প্রভাত সূর্য
সম্রাটের দরবার। সভাসদগণ পরিবৃত্ত সিংহাসনে উপবিষ্ট সম্রাটের সম্মুখে ফাউস্ট ও মেফিস্টোফেলিস নতজানু অবস্থায় উপবিষ্ট।
ফাউস্ট : হে মহারাজ, আগুন নিয়ে এই খেলার মারাত্মক অপরাধ মার্জনা করুন।
সম্রাট : (ফাউস্টকে উঠে দাঁড়াবার আদেশ দিয়ে) আমি এই খেলা আরও দেখতে চাই। আমি তার মাঝে হঠাৎ গিয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি যেন পুটোর মতো জলন্ত নরকাগ্নির মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে আগুন। আগুনের লেলিহান শিখাগুলো আকাশকে লেহন করতে চাইছিল। সেই আগুনের আলোয় দেখলাম অন্ধকারে অসংখ্য মানুষ প্রতিকারের আশায় আমার কাছে এসে ভিড় করছে। আমাকে প্রথামতো অভিবাদন করছে। তাদের মধ্যে অনেক রাজকুমার ছিলেন। আমি তাদের চিনতে পেরেছি।
মেফিস্টোফেলিস : আপনি প্রকৃতির সকল বস্তুরই রাজা। প্রকৃতির প্রতিটি প্রধান উপাদানও আপনার ইচ্ছ ও বিধান মেনে চলে। অগ্নির আনুগত্যের প্রমাণ এইমাত্র পাওয়া গেছে। এবার দেখবেন বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের আনুগত্য। আপনি সমুদ্রের জলরাশির উপর পা রাখতেই দেখবেন জলের এক বিশাল গোলাকৃতি প্রাসাদ গড়ে উঠবে আপনার মাথার উপর। জলের স্তম্ভ ও প্রাচীর দ্বারা নির্মিত এই প্রাসাদের মধ্যে সুবর্ণ অস্ত্র ধারণ করে ড্রাগন ও হাঙরেরা ভেসে বেড়াচ্ছে। আপনি এই রাজদরবার যতই ভালোবাসুন সেই সামুদ্রিক রাজপ্রাসাদ দেখে বিস্মিত হয়ে যাবেন। সেখানে কত সুন্দরী জলপরী আপনার অন্তরকে প্রীত করার জন্য আসছে। আসবে তাদের প্রাধানা জলদেবী থেটিস। সে আপনাকে দ্বিতীয় পেলেউস হিসাবে বরণ করে নেবে। একদিন এইভাবে আপনি অলিম্পাসের সিংহাসনে বসতে পারেন।
সম্রাট : আমি আপনার শূন্য বায়ুমণ্ডল তোমাকে দান করলাম। তুমি হবে তার অধিপতি।
মেফিস্টোফেলিস : সমগ্র পৃথিবী তো আগেই আপনার অধিকারে এসেছে।
সম্রাট : আমাদের পরম সৌভাগ্য বলে তুমি এখানে এসেছ। এই একটি রাত্রির আনন্দ হাজার রাত্রির আনন্দের সমান। তুমি যদি স্কেহেরাজাদের মতো কাহিনী বর্ণনায় ওস্তাদ হও তাহলে আমি ও তোমাকে অনেক বড় পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত করব। যত সব দৈনন্দিন জীবনের কথা আমার আর ভালো লাগে না।
প্ৰধার কর্মচারী : (তাড়াতাড়ি প্রবেশ করল) হে মহারাজ, এক অপ্রত্যাশিত সুসংবাদ সানন্দে ঘোষণা করছি আপনার নিকট। আমাদের রাজা এখন সকল অর্থকষ্ট হতে মুক্ত। এখন এখানে স্বর্গসুখ বিরাজ করবে।
প্রধান সেনাপতি : সৈন্যদের বেতন মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। নূতন সৈন্য নিয়োগ। করা হয়েছে।
সম্রাট : কি ব্যাপার! তোমাদের সকলের বুক স্ফীত হয়ে উঠেছে আনন্দে। সকলেরই মুখ উজ্জ্বল। সকলেরই পায়ের গতিতে দেখছি এক প্রাণোচ্ছলতা।
কোষাধ্যক্ষ : (প্রবেশ করে) ওঁদের জিজ্ঞাসা করুন, ওঁরাই এই সব কিছুর জন্য দায়ী। ওঁরাই এসব করেছেন।
ফাউস্ট : প্রধান প্রশাসককে একথা জানতে হবে।
প্রধান প্রশাসক : (ব্যস্তভাবে প্রবেশ করে) অতীতে দেখেছি হঠাৎ কার ভাগ্যের পাতাটা উল্টে গিয়ে গত দুঃখ সুখে পরিণত হয়েছে। এখন দেখছি উল্টো হলো। (পড়তে লাগলো। আমার হাতে যে পত্রটি দেখছেন তার দাম হাজার স্বর্ণমুকুটের সমান। এতে আছে সম্রাটের স্বাক্ষর। সম্রাট তাঁর সাম্রাজ্যের সমস্ত গুপ্তধন উদ্ধার করার ভার একটি লোকের হাতে দিয়ে নিজে সই করেছেন।
সম্রাট : এক বিরাট প্রতারণা। অপরাধ। কে সম্রাটের স্বাক্ষর জাল করেছে? এর কোনও শাস্তি এখনও দেওয়া হয়নি?
কোষাধক্ষ : স্মরণ করে দেখুন, আপনি গতরাত্রে আনার এই স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দান করেন। তখন আপনি শক্তিমান প্রকৃতিদেবতারূপে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর প্রধান প্রশাসক আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, হে মহারাজ, শুধু কলমের ডগা দিয়ে কয়েকটি অক্ষর লিখে জনগণের মঙ্গল করুন। তাদের আনন্দ দান করুন। আপনি তাই একটি পত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন আর সঙ্গে সঙ্গে সে সব চতুর যাদুকর ছিল আপনার কাছে সেই সব জাল করে হাজার হাজার কাগজের নোট ছাপিয়ে ফেলে। সেই সব নোট এখন বাজারে সর্বত্র চলছে।
সম্রাট : টাকা বা সোনার পরিবর্তে সেই নোট এখন চলছে? যদি চলে তাহলে ব্যাপারটা বিস্ময়কর হলেও আমাকে তা মেনে নিতে হবে।
প্রধান কর্মচারী : দাবানলের মতো সেই নোট সব জায়গায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং সোনা ও রূপোর পরিবর্তে মূল্যমান হিসাবে কাজ করছে। যে কোনও দোকানে এই নোট ভাঙিয়ে টাকা বা যে কোনও জিনিস কেনা যাচ্ছে। অনেক লোক আমোদ প্রমোদ করতে শুরু করে দিয়েছেন পান ও ভোজনের মাধ্যমে।
মেফিস্টোফেলিস : নির্জন প্রাসাদশীর্ষে যদি কোনও সম্ভ্রান্ত সুন্দরী মহিলাকে প্রীত করার প্রয়োজন হয় তাহরে সেখানে আর কাউকে থলেতে করে টাকা বয়ে নিতে যেতে হবে না। এই হালকা কাগজের নোট তার হাতে ধরে দিলেই সে মেয়ে প্রীত হবে। কোনও যাজক বা সৈনিককে দূরে কোথাও যেতে হলে কোমরে বলে ভর্তি সোনারূপো বয়ে নিয়ে যেত হবে না। এই হালকা কাগজের নোট নিয়ে গেলেই যথেষ্ট। এইবার তাহলে মহারাজ বিচার করবেন আমি ভালো করেছি না মন্দ করেছি।
ফাউস্ট : আপনার রাজ্যে এই ভুল মুদ্রাপদ্ধতির ফলে যত সব ধনরত্ন মানুষ মাটিতে গুপ্তস্থানে পুঁতে রাখত। কেউ বলতে পারত না কার কত সম্পত্তি আছে। অনেক সময় সে সম্পত্তির মালিক নিজেই তা জানত না। কিন্তু কল্পনাপ্রবণ যে মন প্রকৃতির রহস্য উদ্মাটনে ও সত্য সন্ধানে সক্ষম সে মন একদিন সব গুপ্তধনের পরিমাণও নির্ণয় করবেই।
