আমি তাদের নিয়ে যেতে এসেছি।
প্রহরী : না, তা পারি না; কারণ তোমার নাম আমি জানি না।
বালক সারথি : তবু চেষ্টা করে দেখো।
প্রহরী : আপাতদৃষ্টিতে তোমাকে দেখে সুন্দর এক তরুণ যুবক বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আসলে অর্ধপরিণত এক যুবক, এখনও নারীসুলভ স্বভাব ঘোচেনি তোমার। মনে হচ্ছে চপলমতি এক চটুল প্রেমিক যে তার পুরনো প্রেমিকার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে নূতন একজনের সন্ধান করছে।
বালক : বলে যাও, খুব ভালো লাগছে। এ রহস্যের সমাধান তুমিই করবে।
প্রহরী : তোমার ভ্রমরকৃষ্ণ চোখে বিদ্যুতের ঝলক। মাথায় নারীসুলভ কেশপাশে কুষ্ণাভ দীপ্তি। তোমার আজানুলম্বিত পোশাকে বিচিত্র ফুলের কারুকার্য। তোমাকে দেখে কোনও কুমারী মেয়ের মতো মনে হয়। যদিও অবশ্য কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়লে সে তোমাকে সমুচিত শিক্ষা দেবে।
বালক সারথি : আর যে জ্যোতির্ময় পুরুষ রথোপরি সিংহাসনে উপবিষ্ট আছেন?
প্রহরী : ওকে দেখে মেনে হবে স্বর্গলোকের রাজা। ওঁর কৃপা যারা লাভ করতে পেরেছে তারা সত্যই ভাগ্যবান। তাঁর যেন পাবার বা চাইবার কিছুই নেই। তিনি পরম পূর্ণ পুরুষ। তাদের চোখ সামান্য পলকপাতে সব অভাব সব অপূর্ণতা পূর্ণ হয়ে যায়। এক পরম পাওয়ার উল্লাস সব চাওয়ার আর্তিকে ভুলিয়ে দেয়।
বালক সারথি : সব কথা বলতে সাহস করছ না। আমি বলছি পরিপূর্ণভাবে তাঁর রূপ বর্ণনা করো।
প্রহরী : আমি শুধু তার মর্যাদা ও মহিমার কথা বলিনি। মাথায় পাগড়ির নিচে উজ্জ্বল দুটি গণ্ডসমন্বিত মুখে পূর্ণচন্দ্রের প্রভা বিরাজ করছে। তার উপর তার পোশাকের ঔজ্জ্বল্য। কি বর্ণনা করব। নিশ্চয় তিনি কোনও রাজাধিরাজ।
বালক সারথি : উনি হচ্ছেন স্বর্ণ ও সম্পদের দেবতা প্লুটাস। সম্রাটের অনুরোধক্রমে উনি এসেছেন আপন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে।
প্রহরী : এ বিষয়ে যা জান বলো আমায়।
বালক সারথি : আমি হচ্ছি আবেগ, আমি হচ্ছি কাব্য। আমি হচ্ছি কবি যে পার্থিব কোনও সম্পদ গ্রাহ্য করে না। অথচ যার অন্তর সব সময় আপন অপরিমেয় সম্পদে পরিপূর্ণ। পুটাসের মতো আমিও সমমর্যাদাসম্পন্ন। আমি আমার কাব্যকলার দ্বারা তাঁর ভোজসভাকে অলঙ্কৃত করি। তাঁর সব অভাব পূরণ করি।
প্রহরী : মুখে শুধু বড়াই করলে হবে না। তোমার কাব্যকলার প্রত্যক্ষ পরিচয় দাও।
বালক সারথি : (হাতের আঙুল নেড়ে) এই দেখো, আমি আমার আঙুলগুলো নাড়ছি, আর কত রকমের রঙিন আলো বেরিয়ে আসছে। কত মণিমুক্তাখচিত অঙ্গুরীয় আর অবতংস ঝরে পড়ছে আমার আঙুল থেকে। এইভাবে আলোকপাত ছড়িয়ে দিতে পারি প্রয়োজন হলে।
প্রহরী : জনতা কত ব্যাকুলভাবে এই সব মনিমুক্তো পাবার জন্য চেষ্টা করছে। তারা দাতার চারদিকে ভিড় করে ব্যথভাবে প্রতীক্ষা করছে। স্বপ্নদৃষ্ট অলীক বস্তুর মতো তারা ঐ সব ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। এই সব মণিমুক্তো ধরতে না ধরতে তাদের হাত থেকে উড়ে যাচ্ছে মণিমুক্তে যেন রঙিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে তাদের চারপাশে।
বালক সারথি : তুমি তোমার কাজ করো। দেখে মনে হচ্ছে তুমি মোগ্য ব্যক্তি। কিন্তু আমি ঝগড়া করতে চাই না। আমার প্রধানের কাছে যা বলার বলো। (পুটাসের প্রতি) বলো সে স্বর্গদেবতা, তুমি কি আমার উপর বিশ্বাস রেখে এই রথচালনা ও রথাশ্বের গতিবেগ নিয়ন্ত্রিত করার ভার দাওনি? তোমার কথামতোই আমি থেমেছি। আমি যে যুদ্ধে তোমাকে সাহায্য করেছি সে যুদ্ধে সহজ হয়েছে তোমার জয়। আমি অলঙ্কৃত করে তুলেছি তোমার জয়ের মালাকে।
প্লুটাস : সাক্ষ্য প্রদানের প্রয়োজন হলে আমি সানন্দে বলব তুমি হচ্ছ আমার আত্মার আত্মীয়। তোমার কলানৈপূণ্য সত্যিই বড় অদ্ভুত। তোমার কাব্যকলার। খাতিরেই আমি আমার স্বর্ণমুকুটের থেকে সবুজ বৃক্ষশাখাকে বড় মনে করি। সকলের কাছে আমি জোর গলায় শুধু একটা কথাই বলতে চাই, আমি তোমার সাহচর্যে বিশেষ আনন্দ পাই।
বালক সারথি : মণিমুক্তাসদৃশ যে সম্পদ আমি আমার চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছি তা হচ্ছে আমার শুধু উজ্জ্বল কথার ফুলঝুরি। কিন্তু তার উজ্জ্বলতা কত ক্ষণস্থায়ী। সে আলো অনেকের চোখে ধরা পড়তে না পড়তেই আঁধারে পরিণত হয়।
নারীদের কথাবার্তা
রথের উপর যে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে তার পিছনে ভাঁড়ের মতো যে লোকটা রয়েছে তাকে দেখে মনে হচ্ছে ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় সে কৃশকায় হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে তার গায়ে হাড়ের উপর শুধু চামড়া ঢাকা আছে, মাংস নেই।
অর্থলোভ : হে নারীগণ, তোরা বড় বিতৃষ্ণাজনক। আমি যেখানেই যাই তোমরাও সেখানেও যাও। আমি যে মিতব্যয়িতাকে ভালোবাসি তোমরা সেটাকে দোষ ভাবো। টাকার থেকে তোমাদের কামনা-বাসনার পরিমাণ বেশি। তোমরা তোমাদের দেহ ও প্রেমিকদের পিছনে অযথা টাকা খরচ করে তোমাদের স্বামীদের ঋণগ্রস্ত করে তোলে। খাদ্য ও পানীয় তোমাদের কাছে বিলাসিতা।
নারীদের নেত্রী : ড্রাগনের মতোই ভয়ঙ্কর। জনতাকে অনুপ্রাণিত করতে এসে যত গোলমাল বাধাচ্ছে।
নারী জনতা : ওরে রথের উপর থেকে নামিয়ে দাও। ও ভেবেছে ওর কুৎসিত মুখ দেখে আমরা ভয় পাব। ওর লম্বা লম্বা কথার জন্য ওকে দুঃখভোগ করতে হবে।
প্রহরী : আমি আমার এই যাদুকাঠি ছুঁয়ে বলছি, সব স্থির হয়ে থাকো। কেউ নড়বে না। আমার সাহায্যের অবশ্য কোনও দরকার নেই। দেখো দেখো কেমন করে। সর্পাকৃতি ড্রাগনগুলো গলায় জ্বলন্ত আগুন নিয়ে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। ওদের জন্য জনতার অনেকেই চলে গেছে। এখন ঘর ফাঁকা।
