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে আছে শুধু একটি মন্দির, চাঁদের আলোর চূড়াটি যার চকচক করছে।
ম্যান্টো : অশ্বক্ষুরধ্বনিতে কাঁপছে মন্দিরের সিঁড়িগুলো। নিশ্চয় কোনও উপদেবতা আসছে।
শিরণ : ঠিক তাই। তোমার চোখ খুলে দেখো কে এসেছে।
ম্যান্টো : এস! তোমার কথা কখনও মিথ্যা হয় না।
