জনৈক সুন্দর যুবক : তোমাকে বিরক্ত করতে কতো লোক এদিকে আসছে। আমার পায়ের পাতাটা ব্যথায় তুলতে পারছি না। আমি হাঁটতে বা নাচতে পারছি না। এর একটা বিহিত করতে হবে তোমায়।
মেফিস্টোফেলিস : আমি আস্তে করে একটা লাথি মারব তোমার পায়ে। তাহলেই ঠিক হয়ে যাবে।
যুবক : একমাত্র প্রেমিকই তার প্রেমাস্পদকে লাথি মারতে পারে।
মেফিস্টোফেলিস : আমার এ লাথির দাম আছে, কারণ রোগ সারাবার জন্য এ লাথি মারছি। পা দিয়ে আঘাত করছি পায়ে। প্রতিটি অঙ্গ তার সমজাতীয় অঙ্গের আঘাত সহ্য করতে পারে। তুমি কিছু মনে করো না।
যুবক : তোমার লাথিটা তো সাংঘাতিক। ঠিক যেন ঘোড়ার ক্ষুর।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু এতে তাড়াতাড়ি সেরে যাবে তুমি। এবার ঠিকভাবে নাচতে পারবে। টেবিলের তলা দিয়ে তোমার প্রেমিকার পায়ের উপর পা দিয়ে চাপ দিতে পারবে।
জনৈক তরুণী : (এগিয়ে এসে আমাকে একটু যেতে দাও ওখানে। আমার বড় দুঃখ। গতকাল পর্যন্তও আমার সামান্য চোখের দৃষ্টির মধ্যে আমার প্রেমিক জগতের। সব সুখ খুঁজে পেত। কিন্তু আজ সে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় আমার উপর থেকে। আজ সে একটি মেয়ে নিতে ফুর্তি করছে, উড়ে বেড়াচ্ছে।
মেফিস্টোফেলিস : ব্যাপার সত্যিই গুরুতর। তবে আমার কথা শোনো। এই কয়লাটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে তার কাছে যাবে। গিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তার পোশাক, ঘাড় আর দস্তানার দিকে তাকাবে। সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তর হবে অনুতপ্ত। তারপর কয়লাটা গিলে ফেলবে কোনও মদ বা জল না মিশিয়ে। দেখবে আজকের রাত্রিতেই সে তোমার দরজার সামনে এসে কাতরভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে।
তরুণী : এটা বিষ নয় তো?
মেফিস্টোফেলিস : এসব জিনিসকে শ্রদ্ধা করতে হয়, মান্য করতে হয়। এসব কয়লা সস্তায় পাওয়া যায় না। এর জন্য তোমাকে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হবে। এ কয়লা জ্বলন্ত চিতার নেবানো আগুন থেকে বার করা।
ভৃত্য : আমি একজনকে ভালোবাসি। কিন্তু লোকে বলে আমি অর্বাচীন।
মেফিস্টোফেলিস : (স্বগত) জানি না, কার কথা শুনব, কার কথা না শুনব। (ভৃত্যকে) অল্প বয়সের মেয়েদের কখনও ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধতে চেষ্টা করবে না। একমাত্র প্রাপ্তবয়স্করাই তোমার মূল্য বুঝতে পারবে। (আরও লোককে আসতে দেখে) আবার লোক? মহাবিপদে পড়লাম তো। এবার আমাকে অন্য উপায় অবলম্বন করতে হবে। নগ্ন সত্যের পথ ধরতে হবে। হে আদি মাতৃদেবতারা, ফাউস্টকে অবাধে তার কাজ করতে দাও। (চারদিকে তাকিয়ে) দরকার কক্ষে মিটমিট করে আলো জ্বলছে। রাজসভায় লোকরা একে একে সমবেত হচ্ছে। বীর নাইটরা যেখানে বসে আছে। সেখানে কত রকমের উজ্জ্বল অস্ত্রশস্ত্র চকচক করছে। এখানে যাদুর আর দরকার হবে। না। আপনা হতেই প্রেতরা আসবে।
সপ্তম দৃশ্য
স্বল্পালোকিত দরবার কক্ষ
সম্রাট ও সভাসদবর্গের
প্রবেশ প্রহরী : আমার কাজ হচ্ছে ঘোষণা করা। কিন্তু প্রেতদের প্রভাবে আমি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। সে প্রভাব ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলা যায় না। এখন আবার অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এ সভা। সম্রাট সামনেই বসেছেন। তারপর সভাসদ ও রাজকুমারেরা বসেছে। প্রেমিক-প্রেমিকারা বসেছে পাশাপাশি। এবার আমরা প্রস্তুত।
(বাদ্য)
জ্যোতিষী : নাট্যানুষ্ঠান শুরু করো। সম্রাটের আদেশ। হে দেওয়ালগণ, তোমরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রসারিত হও। এবার আমরা যাদু প্রদর্শন করব। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ এক রহস্যময় স্বল্প আলোর দ্বারা আলোকিত হচ্ছে। এবার নাটক শুরু হবে। আমি এবার মচ্ছে যাচ্ছি।
মেফিস্টোফেলিস : (প্রম্পটারের সামনে উঠে) আমি এই কাজেই নাম করব। শয়তানের এটাই হলো কাজ। (জ্যোতিষীকে) তুমি শুধু নক্ষত্রদের গতিপ্রকৃতির কথা জার্নো। আমার প্রতিটি কথা শিষ্যের মতো মন দিয়ে শুনে যাবে।
জ্যোতিষী : এক ঐন্দ্রজালিক শক্তির প্রভাবে যে অ্যাটলাস একদিন ত্রিভুবন ধারণ করেছিল সেই অ্যাটলাসের মন্দিরে মতো এক বিশাল প্রাচীর মন্দির দেখতে পাচ্ছি। আর বড় বড় স্তম্ভগুলো পাথরের ছাদটাকে ধারণ করে আছে।
স্থপতি : ও মন্দিরটা বড় প্রাচীন। এ সব আজকাল কেউ ভালো বলে না। আজ লোকে চায় সূক্ষ্ম কারুকার্য।
জ্যোতিষী : গ্রহ-নক্ষত্রদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সময়-অসময়ের কথা ছেড়ে দাও এখন। এখন আর কোনও যুক্তির কথা নয়। এখন যুক্তির সব শক্তি যাদুর দ্বারা আবদ্ধ। সঙ্গে সঙ্গে অবাধ উদ্ধত কল্পনার রঙিন ও উজ্জ্বল পাখাগুলো উন্মুক্ত করে দাও। তোমাদের উদ্ধত উচ্চাশাগুলো আজ পূরণ হবে। শুধু অসম্ভবকে বিশ্বাস করে যাবে। (মঞ্চের একধারে ফাউস্টের প্রবেশ) যাজকের পোশাক পরে এক আশ্চর্য মানুষ তার আরদ্ধ কাজ করে সম্পন্ন করে এসেছে। তার সঙ্গে শূন্যে ভেসে এসেছে এক তিনপায়া পদার্থ। ধূপের গন্ধ পাচ্ছি।
ফাউস্ট : হে আদিমাতাগণ, অনন্ত মহাশূন্যে চিরন্তন নির্জনতার রাজ্যে অধিষ্ঠিত আছ তোমরা। তোমাদের চারদিকে মৃতদের উজ্জ্বল আত্মারা ঘুরে বেড়ায়। আজকের এই রাত্রিতে এই প্রেক্ষাগৃহে কিছু আত্মার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করে পাঠাও। ঐন্দ্রজালিক শক্তির প্রভাবে তাদের প্রদর্শন করে দর্শকদের মনোরঞ্জন করব আমরা।
জ্যোতিষী : উজ্জ্বল চাবিকাঠিটা কাপে ঠেকাবার সঙ্গে সঙ্গে ধোয়ার মতো একটা বস্তু উঠে মেঘ হয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলল চারদিক। ঐ দেখো, তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে এক প্রেতমূর্তি। সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে ভেসে আসছে এক মধুর সঙ্গীতের ধ্বনি। সে ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠছে সমগ্র মন্দির-চত্বরটি। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘমালা কেটে গেল সেই অস্পষ্ট প্রেতমূর্তিটি এক সুন্দর যুবার বেশ ধারণ করল। এখানেই আমার কাছের শেষ। তার নাম বলার প্রয়োজন নেই। প্যারিসের নাম কে না জানে?
