মেফিস্টোফেলিস : যাও, চলে যাও হে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যসমৃদ্ধ মহান পুরুষ। এমন কি নূতন ও বিজ্ঞজনোচিত চিন্তা আছে যা অতীতে কখনও চিন্তিত হয়নি? এখন তোমরা যতই মৌলিক চিন্তার বড়াই করো না, শীঘ্রই কোনও না কোনও মতের কবলে ধরা দেবে। আর ধরবে মদ। (তরুণ দর্শকের উদ্দেশ্যে) আমার কথা এখন তোমাদের নীরস লাগছে। তবে মনে রাখবে আমি শয়তান হলেও বয়োপ্রবীণ এবং আমার কথা বুঝতে পারবে তোমাদের বয়স হলে।
দ্বিতীয় দৃশ্য
গবেষণাগার
মধ্যযুগীয় ধরনের কিছু অদ্ভুত যন্ত্রপাতি ঘরময় ছড়ানো। ওয়াগনার এক জ্বলন্ত চুল্লীর সামনে উপবিষ্ট।
ওয়াগনার : ঘণ্টার প্রচণ্ড শব্দে বাড়ির দেওয়ালগুলো কাঁপছে। তবে শীঘ্রই সব আগ্রহ ও প্রত্যাশার অবসান ঘটবে। বড় নলটার মধ্যে জ্বলন্ত কাঠের মতো কি একটা জিনিস চকচক করছে। এই পেয়ে গেছি। কিন্তু দরজায় কিসের শব্দ?
মেফিস্টোফেলিস : (প্রবেশ করে) স্বাগত বন্ধু!
ওয়াগনার : (উদ্বেগের সঙ্গে) ঠিক সময়েই এসে গেছ। বর্তমান গ্রহের প্রভাবেই তুমি এসে গেছ। (চুপি চুপি) কিন্তু এখন কোনও কথা নয়। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করো। একটা বড় রকমের কাজ এখনি সম্পন্ন হবে। কাজটা বিরাট আর চমৎকার।
মেফিস্টোফেলিস : কাজটা কি?
ওয়াগনার : এক কৃত্রিম মানুষ জন্ম নিচ্ছে।
মেফিস্টোফেলিস : মানুষ? কোনও প্রেমিকযুগলকে চিমনির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছ?
ওয়াগনার : না, লুকিয়ে রাখার কথা নয়। এই কৃত্রিম প্রজনন এক বিরল ঘটনা। অতীতের অর্থহীন প্রজননপদ্ধতি হতে আমরা আজ মুক্ত হলাম। বিশ্বে জীবনের প্রথম উদ্ভবের কথা একবার ভাব। বাইরের শক্তি ও প্রকৃতির অন্তর্নিহিত শক্তির মিলনে যে মানবজীবনের উদ্ভব হয় তা বড় পাশবিক, তা বড় স্কুল। মানবজাতির উচিত তার প্রজন্মকে উন্নত করা। (চিমনির ভিতরে তাকিয়ে) শত শত বিচিত্র উপাদানের সঙ্গে মানবিক উপাদান কিছু মিলিয়ে সেটাকে পরিশ্রুত করে কেমন চমৎকার ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমার আশাটা অবশ্যই ক্রমশই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। বিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। মানুষের যে সৃষ্টি রহস্য একদিন প্রকৃতির মধ্যে ঢাকা ছিল আজ আমরা জ্ঞানের দ্বারা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা সহজভাবে উঘাটিত করে তুলছি।
মেফিস্টোফেলিস : মানুষ বেঁচে থাকলে অনেক রহস্য উঘাটিত করতে শেখে। জগতের সব নূতন নূতন জিনিস কালক্রমে পুরনো হয়ে যায় তার কাছে। আমার ভ্রমণকালে আমি নিজেই অনেক উন্নতমানের মানুষ দেখেছি।
ওয়াগনার : (নলের দিকে তাকিয়ে) দেখো দেখো মানুষটা হাঁ করছে। কি রকম চঞ্চল দেখাচ্ছে। ওর মাথাটায় এবার থেকে বিশুদ্ধ চিন্তার সৃষ্টি হবে। ও আবার কত চিন্তাশীল ব্যক্তির জন্মদান করবে। কাঁচের নলটা নড়ছে। তার ভিতরে ছোট আকারের এক সুন্দর মানুষ নড়াচড়া করছে। দেখো এক জীবন্ত পদার্থ সৃষ্ট হলো। আর কি আশা করতে পার? সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার একই রহস্য এবার থেকে সব মানুষই জানতে পারবে। ঘণ্টাধ্বনির মতো একটা এলোমেলো শব্দ এসে মানুষের এক সুস্পষ্ট কণ্ঠস্বরের রূপ নিচ্ছে।
কৃত্রিম মানুষ হোমুনোলাস : কেমন আছ বাবা? আমাকে বুকের উপর চেপে ধরো। তবে খুব জোরে নয়, কারণ তাহলে কাঁচটা ভেঙে যাবে। জগতে শুধু প্রকৃতির বস্তুরই অবাধ স্থান। কৃত্রিম বস্তুর স্থান বড় সংকীর্ণ। (মেফিস্টোফেলিসের প্রতি) হে দুবৃত্ত খুল্লতাত মহাশয়, তোমাকেও দেখছি। ঠিক সময়েই দেখছি। ধন্যবাদ, সৌভাগ্যবশত আমার কাছে এসে পড়েছ। আমি যখন সঞ্জাত হয়েছি তখন কাজও শুরু করব অবিলম্বে। কৌশলে তুমি আমার কাজকে ত্বরান্বিত করবে।
ওয়াগনার : কিন্তু একটা কথা। এর আত্মাকে খুঁজে পাচ্ছি না আমি। একটা কথা আগে ভাবিনি।, কেমন করে দেহের আত্মাকে এক করা যাবে। তাদের পারস্পরিক বিরোধিতা সত্ত্বেও তারা বিচ্ছিন্ন হয় না।
মেফিস্টোফেলিস : থামো, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করব স্বামী-স্ত্রী তাদের তিক্ততা সত্ত্বেও কেমন মিলেমিশে থাকে। তুমি এখন বুঝবে না বন্ধু, এখনও কাজের অনেক বাকি আছে।
হোমুনোলাস : কি করতে হবে?
মেফিস্টোফেলিস : (একটা দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে) তোমার কলাকৌশল যা আছে এখানে প্রয়োগ করতে পার।
ওয়াগনার : (ফাইলের ভিতর তাকিয়ে) তুমি দেখতে খুবই সুন্দর হে বালক। (পাশের দরজাটা খুলে যেতেই দেখা গেল ফাউস্ট একটা সোফার উপর বসে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে রয়েছে)
হোমুনোলাস : (বিস্মিত হয়ে) চমৎকার! (বড় শিশিটা ওয়াগনারের হাত হতে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে ফাউস্টের উপর ঝুলতে লাগল) কী সুন্দর দৃশ্য। ছায়াছন্ন বনভুমির ভিতর দিয়ে ঝর্না বয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা স্নান করছে সে ঝর্নার জলে। কী সুন্দর তাদের দেহসৌষ্ঠব। মেয়েরা যখন স্নান করছিল ঝর্নার জলে হঠাৎ এক অনিন্দ্যসুন্দরী দেবী অথবা রাজকনা এসে পা ভেজাল সেই স্বচ্ছ জলে। এমন সময় পাখার ঝটপট শব্দ করে এক বড় রাজহাঁস এসে তার গায়ের পালক ঘষতে লাগল সেই রানির হাঁটুর উপর। তাই দেখে কুমারী মেয়েরা ভয়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু রানি পালাল না। রাজহাঁসটার সঙ্গে মিতালি পাতাল রানি। কিন্তু হাঁসটা হঠাৎ কোথায় জলের উপর ভেসে গেল আর এক ঘন কুয়াশার ছবিটা ঢাকা পড়ে গেল। এত সুন্দর ছবি কেউ কখনও আঁকেনি বা স্বপ্নেও দেখেনি।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি দেখতে আকারে কত ছোট। অথচ কত কথা বললে, কত গল্প! নিশ্চয় তুমি উত্তরদেশীয় লোক এবং কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। নিশ্চয়ই তুমি কোনও নাইট অথবা যাজকের ঘরে জন্মেছ। তোমার দৃষ্টি স্বচ্ছ হবে কোথা হতে? অন্ধকারেই তুমি ভালো থাকো। (চারদিতে তাকিয়ে) বাদামী রঙের বাড়িটা ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছে। এখনও যদি জেগে ওঠে লোকটা, আর একটা বিপদ আসছে ওর। তখন ঘটনাস্থলেই ও মারা যাবে। সেই বনভূমি, ঝর্ণা, নারীদের নগ্ন সৌন্দর্য, রাজহংসরূপী রাজপুত্রও এইসব স্বপ্ন দেখছিল। এই প্রায়ান্ধকার পরিবেশ ওর কামনা-বাসনার সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। ওকে সরিয়ে নিয়ে যাও। নবজাতকের সৌভাগ্য কামনা করি আমি।
