জ্যোতিষী : কি করছ ফাউস্ট দেখো দেখো। ও তাকে ধরেছে। ও মিলিয়ে যাচ্ছে ধোঁয়ার মতো। চাবি নিয়ে প্যারিসকে ছুঁচ্ছে। হায় হায়! (বিস্ফোরণ। ফাউস্ট মাটিতে পড়ে গেল, প্রেতরা শূন্যে মিলিয়ে গেল।)
মেফিস্টোফেলিস : (ফাউস্টকে কাঁধে তুলে) তোমার নির্বুদ্ধিতার প্রতিফল তুমি পেলে। (অন্ধকার ও হট্টগোল)।
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
উঁচুতলায় একটি সংকীর্ণ প্রকোষ্ঠ। তাতে অপরিবর্তিত অবস্থায় ফাউস্ট শায়িত।
মেফিস্টোফেলিস : (শায়িত ফাউস্টকে পর্দার আড়াল থেকে দেখতে দেখতে) ওইখানে শুয়ে থাকো, সে নির্বোধ হতভাগ্য। প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ থাকো। হেলেনা তোমার যে যুক্তিবোধকে বিকল করে দিয়েছে তা সহজে শক্তি ফিরে পাবে না। (পর্দা সরিয়ে ভিতরে এসে চারদিকে তাকিয়ে) দেখে মনে হচ্ছে এ ঘরের সবকিছু যা যেখানে সব ঠিক আছে। জানালার কাঁচের শার্সিটা কিছুটা ম্লান দেখাচ্ছে। মাকড়শার জালগুলো বড় হয়েছে, দীর্ঘ হয়েছে কয়েক বছর ধরে। লেখার কালি শুকিয়ে গেছে। কাগজগুলো বাদামী রঙের হয়ে গেছে কিন্তু প্রতিটি জিনিস তার আগের জায়গাতেই আছে। এমনকি যে পালকের কলমটা দিয়ে শয়তানের সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সেই কলমটাও ঠিক আছে। সে পোশাকটা পরিয়ে আমি তাকে জাদুবিদ্যা শিখিয়েছিরাম সেটা এখনও হুকেতে ঝুলছে। সে কর্কশ ছদ্মবেশ, তোমার সাহায্যেই আমি কলেজ শিক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ করে তাকে সেই বিদ্যা শিখিয়েছিলাম যা যুবকদের মুগ্ধ করে সহজে। (পোশাকটা ধরে নাড়া দিতে কতকগুলো পোকামাকড় উড়ে বেড়াতে লাগল।)
পতঙ্গদের কোরাস : হে পিতা, আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করো। তুমিই আমাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছ। আমরা হাজারে হাজারে ওখানে বাস করি। তবে বুকের ভিতর দাগ থাকলে ধরা পড়ে না, কেউ তা দেখতে পায় না, কিন্তু জামায় পোকা বা উকুন থাকলেই তা দেখতে পাওয়া যায়।
মেফিস্টোফেলিস : এই সব কচি প্রাণের উচ্ছলতা দেখে আমার বড় বিস্ময় ও আনন্দ জাগছে। হে পতঙ্গদল, তোমরা পুরনো কাগজে, বই-এর ভিতরে এখানে-ওখানে জারে লুকিয়ে থাকগে (পোশাকটা পরে) হে পোশাক, আমার এস আমার দেহে। তবে। আমি কলেজে পড়াব না। কে আমার দাবি সমর্থন করবে? (একটা ঘণ্টা বাজাতেই ভীষণ জোর শব্দ হলো)
(ফেমুলাস টলতে টলতে অন্ধকার বারান্দা থেকে এল)
কী ভীষণ শব্দ। বাড়ির সিঁড়িগুলো সব ভয়ঙ্করভাবে কাঁপছে। জানালার রঙিন কাঁচের ফাঁক দিয়ে বিদ্যুৎ দেখতে পাচ্ছি আমি। ছাদটা মনে হচ্ছে ফেটে যাচ্ছে। অর্গলবদ্ধ দরজা খুলে যাচ্ছে কোনো যাদুমন্ত্র বলে। ফাউস্টের ঘরে তার কোট পরে একটা বিরাট দৈত্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে আমার পানে তাকিয়ে ইশারায় ডাকছে। আমি কি পালাব? না কি অপেক্ষা করব? কে জানে আমার ভাগ্যে কি আছে?
মেফিস্টোফেলিস : এখানে এস বন্ধু? তোমার নাম নিকোডমাস নয়?
ফেমুলাস : হে সম্মান্বিত মহাশয়, আমার নাম ওরেমাস।
মেফিস্টোফেলিস : ও নাম রেখে দাও।
ফেমুলাস : কী আনন্দের কথা! আপনি আমাকে এখনও চিনতে পারছেন না।
মেফিস্টোফেলিস : এক পুরনো ছাত্র। আমি ভুলিনি। পণ্ডিত লোকের পড়াশুনো শেষ হয় না। তারা ছাত্র রয়ে যায় চিরকাল। তোমার প্রভু এক জ্ঞানী ও পণ্ডিত লোক। মহান ডাক্তার ওয়াগাবারকে সকলেই চেনে। আজও দিনে দিনে তার জ্ঞানের সঞ্চয় বেড়ে যাচ্ছে। জ্ঞানের তৃষ্ণাও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে। তার চারদিকে আজ কত লোক ভিড় করছে। জ্ঞানের যে চাবিকাঠি তাঁর হাতে আছে তা দিয়ে তিনি স্বর্গ-মর্ত্য পাতালের সব রহস্যেরই সন্ধান করতে পারেন। সব জ্ঞানের আলো আজ তাঁর করায়ত্ত। সকলের যশকে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন, এমনকি তার পূর্ণ জীবনের ডাক্তার ফাউস্টও ম্লান তাঁর কাছে।
ফেমুলাস : ক্ষমা করবেন মশাই, আপনার কথার প্রতিবাদ করলে কিছু মনে করবেন না। আপনি যা যা বলবেন তা আমি শুনে চাইনি। সেই মহান পুরুষের হঠাৎ অন্তর্ধানের অর্থ আজও বুঝতে পারিনি আমি। তাঁর এই রূপান্তরও দুর্বোধ্য, দুঃখজনক। ডাক্তার ফাউস্টরূপে তাঁর পুনরাবির্ভাবের প্রত্যাশা করি আমরা। তাঁর ঘরের জিনিসপত্র সব অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। সব তাঁর আগমন প্রত্যাশা করছে। তার কাছে আমি যেতে সাহস পাচ্ছি না। জানি না এখন আকাশে কোন নক্ষত্র কিরণ দিচ্ছে। অকস্মাৎ ভয়ঙ্কর এক শব্দে গোটা বাড়িটার ভিত্তিমূলটা কেঁপে উঠল। দরজাগুলো প্রবলভাবে কেঁপে উঠতে খিল খুলে গেল আর সেই ফাঁকে প্রবেশ করলেন আপনি।
মেফিস্টোফেলিস : বর্তমানে তিনি যেখানে থাকেন আমাকে একবার সেখানে নিয়ে যাবে? অথবা তাকে আমার কাছে নিয়ে এস।
ফেমুলাস : তাঁর নিষেধ আছে। আমি সাহস পাচ্ছি না। মাসের পর মাস তিনি এক নির্জন নিভৃতে বড় রকমের এক কাজ করতে চলেছেন। কিসের যেন গবেষণা করে চলেছেন গভীরভাবে। তার বুকের ভিতর যেন আগুন জ্বলছে। তার মুখখানা হয়ে উঠেছে কয়লার উনোনের মতো কালো, চোখ দুটো অঙ্গারের মতো লাল। তিনি সব সময় হাঁপাচ্ছেন।
মেফিস্টোফেলিস : আমাকে কেন তিনি ঢুকতে দেবেন না? তিনি আমাকে একবার ঢুকতে দিলে আমার থেকে তার ভাগান্নতি ত্বরান্বিত হবে। (ফেমুলাস চলে গেলে মেফিস্টোফেলিস গম্ভীরভাবে বসে পড়ল) আমি এখানে বসতে না বসতেই একটা প্রেত এসে হাজির হলো। আমি তাকে চিনি। সে পুরনো পাপী আর তাই তার দুঃসাহসটা হবে অপরিসীম।
