মেফিস্টোফেলিস : একদিন তুমি এই সব প্রাচীন জীবদের অভিশাপ দিতে। কিন্তু আজ তুমি ওদের দেখে আনন্দ পাচ্ছ। কোনও মানুষ তার প্রিয়তমার খোঁজ করার সময় দৈত্যদানবদেরও খাতির করে।
ফাউস্ট : (স্ফিংক্সদের সম্বোধন করে) হে নারীমূতি ধারণকারিণীরা, আমার কথা শোনো। তোমাদের কেউ হেলেনাকে দেখেছ?
স্ফিংক্স : হেলেনার আগেই গ্রীসদেশে আমাদের বংশ ধ্বংস হয়। আমাদের শেষ বংশীয় নিহত হয় হার্কিউলেসের হাতে। তুমি শিরণকে জিজ্ঞাসা করতে পার। এই ভূতুড়ে রাত্রিতে আশা পূরণের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
সাইরেনরা : ব্যর্থতা তোমার ভাগ্যে নেই। ইউলিসেস আমাদের পাশ দিয়ে সমুদ্র যাবার সময় আমাদের অস্বীকার করেছিল। আমাদের কথা অনেক জেনে পরে সে বর্ণনা করে। সমুদ্রের নীল জলে ছড়ানো আমাদের রূপে মালার সন্ধান করো। সব জানতে পারবে।
স্ফিংক্স : ইউলিসেসের মতো ওদের কথার ছলনায় এভাবে প্রতারিত হয়ো না। সুপরামর্শের দ্বারা আমরা তোমাকে বরণ করে যাব। শিরণের দেখা যদি না পাও তাহলে। কি করতে হবে আমরা বলে দেব। (ফাউস্টের প্রস্থান)।
মেফিস্টোফেলিস : (রাগের সঙ্গে) ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে সারবন্দিভাবে ওরা কত দ্রুতবেগে উড়ে চলে গেল। কোনও শিকারি ওদের গান শেষ করতে পারবে না।
স্ফিংক্স : শীতের ঝড়ো হাওয়ার মতো স্টিমফালিরের মতো এবং দ্রুতগামী, অ্যালসিদের শব ওদের নাগাল পায় না। ওদের পাগুলো রাজহাঁস আর ঠোঁটগুলো শকুনির মতো। ওরা কখনও আমাদের কাছে আপন হয়ে আসতে চায় না।
মেফিস্টোফেলিস : আর একটা জার্নোয়ার কোথায় ফোঁস ফোঁস করছে।
স্ফিংক্স : ভয় পেও না। বলো তোমার দুঃখের কারণ কি? কেন তুমি অশান্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছ? সামনে দেখবে লামিয়ার একদল সুন্দরী বারবণিতা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। আছে। তাদের অভিবাদন জানাবে।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু তোমরা থাকো এখানে যাতে দরকারের সময় পেতে পারি।
স্ফিংক্স : হ্যাঁ, তোমার পিছনে ওদের কাছে চলে যাও। হাজার বছর ধরে আমরা মিশর দেশে বাস করে আসছি। আমাদের প্রতি তোমার যদি শ্রদ্ধা থাকে তাহলে তোমার ভাগ্য আমরা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত করে যাব গ্রহ-নক্ষত্রের বৈরিতা সত্ত্বেও। যুগ-যুগান্তর ধরে অক্ষয় হয়ে পিরামিডের সামনে বসে মানবজাতির সকল কর্মাকর্মের সনাতন সাক্ষীরূপে তাদের বিচার করে চলি। কোনও যুদ্ধ, বন্যা বা বিপর্যয় কোনও ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে না আমাদের।
দ্বিতীয় রাত্রি
(উপনদীবাসিনী জলপরীদের দ্বারা পরিবৃত)
পেলেউস : হে নলখাগড়াগণ, আন্দোলিত হও। মৃদু মর্মরধ্বনিতে তীরবর্তী পপলার গাছগুলোর সঙ্গে কথা বলো চুপিসারে। তাদের স্বপ্নের ব্যাঘাত ঘটাও। ভয়ঙ্কর এক বিপদের আভাস পেয়ে জেগে উঠেছি আমি। এক গোপন ভয়ের শিহরণে কেঁপে কেঁপে উঠছে আমার বুকের শান্ত জল।
ফাউস্ট : (এগিয়ে এসে) আঙ্গুর ক্ষেত্রের ধারে বনের মধ্যে মানুষের মতো কার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। মনে হলো নদীর ঢেউগুলো খেলাচ্ছলে কথা বলছে বাতাসের সঙ্গে।
জলপরীরা : নিরন্তন সন্ধানকার্যে অতিশয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছ তুমি। তোমার বিশ্রাম দরকার। এখানে শুয়ে পড়ে তোমার তপ্তক্লান্ত দেহকে শীতল করো। তুমি যখন মধুর বিশ্রামের আস্বাদন গ্রহণ করবে আমরা তখন মৃদুমর্মরধ্বনির মতো কথা বলব তোমার সঙ্গে।
ফাউস্ট : আমি এখন জেগে উঠেছি। আমার দেরি হয় তোক। ওরা কি স্বপ্নের মূর্তি? ঐ সব অনিন্দ্যসুন্দরী মূর্তিরা আমাকে যেখানে খুশি নিয়ে যাক। নদীবিধৌত ঐ শান্তশীতল ঝোঁপের ধারে আমি একটু আগে সত্যিই খুব শান্তিতে ছিলাম। চারদিক হতে অসংখ্য ঝর্না গান গেয়ে বয়ে যাচ্ছিল। ঐ সব সুন্দরীরা নগ্নদেহে যখন সাঁতার কাটছে নদীর স্বচ্ছ জলে, তখন তাদের দেহগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে নদীর জলে। তাদের জলকেলির এই দৃশ্যটি মধুর হলেও অদৃশ্য কামনার বস্তুটিকেও আমি ভুলিনি। পত্রাচ্ছন্ন এই বনভূমি ভেদ করে আমার সন্ধানী দৃষ্টি দূরে প্রসারিত হচ্ছে সেই সৌন্দর্যের পরীর সন্ধানে। নদীর বুকে শুভ্র তরঙ্গের মতো বনহংসরা সাঁতার কাটছে। তারা মাঝে মাঝে পালক ছাড়ছে আর কপট দ্বন্দ্বে মেতে উঠছে নিজেদের মধ্যে। পুরুষ হাঁসরা তেড়ে নিয়ে যাচ্ছে মেয়ে হাঁসদের।
জলপরীরা : হে ভগিনীগণ, নদীর ধারে ঘাসের উপর কান পেতে শোনো, ঘোড়ার ক্ষুরের একটা চলমান শব্দ এগিয়ে আসছে। ভয়ে কাঁপুনি আসছে আমার। এই রাত্রিতে কে কার বার্তা বয়ে নিয়ে আসছে কে জানে!
ফাউস্ট : দেখো দেখো, শক্তি ও তেজের দ্যোতকরূপী এক অশ্বারোহীর পদভরে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পৃথিবীর মাটি। ওরই কাছে আছে আমার সৌভাগ্য। আমি কি লাভ করব আমার বাঞ্ছিত বস্তু? আমি তাকে না চিনলেও ফিলাইবার ঐ সুদর্শন পুত্রকে অভিবাদন জানাই। থামো শিরণ, আমার কথা শোনেনা।
শিরণ : কি কথা?
ফাউস্ট : তোমার গতিবেগ স্মরণ করো।
শিরণ : আমার যাবার সময় নেই।
ফাউস্ট : তাহলে আমাকেও তোমার সঙ্গে নাও। আমার অনুরোধ রাখো।
শিরণ : তাহলে উঠে পড়। কোথায় যাবে? নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছ তুমি। আমি তোমাকে নদী পার করে দেব।
ফাউস্ট : (ঘোড়ায় উঠে) তুমি কোনদিকে যাবে? হে শক্তিমান পুরুষ, তুমি একটি বীর জাতিকে শিক্ষা দান করতে। গ্রীকজাতির মধ্যে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে তোমার নাম। তোমার কার্যাবলি কবিদের মধ্যে ভাবের উদ্রেক করে।
