হোমুনোলাস : (একটা কাঁচ দিয়ে) এই কাঁচের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে তোমাদের প্রচেষ্টা! যাও, অনেক আশ্চর্য বস্তুর সন্ধান পাবে।
ফাউস্ট : (একা) কোথায় সে? তবে আর কোনও প্রশ্ন নয়। যদি এ মাটিতে কোনওদিন সে পা না দেয়, যদি এখানকার কোনও তরঙ্গ তার আগমনে উত্তাল হয়ে না ওঠে তাহলে এ বাতাসে অন্তত তার কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছে। কি আশ্চর্য, মনে হচ্ছে। আমি গ্রীসদেশে এসে পড়েছি। আমি তার মাটিতে দাঁড়িয়েছি, মনে হচ্ছে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠেছি; আমার শিরায় শিরায় বয়ে যাচ্ছে এক নূতন প্রাণচঞ্চলতা। আমার অনুভূতির মধ্যে আত্রেউস জেগে উঠেছে। এখন আমাকে ঐ চক্রকার আলোক–শিকার ব্যাপারটা খোঁজ করে দেখতে হবে। (প্রস্থান)।
মেফিস্টোফেলিস : আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে এই সব জ্বলন্ত আগুনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছি এবং আমি কেমন যেন হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি। উলঙ্গ অবস্থায় গ্রিফিন ও স্ফিংক্স জাতীয় একদল নির্লজ্জ নারী তার মধ্যে উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে কারও কাছে দেহে জামা বা কিছু আবরণ আছে। তাদের আলুলায়িত কেশপাশ মাথার উপর ছড়ানো। বড় দৃষ্টিকটু। অবশ্য অশালীনতাই আজ আমাদের আদর্শ। আমরা বর্তমানের মন আর প্রচলিত রীতি দিয়ে সব জিনিসকেই যাচাই করে দেখলেও অতীতের এই সব প্রাচীন নিদর্শন লুপ্ত হলেও তারা জীবন্ত এবং অতিবাস্তব। ওদের সঙ্গে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেখা করতে হবে। অতিথিসুলভ সৌজনসহকারে আমি তাদের অভ্যর্থনা জানাব। হে সুন্দরী ধূসরবদনা বায়োপ্রবীণারা, কেমন আছ?
গ্রিফিনরা : বয়োপ্ৰবীণা? ধূসর, প্রবীণ এসব কথা কেউ শুনতে চায় না। এসব কথা শুনে বিষাদ জাগে মনে। আমাদের লোকে গাল দেয়, সমালোচনা করে। আবার প্রশংসাও করে। কামিনী-কাঞ্চন আর রাজমুকুট কে না চায়?
মেফিস্টোফেলিস : (স্ফিংক্সদের কাছে বসে) তোমাদের মাঝে বসে ভালো লাগছে। সহজ মনে হচ্ছে নিজেকে। আমি তোমাদের সকলকে চিনি।
স্ফিংক্স : আমাদের প্রেতসুলভ অপ্রাকৃত কণ্ঠস্বর তোমার সংস্পর্শে এসে স্বাভাবিক হলো। এখন নাম ও পরিচয় দাও।
মেফিস্টোফেলিস : মানুষ আমাকে অনেক নামে ডাকে। এখানে ব্রিটিশ জাতির লোক আছে কি? তারা তো সারা পৃথিবী জুড়ে কত রণক্ষেত্রে ঘুরে বেড়িয়েছে, কত ঐতিহাসিক জায়গায় গেছে। তাদের লেখা অনেক ভালো ভালো পুরনো নাটকে আমার নাম লেখা আছে।
স্ফিংক্স : কিভাবে তারা তোমাকে জানল?
মেফিস্টোফেলিস : আমি তা জানি না।
স্ফিংক্স : তোমার কি জ্যোতিষবিদ্যা জানা আছে? কালের প্রকৃতি সম্বন্ধে তোমার কোনও জ্ঞান আছে?
মেফিস্টোফেলিস : নক্ষত্রপুঞ্জের উপর নক্ষত্রপুঞ্জ কিরণ দান করছে। তার উপর উজ্জ্বল চাঁদ উঠেছে। আমাদের পাথুরে সিংহের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু গরম করে নিচ্ছি। এখন এখান থেকে চলে যাওয়া ঠিক হবে না। এবার কিছু ধাঁধা বলো।
স্ফিংক্স : নিজের কথা বলল। সেটাই ধাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। এখন বলো দেখি এমন কে আছে যে একই সঙ্গে পুণ্যাত্মা ও পাপাত্মার কাছে সমানভাবে দরকারী।
গ্রিফিনরা : আমরা তাকে পছন্দ করি না। ঐ নোংরা লোকটা আমাদের কেউ নয়।
মেফিস্টোফেলিস : তোমরা ভাবছ তোমাদের এই অতিথির নখ আছে, আর তাই দিয়ে আঁচড়ে দেবে। তোমাদের ঠোঁটগুলো তো খুব তীক্ষ্ণ। তাহলে মিল খাবে না? দেখো না পরখ করে একবার?
স্ফিংক্স : যদি ভাল লাগে এখানে থাকতে পার। তবে এখানে তোমার এমনই খারাপ লাগবে যে তুমি চলে যাবে নিজের দেশে।
মেফিস্টোফেলিস : তোমাদের উপরের দিকটা খুব একটা সুন্দর না হলেও তার একটা আবেদন আছে। কিন্তু নিচের দিকটা পশুর মতো এবং ভয়ের সঞ্চার করছে আমার মনে।
স্ফিংক্স : তুমি এক তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করবে। আমাদের পায়ের থাবাগুলো। যেমন তীক্ষ্ণ, তোমার পায়ের পাতাগুলো তেমনি ঘোড়র ক্ষুরের মতো শক্ত। তবু তুমি অস্বস্তি অনুভব করছ আমাদের মাঝে। (উপরে সাইরেন নামক একজাতীয় পাখির আবির্ভাব)।
মেফিস্টোফেলিস : অদূরবর্তী ঐ নদীর ধারে পপলার গাছের মাথার উপর যে পাখির দল উড়ে বেড়াচ্ছে ওরা কী পাখি?
স্ফিংক্স : ওরা সবচেয়ে ভালো জীব। ওরা প্রেম জাগায় মানুষের মনে।
সাইরেনরা : কুৎসিত লোকদের গায়ের কালো রং দেখলেই বিহ্বল বিমৃঢ় হয়ে। যাও কেন? আমরা ঝাঁকে ঝাকে এসেছি তোমাদের গান শোনাতে। আমাদের মিষ্টি গান প্রেমের গান শোনো।
স্ফিংক্স : (সাইরেনের সুরে সুর মিলিয়ে) ওই গাছের শাখায় ওদের নামতে বলল। ওরা ওই শাখার আড়ালে ওদের পায়ের তীক্ষ্ণ নখগুলোকে লুকিয়ে রেখেছে। কেউ ওদের গান শুনলেই তাকে ওরা সে নখ দিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে দেবে।
সাইরেনরা : ঘৃণা ও হিংসা দুটোই দূর করে দাও। আমরা দূর স্বর্গলোক থেকে বিশুদ্ধ পরমাণু নিয়ে আসি। আমরা মধ্যভূমির সর্বত্র জলে স্থলে প্রান্তরে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াই। সে অচেনা পথিক, তোমাদের স্বাগত জানাই।
মেফিস্টোফেলিস : তোমাদের গানে কিন্তু নূতনত্ব আছে। তোমাদের কণ্ঠ ও বীণার তারের ঝঙ্কার এক হয়ে অপূর্ব সুর সঙ্গতির সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমার কানে ঢাকের। আওয়াজ শুনছি আমি। অন্য আওয়াজ আমার অন্তরে প্রবেশ করছে না।
স্ফিংক্স : অন্তর বলো না। বলো চামড়ার এক কুঞ্চিত থলে। অন্তর কথাটা তোমার মুখের সঙ্গে খাপ খায় না।
ফাউস্ট : কি আশ্চর্য! এই ঘৃণ্য অতিবাস্তব জীবগুলোকে দেখতে আমার ভালো লাগছে। তবে এটাও বুঝছি ভবিষ্যৎ দুর্ভাগ্যের আভাস রয়েছে ওদের মধ্যে। ওদের ঐ। বিষাদগম্ভীরতা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে। (স্ফিংক্সের দিকে তাকিয়ে) একদিন ঈডিপাসও ওদের কাছে গিয়েছিল। ওদের শরণ নিয়েছিল। (সাইরেনদের দিকে আঙুল বাড়িয়ে) একদিন ওরা ইউলিসেসকে বিভ্রান্ত করেছিল। (গ্রিফিনদের দেখিয়ে) এদের দেখলে মনের নূতন শক্তি পাই। এদের সুন্দর রূপের পানে তাকালে অনেক ভালো ভালো স্মৃতি জেগে ওঠে।
