গান
জনতা এমনিই হয়। এমন অপরিণামদর্শিতার সঙ্গে তারা আসে আর যায়। ঝড়ের বেগে আসে। ঝড়ের বেগে চলে যায়।
গ্রাম্য দেবদেবী : হে গ্রাম্য দেবদেবীরা, তোমরা মাথায় ওক পাতার মুকুট পরে জোড়ায় জোড়ায় নাচতে এস। তোমাদের মোটা নাক, চওড়া ও থ্যাবড়া মুখ মেয়েদের খুব একটা অপছন্দ হবে না।
হাস্যরস : এই দেখো হাস্যরসের পিছনে ছাগলের মতো সরু সরু পা নিয়ে কারা আসছে। তারা পাহাড়ের উপরে একা একা থাকতে ভালোবাসে। ঘরসংসার বা ছেলে পরিবার ভালোবাসে না। তারা বলে তারাই একমাত্র পূতচরিত্র ঊধ্বজগতের মানুষ, সবকিছু থেকে মুক্ত।
মাটির দেবতা : জোনাকির ঝাঁকের মতো লণ্ঠন হাতে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ আসছে। চারদিকে এখানে-সেখানে ভিড় করছে তারা কিন্তু জোড়া জোড়া নেই। সব একা একা আপন স্বার্থের তাড়নায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা কিন্তু একমাত্র ভালো বা সৎ মানুষের বন্ধু। পাহাড়ের পাথর থেকে আমরা মূল্যবান ধাতু বার করি। আমাদের ভাণ্ডারেই আছে সেই সোনার খনি যার জন্য লুণ্ঠন মারামারি ও কাড়াকাড়ি করে যে লোহার দ্বারা নির্মিত অস্ত্র নিয়ে পৃথিবীর মানুষ খুনোখুনি করে সেই লোহাও আমাদের ভাণ্ডারেই আছে। আমাদের ধৈর্য অসাধারণ। মানুষের অসদাচরণে আমরা কখনও ধৈর্য হারাই না।
দৈত্যগণ : ওরা হচ্ছে অরণ্যচারী দৈত্যাকার মানুষ। হাতে ফারগাছের গুঁড়ি নিয়ে আসছে। পরণে শুধু গাছের পাতা।
জলপরীদের কোরাস : (প্যানের চারদিকে ভিড় করে) আমরা জানি পৃথিবীর যে অংশ প্রকৃতির দেবতা শক্তিশালী প্যানের অধীনে তার পরিমাণ বিশাল। তোমাদের মধ্যে যারা নৃত্যপটু তারা তাঁর কাছে গিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ নৃত্যকলা প্রদর্শন করো। তিনি দয়ালু, তিনি চান আমরা সকলে মিলে হাসিখুশির সঙ্গে বাস করি মুক্ত আকাশের তলে। তিনি সব সময় অতন্দ্র দৃষ্টিতে জেগে থাকেন স্থির হয়ে। অথচ তাঁরই নির্দেশে নদী অন্তহীন কলতানে তাকে গান শোনায়। গাছে গাছে পাতার মর্মরধ্বনি ওঠে, বাতাসে ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। পরীরা তাঁর কাছে যেতে সাহস পায় না। কিন্তু তিনি মাঝে মাঝে যখন বজ্রগর্জনে চিৎকার করে ওঠেন তখন চারদিকে সবাই ভয়ে পালিয়ে যায়। বীরপুরুষেরাও ভয়ে কাঁপতে থাকে।
মাটির দেবতাদের প্রতিনিধিবৃন্দ : (প্যানের কাছে) যখন তুমি যত সব উজ্জ্বল রত্নসম্ভার ও সম্পদরাশি মানুষের মধ্যে ভাগ করে দাও, কিন্তু তখন অন্ধকার গুহার মধ্যে সকলের অলক্ষে অগোচরে বাস করি। কিন্তু আমাদের কথা বিশ্বাস করো, এখানে এক আশ্চর্য ঝর্নাধারা বয়ে চলেছে। এই ঝর্নাই আমাদের দেবে আমাদের আকাক্ষিত বস্তু। কিন্তু তাতে চাই তোমার সক্রিয় সাহায্য। মায়ার আবরণ স্থির করে সে সম্পদ করায়ত্ত করো ও বিশ্বের সকলের উপকার সাধন করো।
প্লুটাস (প্রহরীকে) : সর্বশক্তি দিয়ে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। অপ্রত্যাশিত হলেও যা ঘটার ঘটুক। তোমার সাহস আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে যে ভয়াবহ বস্তু দেখবে তা বিশ্বে কেউ কখনও দেখেনি এর আগে। এর বিবরণ ঠিকমতো লিখে রাখবে।
প্রহরী : (প্লুটাসধৃত যাদুকাঠিটি ধরে) বামনাকৃতি মাটির দেবতারা প্রকৃতিদেবতা প্যানকে সঙ্গে করে এই মায়াময় ঝর্নার ধারে নিয়ে যাচ্ছে। তার উপরটা অন্ধকার দেখাচ্ছে। কানায় কানায় ঝরা ঝর্নার জলটা ফুটছে। তার থেকে বুদ্বুদ উঠছে। ফেনা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। প্যান প্রফুল্লচিত্তে সেই ঝর্নার ধারে দাঁড়িয়ে সেটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি যেমন ঝুঁকে পড়ে ঝর্নার জলধারা দেখতে গেলেন। অমনি হঠাৎ তাঁর দাড়িটা থুতনি থেকে খসে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথা বুক ও গলার মাথায় আগুন ধরে। এইভাবে আনন্দানুষ্ঠান মাটি হয়ে গেল। সবাই তখন সে আগুন নেভাবার জন্য চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কেউ তা পারল না। মুখোশধারী সব। লোকের মুখে আগুন ধরে গেল। এইভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কিন্তু শোনো। শোনো, কি এক দুঃসংবাদ লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের দুঃখবৃদ্ধিকারী সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা আগামীকাল জানতে পারবে। সর্বত্র শুনছি এক কথা, আমাদের সম্রাট নিদারুণ যন্ত্রণায় ভুগছেন। তাঁরা মাথা ও বুক অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। ঈশ্বর করুক এ সংবাদ যেন মিথ্যা হয়। যারা তাঁকে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছে তারা জাহান্নামে যাক। হে উদ্দাম উদ্ধত যৌবন, তুমি কি এই দুঃখের দিনেও তোমার আনন্দের উচ্ছলতা বন্ধ করবে না, সীমায়িত করবে না? আমাদের প্রিয় সর্বশক্তিমান সম্রাট, তুমি কি আমার স্বভাবসিদ্ধ বিজ্ঞতা সহকারে আমাদের পরিচালিত করবে না? এক সর্বগ্রাসী দাবানলে দগ্ধ হচ্ছে সমস্ত বনভূমি। আগুনের লেলিহান শিখাগুলো তাদের লোহজিহ্বা ঊর্ধ্বে তুলে দিয়ে দাহ্য বস্তুর সন্ধান করেছে। আমাদের দুঃখের পাত্র পরিপ্লাবিত, কে জানে কে আমাদের উদ্ধার করবে? আজকের এই রাজকীয় ঐশ্বর্যের পুঞ্জীভূত অহঙ্কার রাত্রি রেশে একরাশ ভস্মতূপে পরিণত হয়ে পড়ে থাকবে।
প্লুটাস : যথেষ্ট সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছে। এবার সাহায্য দাও ওদের। তোমার জ্যোতির্ময় যাদুকাঠিটি দিয়ে আঘাত করে তোমার পদতলের মাটি কম্পিত করো। হে বাতাস, শীতল কুয়াশার জাল বিস্তার করে এই ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড নির্বাপিত করো। মেঘ হলে জল বর্ষণ করো অগ্নিকাণ্ডের উপর। হে আর্দ্রতা, অগ্নি লেলিহান শিখাকে প্রশমিত করে গ্রীষ্মের ক্ষয়-ক্ষতিহীন নির্দোষ বিদ্যুতালোকে পরিণত করো। মনে মনে সব মানুষ যখন জব্দ তখন এবার আসল যাদুর খেলা দেখাও। আগুনের খেলা শেষ করো।
চতুর্থ দৃশ্য
প্রমোদ উদ্যান
