প্রধান তত্ত্বাবধায়ক : এমন কি আমি নিজে যা কিছু পাচ্ছি সব সঞ্চয় করছি শুধু। তবু প্রয়োজন মিটছে না। মাংসের জন্য বনের পশু নির্বিচারে শিকার করা হচ্ছে, কিন্তু রাজ্যে ভালো মদ নেই। রাজকোষে টাকা না থাকলেও নাচ-গানের খরচ মেটাতে হয়। ইহুদীদের দেনা কয়েক বছরেও শোধ হবে না। শূকরদের গায়ে চর্বি না জমতেই তাদের বধ করতে হয়। অনেককে মাথার বালিশ বাধা দিতে হয়। রুটিগুলো সেঁকতে সেঁকতেই পেটে চলে যায়।
সম্রাট : (কিছু চিন্তার পর মেফিস্টোফেলিসকে) বলো ভাঁড়, এত সব অভাবের সঙ্গে তুমি কোনও অভাবের কথা জুড়ে দিতে পার কি না।
মেফিস্টোফেলিস : আমি? মোটেই না। আমি শুধু দেখছি আপনাকে আর আপনার মস্তকোপরি বৃত্তাকারে বিরাজিত সৌভাগ্যের জ্যোতিঃপুঞ্জকে। রাজা যেখানে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, যেখানে রাজশক্তি শক্রশক্তিতে ছত্রভঙ্গ ও দেশ থেকে বিতাড়িত করতে পারে, যেখানে রাজার পিছনে অনুরক্ত প্রজাদের সংগঠিত আনুগত্য এখনও অটুট, সেখাসে অবিশ্বাস ও হতাশার কি থাকতে পারে? যেখানে এত সব উজ্জ্বল নক্ষত্র বিরাজমান সেখানে কোনও অশুভ শক্তি খারাপ কিছু করতে পারে?
জনতা : লোকটা ভবঘুরে। কে জানে কি আছে ওর মনের মধ্যে। এ আবার জ্যোতিষ নয় তো?
মেফিস্টোফেলিস : জগতে অভাব কোথায় নেই? হয় এখানে, নয় ওখানে, টাকার অভাব সর্বত্র। এটা ঠিক যে এই মুহূর্তে আপনি অর্থ সংগ্রহ করতে পারছেন না। পর্বতকন্দরে বা বহু গুপ্তস্থানে বহু সোনা ও টাকা গুপ্ত অবস্থায় আছে। তা খুঁজে বার করতে হবে। আপনি হুকুম দিন, কে তার সন্ধান দিতে পারে। যার মন এবং প্রকৃতি শক্তিসম্পন্ন সেই তা পারে।
প্রধান প্রশাসক : মন আর প্রকৃতি-খ্রিস্টানদের কাছে এ কথা বলি না আমরা। এসব নাস্তিকদের কথা এবং তাদের আমরা পুড়িয়ে মারতে চাই। এসব কথা বিপজ্জনক। প্রকৃতি মানেই পাপ আর মন হচ্ছে শয়তান। তারা শুধু নির্লজ্জভাবে সংশয় উৎপন্ন করে যায়। আমরা এ সব মানি না। দুই শ্রেণীর মানুষ আমাদের রাজ্য চালাচ্ছে। তারা হলো সাধু-সন্ন্যাসী আর বীর নাইট। তারাই যত গির্জা আর রাষ্ট্র চালায়। আর যে সব কুৎসিত মনের মানুষ সংশয় সৃষ্টি করে চলে তারা মায়াবী নাস্তিক। তারা বিভ্রান্তির দ্বারা রাজ্য ধ্বংস করে ফেলে। তাদের আমরা শত্রু হিসাবে দেখি এবং ধ্বংস করে থাকি। তুমি কি দুর্নীতি আমদানি করতে চাও বিদেশ থেকে?
মেফিস্টোফেলিস : বাঃ, আমি দেখছি আপনি এক বিজ্ঞ সভাসদ। আপনি যেটা ছুঁতে পারছেন না তা কিন্তু আপনার অদূরেই আছে। আপনি যা ধরতে পারছেন না ভাবছেন তার অস্তিত্ব নেই। আপনি যা বুঝতে পারছেন তা ভাবছেন তা সত্য নয়। আপনি যা ওজন করতে পারছেন না ভাবছেন তার ওজন নেই। যে মুদ্রা ভাঙাতে পারছেন না ভাবছেন তা অচল।
সম্রাট : এখন ভেবে দেখো আমাদের এই প্রয়োজনে কিভাবে সাহায্য করতে পার তুমি। উপদেশ দিয়ে কোনও লাভ নেই। এখন চাই টাকা। দেখো, কোথায় কিভাবে সে টাকা পাওয়া যায়।
মেফিস্টোফেলিস : আপনি যা চাইছেন আমি তার থেকে আরও বেশি দেব আপনাকে। এটা খুবই হালকা কাজ। তবে হালকা কাজই করা কঠিন। আসল কথা সোনা তো আপনার হাতের কাছেই রয়েছে। শুধু কৌশলে তা হস্তগত করতে হবে। মনে ভাবুন, অতীতে কত সম্রাট কত রাজ্য জয় করেছেন। সেই সব রাজ্যের কত ধনরত্ন তারা মাটির তলায় পুঁতে রেখেছেন। সেই মাটি যখন আপনার তখন তার গর্ভনিহিত ধনরত্নও আপনার।
কোষাধ্যক্ষ : বোকা ভাড় হলেও ওর কথাগুলো বুদ্ধিদীপ্ত। হ্যাঁ, এ অধিকার সম্রাটের আছে।
প্রধান প্রশাসক : শয়তান আমাদের ধরার জন্য স্বর্ণজাল বিস্তার করছে। এসব কাজ কোনওমতেই ন্যায়সঙ্গত নয়।
প্রধান তত্ত্বাবধায়ক : ওকে আগে সেইসব ধনরত্ন রাজসভায় আনতে দাও। ও নিজেও তার অংশ নিক। আর যদি তাতে অন্যায় হয় তাহলেও আমি তা সব নিয়ে যাব।
প্রধান সেনাপতি : ভাঁড় অত্যন্ত কূটনীতিজ্ঞ। সে সকলের মনে লোভ জাগিয়ে তুলছে। আমরা ধনরত্ন চাই, তা কোথা থেকে আসছে তা দেখব না।
মেফিস্টোফেলিস : আপনারা হয়ত ভাববেন আমি বাজে কথায় মন ভোলাচ্ছি। এই তো জ্যোতিষী রয়েছেন। ওঁকে জিজ্ঞাসা করুন। কালের গতি তো ওঁর নখদর্পণে। উনি বলুন এখন গ্রহনক্ষের অবস্থান কি।
জনতার গুঞ্জন : ওরা দুজনেই দুবৃত্ত। ওরা দুজনেই এখন মিলেছে। দুজনেই রাজার সিংহাসনের পাশে জড়ো হয়েছে। লোকটা ভাঁড় হলেও বিজ্ঞের মতো কথা বলছে।
(মেফিস্টোফেলিস যা বলার তাই বলে)
জ্যোতিষী : রবি এখন খাঁটি সোনার মতো উজ্জ্বল। রবি সিংহাসনে, বুধ প্রহরী, স্নেহ আর বেতনের জন্য সেবা করে। মোহময়ী নারীরূপিনী শুক্র আমাদের সকলেরই পানে স্নেহভরে তাকাচ্ছেন। সতী চন্দ্র বড় খেয়ালী ভাবাপন্ন। মঙ্গল আপনাদের ভয় দেখাচ্ছে, কিন্তু আঘাত করবে না। ভয় নেই, বৃহস্পতি এখনও চমৎকার ঐশ্বর্যময় নক্ষত্ররূপে বিরাজ করছে। শনি খুব দূরবর্তী এবং আকারে ছোট দেখালেও আসলে কিন্তু গ্রহ হিসাবে অনেক বড়। আমরা এমন কোনও ধাতুকে গুরুত্ব দিই না যা ওজনে ভারী কিন্তু মূল্যবান নয়। যেখানে সোনা আর রূপা দুই ধাতু এক জায়গায় হয় তখন মানুষের অপ্রাপ্য কিছু থাকে না। তখন প্রাসাদ বাগান সম্পত্তি সব কিছু হয়। সেই সোনা এবং রূপাকে কোথা থেকে সংগ্রহ করবে তা কেউ জানে না।
