ফাউস্ট : তাদের কাছে যাবার পথ কোথায়?
মেফিস্টোফেলিস : পথ নেই। তারা অগম্য, আবেদন-নিবেদনের অতীত। তুমি প্রস্তুত তো? সেখানে যাবার কোনও সহজ পথ বা অর্গল নেই। শুধু সীমাহীন নির্জনতায় তোমাকে ভাসতে হবে। জীবনে কখনও কোনও নির্জন মরুভূমিতে গিয়ে পড়েছ?
ফাউস্ট : আমার মনে হয় এসব কথা না বলাই ভালো। এতে ঐন্দ্রজালিক প্রতারণার গন্ধ পাচ্ছি। জীবনে অনেক পার্থিব জ্ঞানের অহঙ্কারে ভুগেছি পাগলের মতো। ঘৃণা ও ছলনার দ্বারা প্রতারিত হয়ে জনমানবহীন নির্জনতার অনেক দূরে বেড়িয়েছি। একা থাকা ঠিক নয়, একাকীত্বের দুঃসহ অবকাশে আমি শয়তানের কবলে পড়ে গিয়েছি।
মেফিস্টোফেলিস : সীমাহীন দূর সমুদ্রে কোনোদিন সাঁতার কেটেছ? আসন্ন মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে একের পর এক করে তরঙ্গমালার আঘাত সহ্য করেছ? সেই প্রশান্ত সমুদ্রবক্ষে অনেক মৎস্যকন্যাকে হয়ত সাঁতার কাটতে দেখেছ। ঊধ্ব আকাশে দেখেছ সূর্য চন্দ্র নক্ষত্র ও মেঘেদের আনাগোনা। কিন্তু এবার যখন শূন্যতার সাগরে সাঁতার কাটবে তখন কোনও কিছুই দেখবে না, কোনও কিছুই শুনতে পারে না, এমন কি তোমার পদশব্দও না। পা রাখার কোনও জায়গাও পাবে না।
ফাউস্ট : তুমি এমন সব রহস্যময় দুবৃত্তের মতো কথা বলছ যারা মানুষের সকল সততার সুযোগ নিয়ে তাকে দুঃখের ফাঁদে ফেলে। আমি আমার শক্তিবৃদ্ধির জন্য শূন্যতায় পাড়ি দেব। তুমি তাই চাও। তুমি চাও আগুনের ভিতর থেকে বাদাম এনে তোমাকে খাওয়াই। ঠিক আছে। আমি তাই করব যাই ঘটুক না কেন। এতে আমার আকাঙ্ক্ষিত সব বস্তু পাব। তুমি কিছু পাও বা নাও পাও।
মেফিস্টোফেলিস : তোমাকে বিদায় জানাবার আগে তোমার প্রশংসা না করে পারছি না। আমি দেখছি তুমি শয়তানকে চিনে ফেলেছ। এই নাও চাবিকাঠি।
ফাউস্ট : এই ছোট্ট জিনিসটা?
মেফিস্টোফেলিস : তুচ্ছ জ্ঞান না করে নিয়ে নাও।
ফাউস্ট : এটা চকচক করছে, আমার হাতে এসে যেন বড় হয়ে উঠছে।
মেফিস্টোফেলিস : এই জিনিসটার দাম কত শীঘ্রই তা বুঝতে পারবে। এই চাবিই তোমাকে আসল জায়গায় নিয়ে যাবে। একে অনুসরণ করে যাবে। এই তোমাকে মাতৃদেবতার কাছে নিয়ে যাবে।
ফাউস্ট : কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে এখনও কেন হিমশীতল এক ভয়ের শিহরণ অনুভব করছি আমি?
মেফিস্টোফেলিস : নূতন কথায়, কেন ভয় পাও তুমি? অনেক ঘটনার সঙ্গে আগেই তো পরিচিত হয়েছ তুমি।
ফাউস্ট : ভয়ের এই শিহরণ মানুষের একটি বড় গুণ। আঘাতের মধ্যে দিয়ে অনেক বড় জিনিসের গভীরে নিয়ে যায় এ শিহরণ।
মেফিস্টোফেলিস : তাহলে নেমে পড়। উঠে পড়ও বলতে পারি। নামা-ওঠা একই ব্যাপার। বিশ্বসৃষ্টির রূপবৈচিত্র্য হতে রূপহীন চিরমুক্ত শূন্যের রাজ্যে চলে যাও যেখানে শুধু মেঘমালা ছাড়া আর কিছু নেই। তবে এই চাবিকাঠিটা ধরে রাখতে হবে।
ফাউস্ট : এটাকে ধরে আরও শক্তি পাচ্ছি দেহ-মনে। আমার বুক ফুলে উঠছে। এবার শুরু হোক আমার যাত্রা।
মেফিস্টোফেলিস : অবশেষে এক জলন্ত তিনপায়া পদার্থ তোমাকে আলো দেখিয়ে আদি মাতৃদেবতার কাছে নিয়ে যাবে। সেখানে দেখবে রূপ, রূপান্তর, শাশ্বত মনের শাশ্বত আনন্দ। বিভিন্ন প্রাণীর অবয়ব ভেসে বেড়াচ্ছে অবাধে। কিন্তু তারা তোমার দেখতে পাবে না। তারা শুধু মৃত ব্যক্তিদের প্রেতকেই দেখতে পায়। সাহস অবলম্বন করো। তুমি এই চাবিকাঠি দিয়ে সেই তিনপায়া পদার্থটাকে স্পর্শ করবে। (ফাউস্ট চাবিটা শক্ত করে ধরে মুখের উপর দৃঢ় সংকল্প ফুটিতে তুলতে তা দেখে মেফিস্টোফেলিস খুশি হলো) ঠিক আছে। এই চাবিই তোমাকে আলোর কাছে নিয়ে যাবে। কাজ সেরে আবার ফিরে আসবে। সেই তিনপায়া পদার্থটি তোমাকে বয়ে এনে এখানে নামিয়ে দেবে। তারপর তুমি অতীতের অন্ধকার থেকে হেলেন ও প্যারিসের আত্মাকে আহ্বান করবে। এই কাজ তুইি প্রথম করবে এবং এর জন্য নির্বাচিত হয়েছ। তুমি। ঐন্দ্রজালিকভাবে শূন্যের কুয়াশা থেকে দেবদেবীর মূর্তি আবির্ভূত হবে।
ফাউস্ট : এখন আর কি করতে হবে?
মেফিস্টোফেলিস : এবার নিচের নিকে নামো। তারপর উপরে উঠবে। (ফাউস্ট অদৃশ্য হয়ে গেল) চাবিকাঠিটার নির্দেশ যদি মেনে চলে তাহলে আমার মনে হয় ঠিক ফিরে আসবে।
ষষ্ঠ দৃশ্য
উজ্জ্বলভাবে আলোকিত দরবার কক্ষ
সম্রাট ও যুবরাজ। রাজসভা চলছিল।
প্রধান ভৃত্য : (মেফিস্টোফেলিসকে) তুমি বলেছিলে প্রেতদের দৃশ্য দেখাবে। এখনও দেখাওনি। আমাদের সভাসদরা অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।
প্রধান কর্মচারী : সম্রাট আমাকে একটু আগে এর কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। আর বিলম্ব করবেন না। উনি রুষ্ট হবেন।
মেফিস্টোফেলিস : আমার সহকর্মী এই কাজের জন্য গেছে। কিভাবে কাজটা শুরু করতে হবে সে তা জানে। অতীতের বিস্মৃতির গর্ভ হতে সুন্দরকে বার করার জন্য বিরাট কলাকৌশল দরকার। মুনি-ঋষিদের কাজ।
প্রধান কর্মচারী : তোমার কি দরকার তা জানি না। সম্রাটের আদেশ, তুমি প্রস্তুত হও।
কোনও এক সুন্দরী : (মেফিস্টোফেলিসের প্রতি) একটা কথা মশাই! আমার দেহটা সুন্দর দেখছেন তো। কিন্তু প্রতিবার গ্রীষ্মকালে আমার চেহারাটা পাল্টে যায়। লাল লাল অসংখ্য ফোঁড়া হয়ে আমার চামড়াকে নষ্ট করে দেয়।
মেফিস্টোফেলিস : দেহের উজ্জ্বল ত্বকে দাগ–এটা সত্যি দুঃখের কথা। একটা কাজ করতে পারো। কোলাব্যাঙের বাচ্চা আর বিষাক্ত ব্যাঙের জিব সেদ্ধ করবে। পূর্ণিমার দিনে। তারপর সেই মিক্সচার গায়ে লাগাবে। পরের বসন্তকালে দেখবে গায়ে আর দাগ থাকবে না।
