সম্রাট : আমি তার কথার মধ্যে দুটো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি। কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি na।
জনতা : তাহলে সে কথা বলার অর্থ কি? আমরা শুনেও কিছু বুঝতে পারিনি।
মেফিস্টোফেলিস : তারা হতবুদ্ধি ও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চারদিকে। তারা কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছে না আমার যাদুতে। কিন্তু কেন তারা অবিশ্বাস করবে, কেন তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করবে? তারা নিজেরা তাদের পায়ের মধ্যেই এর প্রভাব বুঝতে পারছে। তারা হাঁটতে গেলেই তা বুঝতে পারবে। এইভাবে প্রকৃতি যে গোপন শক্তি বিশ্ব সৃষ্টির সর্বত্র কাজ করে যায় তার প্রভাব যে কোনও জায়গায় যেতে পারে মানুষ। তার আপন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অনুভব করতে পারে সে শক্তি। সুতরাং যে কোনও জায়গাতেই মাটি খুঁড়লেই সোনা পাওয়া যাবে না কেন? সোনা তো প্রকৃতিরই দান।
জনতা : আমার পাটা সীসের মতো ভারী হয়ে উঠেছে। আমার হাতে বাতের মতো ব্যথা করছে। আমার পিঠেতেও ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে এই জায়গাতেই গুপ্তধন। আছে প্রচুর।
সম্রাট : তাড়াতাড়ি করো। তোমার কথার পরীক্ষা হয়ে যাক। কোথায় কোন জায়গায় সোনা যাওয়া যাবে দেখিয়ে দাও। আমি আমার রাজমুকুট আর রাজদণ্ড ছুঁয়ে শপথ করছি, আমি আমার যথাসর্বস্ব তোমাকে দান করব যদি তোমার কথা সত্য হয়। তোমার সঙ্গে আমার চিরদিনের অক্ষয় বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে। আর তোমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হলে তোমাকে নরকে পাঠাব।
মেফিস্টোফেলিস : আমি পথটা দেখিয়ে দেব। কিন্তু ঠিক জায়গাটা বলব না। তা খুঁজে নিতে হবে। যে কোনও জায়গাতেই সোনা পাওয়া যেতে পারে। একটা গরিব চাষিও মাটির কোনও দেওয়ালের ভিতর সোনার হাঁড়ি পেয়ে যেতে পারে। তবে সোনার অনুসন্ধানকারীদের রাত্রির অন্ধকারে বার হতে হয়। যারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তাদের বিশ্বাস করবে। শুধু সোনা নয়, ভালো মদও নিহিতও আছে মাটির গর্তে। যে রহস্য দিনের বেলায় হাসির উদ্রেক করে, রাত্রিতেই তাই জীবন্ত হয়ে উঠবে। ১৩৪ গ্যেটে বচনাসমগ
সম্রাট : তুমি আসলে তাদের পথ দেখিয়ে দাও। এসব হেঁয়ালির দরকার কি? সত্যিকারের মূল্যবান বস্তু যদি কোথাও থাকে তাহলে তা দিনের বেলাও পাওয়া যাবে। রাত্রিবেলায় তো সব কিছুই কালো দেখায়। গরু-বেড়াল সব। তখন কোনটা সোনা কোনটা কি বোঝাই যায় না। সুতরাং এখন মাটি কর্ষণ করে সোনা বার করো।
মেফিস্টোফেলিস : আপনি নিজে কোদাল দিয়ে চাষির মতো মাটি কর্ষণ করুন। তাহলে তার পুরস্কারস্বরূপ আপনি একপাত্র সোনার মোহর পাবেন। তার সঙ্গে অনেক মণিমুক্তাও পাবেন। সেই সব জিনিস আপনার ও রানিমার রাজকীয় ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য বুদ্ধি পাবে।
সম্রাট : তাহলে তাড়াতাড়ি করো। কতক্ষণ লাগবে?
জ্যোতিষী : (মেফিস্টোফেলিসের কথামতো বলতে লাগল) মহারাজ, আপনার কামনার এই ব্যাকুলতাকে সংযত করতে হবে প্রথমে। প্রথমে এইসব উৎসব-আনন্দ বন্ধ করতে হবে। এর দ্বারা কোনও বড় কাজ হয় না। প্রথমে আত্মস্থ হতে হবে আমাদের। উচ্চ বস্তু নিচু জায়গা থেকেই পাওয়া যাবে। কিন্তু ভালো পেতে হলে ভালো হতে হবে। আনন্দ লাভ করতে হলে প্রথমে রক্তের উদ্দামতাকে সংযত করতে হবে। মদ পেতে হলে আঙ্গুর পিষতে হবে। অলৌকিক কোনও ফল পেতে হলে আগে বিশ্বাসকে অটল করতে হবে।
সম্রাট : ঠিক আছে, উৎসব শেষ হয়ে আসছে বুধবার। ঐদিন সব আনন্দ উৎসবের শেষ। তবে তার আগে আমরা বিজয় উৎসব পালন করব।
(বাদ্যও সকলের প্রস্থান)
মেফিস্টোফেলিস : ভাগ্যের সঙ্গে সদগুণের সম্পর্ক কত নিবিড়। এই বোকাগুলোর মাথায় এ কথাটা কিছুতেই ঢোকে না।
তৃতীয় দৃশ্য
কতকগুলি কক্ষসমন্বিত এক প্রশস্ত হলঘর
(উৎসব ও মুখোশনৃত্যের জন্য সাজানো)
প্রহরী : ডোব না, আমাদের এই জার্মান দেশে এসে তোমাদের মতো ভড়দের মৃত্যু হবে। আমাদের সম্রাট আল্পস পর্বত অতিক্রম করে রোমে অভিযান করে যে বিজয়গৌরব লাভ করেছেন, এ উৎসব তারই জন্য। আজ আমরা সকলে নবজাত শিশুর মতো চঞ্চল, নিরুদ্বেগ। আজ হাজার হাজার নরনারী মত্ত হয়ে উঠেছে এ উৎসবে। সমস্ত পৃথিবীটাই মনে হচ্ছে যেন নির্বোধদের আড্ডাখানা।
উদ্যানবালিকারা
(ম্যান্ডেলিনসহযোগে গান)
আজ আমরা এই উৎসবের সাজে সজ্জিত হয়ে
অর্জন করেছি তোমাদের মুগ্ধ দৃষ্টির প্রশংসা।
জার্মানদেশের রাজদরবারে আমাদের দেখে মনে হচ্ছে
আমরা যেন ফ্লোরেন্সের বালিকা।
আমাদের বাদামী চুলের উপর ফুলের গয়না
পরি আমরা আর বাঁধি রেশমী ফিতে।
বসন্তের বিচিত্র ফুল দিয়ে যে মালা আমরা গাঁথি
সেই মালাগাথার কারুকার্য দেখেই বুঝতে পারবে আমাদের গুণ।
প্রতিটি রঙের ফুল ঠিক ঠিক জায়গায় বসেছে।
সব মিলিয়ে তোমাদের আনন্দ দান করবে।
আমরা সুন্দরী উদ্ভিন্নযৌবনা উদ্যানবালিকা,
হালকা খুশির হাওয়ায় ভরা আমাদের বুক
নারী হয়েও আমরা কলাকুশলিনী।
প্রহরী : হে উদ্যানবালিকারা, হাতে ও গলায় ফুলের গয়না পরে যে সব ফুলের ঝুড়ি মাথায় বয়ে নিয়ে চলেছ তা একবার দেখতে দাও।
উদ্যানবালিকারা : এ ফুল বিক্রির জন্য নয়। যারা শুধু ফুল দেখে আনন্দ পায় তারাই ফুলের প্রকৃত মান কি তা জানে।
ফলবতী অলিভশাখা : আমি ফুলে লোভ করি না। যে কোনও ধরনের বিরোধ আমি এড়িয়ে চলতে চাই। সব দেশে আমি শান্তির প্রতীক। আজ এই উৎসবের দিনে যোগ্য ব্যক্তির মাথাকে শোভিত করতে চাই আমি।
