এইভাবে আমি ছুটে যাই সামনের দিকে আর আমার পিছনে পড়ে থাকে উজ্জ্বল সূর্যের আলোকমালা, ঝর্নারা ছুটে যাক পাহাড়ের গা বেয়ে। উপত্যকার বুকের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাক নদীরা। রামধনু ফুটে উঠুক দিগন্তে। মানুষের জীবন সংগ্রামের প্রকৃত কোনও প্রতীক কিন্তু প্রকৃতি জগতে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা বেশ বোঝ যায় জীবনে আসলে আলো নয়, অস্বচ্ছ বস্তুতে প্রতিরুদ্ধ প্রতিসৃত আলোকতরঙ্গ হতে বিচ্ছুরত বর্ণমালামাত্র।
দ্বিতীয় দৃশ্য
সম্রাটের সৌধ
দরবারগৃহ : ম্রাটের জন্য প্রতীক্ষারত রাজ্য পরিষদের সদস্যরা।
বাদ্য : সুসজ্জিত সভাসদবর্গের পিছু পিছু সম্রাট সিংহাসনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর ডান দিকে ছিল জনৈক জ্যোতিষী।
সম্রাট : হে আমার প্রিয় বিশ্বস্ত পরিষদবর্গ, আপনারা বহু দূর-দূরান্ত হতে এসেছেন। আমার পাশে এক বিজ্ঞজনকে দেখছি, কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী সেই ভাঁড় কোথায়?
ভূম্যাধিকারী : আপনার পোশাকের আঁচলে আটকে গিয়ে হঠাৎ সিঁড়ি থেকে পড়ে যায়। সে প্রচুর মদ্যপান করেছে কি না কেউ জানে না। তবে তার মোটা দেহটাকে লোকে ধরাধরি করে বয়ে নিয়ে গেছে। এখন সে মৃত কি অচৈতন্য কেউ তা জানে না।
দ্বিতীয় ভূম্যাধিকারী : সেই ভাঁড়ের স্থান অধিকার করার জন্য অদ্ভুত পোশাক পরে আর একজন ভাঁড় সকলকে ঠেলে এসে হাজির হয়। তার অদ্ভুত চেহারা দেখে চমকে ওঠে সকলে। প্রহরীরা তাকে আটক করলেও সে জোর করে ঢুকে পড়ে। ঐ এসে গেছে সে।
সিংহাসনের সামনে নতজানু হয়ে
মেফিস্টোফেলিস : মানুষ কোনো জিনিস অভিশপ্ত হলেও তা আগ্রহের সঙ্গে প্রত্যাশা করে? মানুষ কোনো জিনিস কামনা করে তা পেয়ে সারা জীবন ছুটে চলে তার পিছনে? কোন জিনিস যত্নের সঙ্গে রক্ষা করে চলে মানুষ কে সবচেয়ে ধিকৃত ও অপমানিত? কার কথা আপনারা শুনতে চান না? আবার কার কথা মানুষ স্বেচ্ছায় শুনতে চায়? কে আপনার সিংহাসনের কাছে আসতে চায়? আবার কে আপনার সিংহাসনের হতে দূরে থাকতে চায়?
সম্রাট : এখন এ সব কথা থাক। এখন সময়র বড় অভাব। এখন ধাঁধার সমাধানের উপযুক্ত স্থান এটা নয়। এই ভদ্রমহোদয়গণ একসময় এই সব ধাঁধার উত্তর দেবেন। তুমি নিজেই এর সমাধান করো। আমি তা শুনতে চাই। আমার পুরনো ভাঁড় এখন চলে গেলে সীমাহীন দূরত্বের দেশে। তার স্থান অধিকার করে আমার সাহায্য করো। আমাকে এসে বস।
মেফিস্টোফেলিসের সম্রাটের বাঁ পাশে গিয়ে বসল
জনতারা গুঞ্জনধ্বনি করে বলতে লাগল
আবার এক ভাড় এল–চিন্তার কথা। কোথা থেকে এল? কেমন করে ঢুকল এখানে? পুরনোটা মারা গেল। সে ছিল পিপের মতো মোটা। লাঠির মতো সরু।
সম্রাট : হে আমার প্রিয়, অনুরক্ত ও দূরাগত পরিষদবর্গ! আপনাদের স্বাগত জানাই। এখন আমাদের রাজ্যে সুসময় এবং সৌভাগ্য বিরাজ করছে। কিন্তু এই আনন্দের দিনে যখন সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে উৎসব করা উচিত তখন আপনারা কেন কোনও এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় যোগদান করতে চান?
প্রধান প্রশাসক : আমরা যাকে মানুষের মহৎ গুণ বলে থাকি তা একমাত্র সম্রাটের মাথাতেই আছে এবং একমাত্র সম্রাটই তার প্রয়োগ করতে পারেন। এই রাজ্যে এখন একের পর এক করে অন্যায় এমনভাবে বেড়ে চলেছে যে প্রতিটি মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে আপনার কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছে। চারদিকে অসত্য আর অরাজকতা বিরাজ করছে। অশুভ দুঃস্বপ্নের মতো আইনশঙ্খলার অভাবজনিত ভয়ে পীড়িত হয়ে উঠছে। মানুষের মন।
এ রাজ্যে কেউ মানুষের গবাদি পশু চুরি করেছে, কেউ মেয়ে চুরি করছে। চোরেরা বড়াই করে বেড়াচ্ছে : অভিযোগকারীদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে এইভাবে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠছে। এমন কি ধর্মস্থানের বেদী থেকে কাপ, ক্রশ ও বাতি চুরি হচ্ছে। নির্দোষ নিরীহ লোকদের ধনপ্রাণ নষ্ট করছে দুর্বত্তরা। এই ব্যাপক অন্যায় আর অরাজকতায় রাজত্বে কোনও মানুষের মধ্যে শুভবুদ্ধি অবশিষ্ট থাকতে পারে। ফলে ভালোরাও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এমন কি বিচারকরাও দোষীর শাস্তি বিধান করতে পারছেন না। আমি দেশের বর্তমান দূরবস্থার যে চিত্র তুলে ধরেছি তা কালো হলেও তা প্রকৃত অবস্থার অংশমাত্র। (কিছুটা থেমে) যেখানে সকলেই অপরাধ করে এবং কেউ সুবিচার পায় না সেখানেও স্বয়ং সম্রাটকে দোষী সাজতে হয়।
প্রধান সেনাপতি : এই অরাজকতার দিনে ঝগড়া-বিবাদের সংখ্যা ও গোলমাল বেড়েই চলেছে। একে অন্যকে আঘাত করে চলেছে। কেউ কোনও আইনের নির্দেশ মানছে না। চোর চুরি করেও নিরাপদ আড্ডায় রয়ে গেছে। নাইটরা মিথ্যা শপথ করছে আর ভঙ্গ করছে। ভাড়াটে সৈন্যরা মাইনে চাইছে। না দিলে তারা একযোগে পালিয়ে। যাবে। যে রাজ্য তারা একদিন পাহারা দিয়ে রক্ষা করতে এসেছিল আজ তা তারা বিধ্বস্ত করে দিতে চায়। আমাদের রাজ্যের সীমান্তের বাইরে যে সব রাজা আছে তারা মাথা ঘামাতে চায় এ সব সমস্যায়।
কোষাধ্যক্ষ : আর মিত্রশক্তিকে বিশ্বাস করলে আমাদের ঠকতে হবে। তারা আমাদের অসময়ে টাকা দেবার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা পূরণ করেনি। তাদের প্রতিশ্রুত সাহায্য এসে পৌঁছায়নি। বলুন মহারাজ, আপনার এই বিশাল রাজ্যের শাসনভার কার হাতে ন্যস্ত এখন। এখন দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে সবাই রাজা। সবাই স্বাধীন, আপন আপন মতে চলছে। আমাদের ভৃত্যরাও স্বাধিকারে মত্ত হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও আর বিশ্বাস করা যায় না। তারা শুধু ঝগড়া করে পরস্পরের সঙ্গে, দেশের কোনও ভালো করে না। কেউ প্রতিবেশীর মঙ্গল চায় না। চায় ব্যক্তিগত স্বার্থপূরণ। সকলেই ব্যক্তিগতভাবে অর্থ অর্থসঞ্চয় করছে। এদিকে আমাদের রাজকোষ শূন্য।
