বেকলেরেউস : (বারান্দা দিয়ে এসে) সব দ্বার এখন উন্মুক্ত। এখন আশা হচ্ছে আর তিনি দীর্ঘ ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবেন না। মনে হচ্ছে আর তিনি জীবন্ত মারা যাবেন না। কিন্তু এই গোটা প্রাসাদটা কাঁপছে কেন? মনে হচ্ছে বসে যাচ্ছে, ধসে যাচ্ছে। যদি বেরিয়ে না যাই তাহলে নিষ্পেষিত হতে হবে। কিন্তু আমার চোখের সামনে কি দেখছি? আমি সরল প্রকৃতির মানুষ, কিন্তু যত সব পাকা মাথা বৃদ্ধদের দ্বারা চালিত হতে হয় আমাকে। ঐ সব পুরনো বইগুলো পড়ে তারা যা জানত বা লিখত তা তারা ঠিকমতো বোঝাতে পারত না, তারা ভুল শেখাত মানুষকে। আবার তারা যা জানত বা শিখত তাতে তারা নিজেরাই বিশ্বাস করত না। এইভাবে তারা জীবনটাকে ক্ষয় করে। সে ক্ষয় কোনকালেও পূরণ হয়নি। কি ব্যাপার! অদূরে ঐ অন্ধকার ঘরে কে বসে রয়েছে? তার কাছে যেয়ে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমি। মোটা পশম আর লোম দিয়ে তৈরি কোট পরে বসে রয়েছে লোকটা। তাকে কেতাদুরস্ত দেখালেও তাকে চিনতে পারছি না। তবে তাকে আমি ভয়ও করি না। কই হে বৃদ্ধ মহাশয়, আপনি এখনও যমের বাড়ি যাননি? আমি আগে আপনাকে ছেলেবেলায় দেখেছি মনে হচ্ছে। অবশ্য আমি এখন আর সে। মানুষ নেই।
মেফিস্টোফেলিস : আমার ঘণ্টধ্বনি শুনে তুমি যে এসেছ এতে আমি খুশি হয়েছি। আগে তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করতাম আমি। একটি ছেলের প্রথম থেকেই বুঝতে পারি ভবিষ্যতে সে কেমন হবে তোমার মাথায় লম্বা লম্বা চুল ছিল। তোমার মুখে ছিল শিশুসুলভ হাসিখুশি ভাব। তুমি প্রেম করতে। কিন্তু এখন তোমার মাথা কামানো। তোমার চোখে-মুখে এখন কঠিন সংকল্পের ছাপ। এখন থেকে একেবারে বাড়ি চলে যেও না।
বেকালেরেউস : একজন বয়োবৃদ্ধ শিক্ষক হিসাবে আপনি এই পুরাতন শিক্ষাদানের স্থানে বসে জীবনের পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। আপনি আপনাদের দ্ব্যর্থবোধক কথা আর বলবেন না। ও সব কথার এখন ভিন্ন অর্থ বার করি আমরা। ওসব কথা বলে আপনি আমাদের যৌবনকে অহেতুক বিব্রত করে তুলতেন। অথচ আপনারা জানতেন আসলে সত্য কত সহজ।
মেফিস্টোফেলিস : আমরা যদি ছোট ছোট ছেলেদের সহজ সত্য সরলভাবে বলি, তাহলে তারা আর খেলাধুলা করবে না। আমরা চাই বড় হয়ে তারা সত্যকে আর মিথ্যা মায়ার গোপন গহ্বর থেকে আবিষ্কার করুক, বাইরে টেনে আনুক। তারপর তারা নিজের মতো করে সত্যকে জানুক, গ্রহণ করুক। তখন তারা বলবে, তাদের শিক্ষকরা ছিল নির্বোধ। তারা যা পড়িয়েছে, ভুল পড়িয়েছে।
বেকালেরেউস : শুধু নির্বোধ নয়, বদমাশ। এমন কোনও শিক্ষক আছে সে সত্যকে যথাযথভাবে উপস্থাপিত করতে পারে ছাত্রদের কাছে। তারা সত্যকে হয় কম করে না হয় বেশি করে জানে এবং সেইভাবে প্রকাশ করে। ছেলেদের প্রয়োজন অনুসারে তাদের শিক্ষা দেয়।
মেফিস্টোফেলিস : নিঃসন্দেহে মানুষের শিক্ষার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময় তোমার পার হয়ে গেছে। এখন তুমি শিক্ষা দিতে চাও, বহু বছরের সঞ্চিত অভিজ্ঞতায় এখন তুমি সমৃদ্ধ।
বেকালেরেউস : অভিজ্ঞতা! এটা তো কুয়াশা ছাড়া আর কিছুই নয়। এক অভিজ্ঞতা বিভিন্ন মতে বিভিন্ন রূপ লাভ করে। এখন স্বীকার করুন, মানুষ আজ পর্যন্ত যা শিখেছে তার মধ্যে কিছুই শিক্ষণীয় নয়।
মেফিস্টোফেলিস : এখন বিলম্বে বুঝেছি। আমি সত্যিই একদিন নির্বোধ ছিলাম। আমার জ্ঞানের অগভীরতাকে আমার নিজেরই উপহাস করতে ইচ্ছা করছে।
বেকালেরেউস : কথাটা শুনে খুশি হলাম। আপনিই প্রথম বয়োপ্রবীণ ব্যক্তি যার মুখে যুক্তির কথা শুনলাম।
মেফিস্টোফেলিস : আমি খনির ভিতরে কত গুপ্তধন ও মণিমাণিক্যের সন্ধান করেছিলাম। কিন্তু পরিণামে আমি লাভ করেছি কয়লা আর ভস্মরাশি।
বেকালেরেউস : আপনি তাহলে স্বীকার করুন আপনার এই টাকপড়া পক্ককেশ মাথাটা শূন্য। তাতে কিছু নেই।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি কিন্তু আমার প্রতি বড় কঠোর আচরণ করছ। বেকালেরেউস : সৌজন্য কথাটাই মিথ্যা।
মেফিস্টোফেলিস : (চেয়ারটা দর্শকদের সামনে ঘুরিয়ে নিয়ে) এখানে আলো বাতাস নেই। আমি কি তোমাদের কাছে গিয়ে বসতে পারি?
বেকালেরেউস : বৃদ্ধ বয়সে যুবক হবার সাধ এক অর্থহীন ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের জীবন রক্তের জোরের উপর নির্ভর করে। যৌবনে রক্তের তেজ সবচেয়ে বেশি থাকে এবং সেই সময় সেই রক্ত থেকে এক জীবন থেকে উদ্ভব হয় আর এক জীবনের। তারপর যারা দুর্বল তারা শুধু ঝগড়া-বিবাদ করে, কাজের কাজ কিছু করে না, যারা শক্তিমান তারা সবেতেই সাফল্য লাভ করে। আপনি সারা জীবন ধরে কি করেছেন?–শুধু চিন্তা আর পরিকল্পনা? বার্ধক্য হচ্ছে ঠিক দূষিত জ্বরের মতো। আর তিরিশ বছর পার হলেই মানুষ তার আসল প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে।
মেফিস্টোফেলিস : শয়তানরা এর থেকে ভালো কথা বলতে পারে না।
বেকালেরেউস : শয়তান কোথাও থাকে তা তো একমাত্র মানুষের মনে।
মেফিস্টোফেলিস : শয়তান শীঘ্রই তোমার ঘাড়ে চাপবে।
বেকালেরেউস : ওটা হচ্ছে যৌবনের ডাকে সাড়া দেওয়া যথাযোগ্য অতিথি। আমার আগে এ পৃথিবীর কোনও অস্তিত্ব ছিল না। এ পৃথিবী আমিই সৃষ্টি করেছি, আমিই পূর্বাচলের মহাসমূদ্র হতে সূর্যকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছি। স্পষ্ট দিবালোকের উজ্জ্বল পোশাক পরে অভ্যর্থনা জানায় আমাকে। চাঁদ আমারই সঙ্গে গতি পরিবর্তন করতে শুরু করে। পৃথিবী সবুজ পত্র ও পুষ্পশোভিত হয়ে আমাকে প্রীত করতে থাকে। আমারই ইশারা পাবার সঙ্গে সঙ্গে রাত্রির অন্ধকার আকাশ হতে তাদের অবগুণ্ঠন সরিয়ে অনন্ত আলোকের ঐশ্বর্য উঘাটিত করে আমার চোখের সামনে। আমি ছাড়া কে তোমাকে চিরাচরিত চিন্তার বন্ধন থেকে মুক্ত করত? আমি স্বাধীন, আমি গর্বিত। আমি নিজের মনের আলোয় সব চিনে আমারই আপন আনন্দের বেগে এগিয়ে চলি। যত সব অন্ধকার মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে আমার পিছনে। অন্তহীন চির অম্লান এক গৌরবের আলো পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে আমায়। (প্রস্থান)
