হোমুনোলাস : বীরকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দাও। কুমারী মেয়েদের নাচে যোগদান করতে বলল। আমি চোখে একটা উজ্জ্বল আলো দেখতে পাচ্ছি। এ আলো হচ্ছে প্রাচীন ওয়ালপার্গিস উৎসবরাত্রির আলো। যাই ঘটুক না কেন, এ হচ্ছে সবচেয়ে উপভোগ্য ঘটনা। সুতরাং ওকে জাগাও।
মেফিস্টোফেলিস : একথা কখনও শুনিনি কারো কাছে।
হোমুনোলাস : একথা তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে কি করে? শুধু রোমান্টিক ভূত দেখতেই তুমি অভ্যস্ত। খাঁটি ক্ল্যাসিক্যাল ভূতও যে ভালো তা জান না।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু কোন দিকে যাব আমি বলতে পার? তোমার কথা শুনে আগে হতেই বিরক্তিতে ভরে উঠছে আমার মন।
হোমুনোলাস : উত্তর দিকে যাও শয়তান। আমরা যাব দক্ষিণ দিকে। সেখানে আছে পেলেউস, এক তৃণাচ্ছাদিত বিশাল সমভূমি বনের পাশ দিয়ে চলে গেছে পাহাড়ের দিকে। সে পাহাড়ের উপর আছে নূতন-পুরনো কত ফার্সানাস দৈত্য।
মেফিস্টোফেলিস : হায়! একান্তই যাবে তাহলে। অত্যাচারী মালিক আর। ক্রীতদাসের সেই পুরনো যুদ্ধ-বিবাদের ছবিটা আর আমার সামনে তুলে ধরো না। আমার বিরক্তি লাগছে। আসলে ওরা সবাই অন্ধ, সবাই পরাধীন। ক্রীতদাসগুলো স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে। কিন্তু জানে না আসলে ওদের মালিকরাও ক্রীতদাস, পরাধীন, অজ্ঞতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন।
হোমুনোলাস : ও সব ঝগড়া-বিবাদের ব্যাপারটা আমি বুঝব। ছোট থেকে প্রত্যেকেই নিজেকে রক্ষা করে চলবে। এখন বলো, মানুষ কি করে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারে আর কোনও পদ্ধতি জানা আছে তোমার?
মেফিস্টোফেলিস : গোপন পদ্ধতি ভালো নয়। গ্রীসীয় পদ্ধতি কিছুটা ভালো। যে পাপকাজে মানুষ আনন্দ পায় তা সবাইকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু আমাদের পাপকাজে কোনও আনন্দ নেই বলে লোকে খারাপ বলে আমাদের।
ওয়াগনার : (উদ্বেগের সঙ্গে) আমি এখন কি করব?
হোমুনোলাস : হ্যাঁ, তোমাকে এখন ঘরে বসে একটা ভারী কাজ করতে হবে। জীবনের সব উপাদানগুলো মিশিয়ে এক মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে হবে। এমন জীবন সৃষ্টি করতে হবে যার মধ্যে স্বর্ণ সম্পদ, গৌরব, জ্ঞানবিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, গুণরাজি সব সমন্বিত হবে। বিদায়।
ওয়াগনার : বিদায়! আমার খারাপ লাগছে। আমার মনে হচ্ছে আমাদের আর দেখা হবে না।
মেফিস্টোফেলিস : তার সহায়তায় আমি পেলেউস যাব। (দর্শকদের প্রতি) আমাদের সৃষ্ট জীবের উপর আমাদেরই নির্ভর করতে হয়।
তৃতীয় দৃশ্য
সুপ্রাচীন ওয়ালপার্গিস উৎসবরাত্রি (প্রথম)
ফার্সানীয় প্রান্তর। অন্ধকার।
এরিখথো : এই ভয়ঙ্কর রাত্রির উৎসবে আগের মতোই এসেছি আমি। আমি বিষাদগ্রস্থ এরিখথো। আমাকে যতটা নিষ্ঠুর হিসাবে চিহ্নিত করে বদ কবিরা আমি ততটা নিষ্ঠুর নই। আমি শুধু বিহ্বল হলে দেখছি সামনে ধূসর রঙের তাঁবুর পর তাঁবুর ঢেউ। সেই ভয়ঙ্কর রাত্রির স্মৃতি বার বার আনাগোনা করছে আমার মনে। কোথাও অযোগ্য শাসক কখনও তার রাজ্যকে অপর কোনও যোগ্যতার শাসকের হাতে ছেড়ে দেয় না। এই জন্যই হয়ত দেখা যায় বৃহত্তর শক্তির সঙ্গে ক্ষুদ্রতর শক্তির দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। আসলে আত্মা জয় করতে না পারলে বাইরের কোনও শক্তিকে জয় করা যায় না। স্বাধীনতার সাজানো মালা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অত্যাচারী শাসকের শক্ত মাথাও নত হয়। ইতিহাস জানে সীজারের লুব্ধ দৃষ্টির তীক্ষ্ণতায় পম্পের প্রথম জীবনের সব বিজয়গৌরব ম্লান হয়ে যায়। শক্তিমানের লালসার লেলিহান শিখা চারদিকে বিস্তার লাভ করে। সবলের অনিবারণীয় আঘাতে ঝরে পড়া দুর্বলের বহু রক্ত শোষণ করে নেয় পৃথিবীর মাটি। আজকের এই উৎসব রাত্রির আলোকোজ্জ্বল ঐশ্বর্য অতীত কালের বহু বিজয়োৎসবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অসম্পূর্ণ চন্দ্রকলার স্নিগ্ধোজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। সেইসব ভূতুড়ে তাঁবুগুলো কোথায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অকস্মাৎ আমার মাথার উপরে উল্কার আলো দেখছি। সেই আলোর ছটায় আমি এক জীবন্ত প্রাণীর আগমন প্রত্যক্ষ করছি। কিন্তু আমার উপস্থিতি তার পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে তাই আমার এখানে থাকা উচিত হবে না। (প্রস্থান)
ঊর্ধ্বে এক বায়বীয় অতিথির আবির্ভাব।
হোমুনোলাস : আমার মাথার উপরে ভয়ঙ্কর এক চক্রাকার জ্বলন্ত আলোর শিখা দেখছি।
মেফিস্টোফেলিস : আমি যখন উত্তরাঞ্চলে থাকতাম, আমার ঘরের জানালায় অনেক ভয়ঙ্কর প্রেতমূর্তি দেখতাম। এখানেও তাই দেখছি। এ জায়গাটাকেও আমার বাড়ির মতো মনে হচ্ছে।
হোমুনোলাস : দেখো দেখো, একটা লম্বা লোক আমাদের সাথে লম্বা লম্বা পা ফেলে আসছে।
মেফিস্টোফেলিস : ওকে বাতাসে ভর করে আসতে দাও। মনে হচ্ছে ও ভয় পেয়ে গেছে।
হোমুনোলাস : ও আবার কোনও রূপকথার রাজ্যে পুনর্জন্মের চেষ্টা করছে। আবার ও জীবন লাভ করবে।
ফাউস্ট : (পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করে) কোথায় সে নারী?
হোমুনোলাস : আমরা তা বলতে পারি না। তবে তুমি তাকে শূন্য বাতাসে ভর করে জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মাঝে খুঁজে বেড়াতে পার। যে একবার আদি মাতৃদেবীর সন্ধান পেয়েছে তাকে আর কোনও কষ্টই ভোগ করতে হয় না।
মেফিস্টোফেলিস : আমিও এইভাবে বেড়াতে চাই। কিন্তু কোনও ভালো পথ পাচ্ছি না। এই সব জ্বলন্ত আগুনের মাঝে বাঞ্ছিত মনের মানুষকে খুঁজে বেড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায় দেখি না। এখন এই ছোট্ট মানবপিণ্ডটাই আলোর দ্বারা পথ দেখাতে পারে।
