মার্গারেট : কে ওখানে? এই পবিত্র স্থানে কি সে চায়? সে আমাকে চায়।
ফাউস্ট : তুমি বাঁচবে।
মার্গারেট : হে ঈশ্বর! আমি তোমার বিচারের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।
মেফিস্টোফেলিস : চলে এস। তা না হলে তোমাদের দুজনকেই ফেলে রেখে চলে যাব।
মার্গারেট : হে পিতা, আমি তোমার। আমাকে উদ্ধার করো। হে দেবদূতগণ, আমাকে রক্ষা করো। হেনরি, তোমার কথা মনে করতে বয়ে কাঁপুনি আসছে আমার।
মেফিস্টোফেলিস : ওর বিচার হয়ে গেছে। অজানা
কণ্ঠস্বর : (উপর থেকে) ও উদ্ধারলাভ করেছে।
মেফিস্টোফেলিস : (ফাউস্টকে) আমার কাছে এস।
(দুজনে অদৃশ্য হয়ে গেল)।
কণ্ঠস্বর : (ভিতর থেকে) হেনরি! হেনরি!
ফাউস্ট (কাব্য-নাটক) ২
ট্রাজ্যেডির দ্বিতীয় অংশ
পঞ্চ অঙ্কে সমাপ্ত
প্রথম অঙ্ক
একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য
গোধূলি বেলা
ফুলছড়ানো ঘাসের উপর ক্লান্ত ও অশান্ত অবস্থায় শুয়ে ছিল ফাউস্ট। তার চারদিকে বৃত্তাকারে সুন্দর ও ছোট আকারের প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
(বীণাযোগে গান)
এরিয়েল : যখন দিকে দিকে ফুল ফুটিয়ে ফুল ঝরিয়ে বসন্ত আসে, মুক্ত মাঠ সবুজের সম্ভার নিয়ে সবুজ শিশুদের আহ্বান জানায়, তখন আমাদের মতো মায়াবী পরীরাও অসহায় মানুষদের সাহায্য করার জন্য বেরিয়ে পড়ে। ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সকলের উপর করুণা করে বেড়ায় তারা।
তোমরা যারা ওর মাথার চারপাশে অদৃশ্য অবস্থায় বৃত্তাকারে ঘুরে চলেছ, তারা অবশ্যই যে দুঃখের আবেগে আলোড়িত হচ্ছে ওর বুক তার কারণ আবিষ্কার করবে। তাই অনুশোচনার আগুন নিবিয়ে দেবে। সমস্ত রকমের দুঃখের বোঝা হতে মুক্ত করো। ওর অন্তর। সারারাত্রির মধ্যে চারটি প্রহর আছে। এখন আর দেরি করো না। প্রথমে ওকে ঠাণ্ডা বালিশের উপর ঘুম পাড়াও। তারপর ওর উপর লেথি নদীর জল ছড়াও। তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আর তাহলে কোনও ব্যথা থাকবে না। ওর ঘুম পরিপূর্ণ হয়ে তোমরা তোমাদের ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করবে। তারপর ওকে জাড়িয়ে দেবে।
কোরাস : যে সবুজ প্রান্তরের বিশালতায় মন্থর বাতাস খেলা করে যায়, যেখানে কুয়াশাচ্ছন্ন গোধূলির সুবাসিত ছায়া ঘন হয়ে উঠে সোনালী আলোর শেষ দরজাটা বন্ধ করে দেয় সেখানে নীরব শান্তি যেন চুপিসারে কথা কয় বাতাসের সাথে, সেখানে এক শিশুসুলভ চপল খেলায় সকলেরই মন মেতে ওঠে।
এখন রাত্রি ঘন হয়ে উঠেছে। একের পর এক করে তারা ফুটে উঠেছে মেঘহীন মুক্ত আকাশে। পাশের হ্রদের শান্ত জলে প্রতিফলিত হচ্ছে সেই সব তারার চকিত আলো। রাজকীয় ঐশ্বর্যে বিরাজমান পূর্ণায়ত চাঁদ অতন্দ্র দৃষ্টিতে রেখে চলেছে চারদিকে সর্বব্যাপী শান্তি আর নীরবতা।
এখন তুমি কালের সীমাবন্ধন থেকে যেন মুক্ত। তোমার আনন্দ-বেদনার সব পালিয়ে গেছে ওই শান্তির রাজ্য থেকে। এখন তুমি তোমার পূর্ণ অখণ্ড সত্তায় বিরাজিত। যে বিশ্বাস তুমি হারিয়ে ফেলেছিলে তা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত তোমার হৃদয়ে। আলোকোজ্জ্বল নূতন প্রভাতের জন্য প্রতীক্ষা করো। চেয়ে দেখো ভোরের কুহেলী-ঘেরা আরামশয্যা থেকে পাহাড়গুলো জেগে উঠছে, উপত্যকাগুলোকে কেমন সবুজ দেখাচ্ছে। মাঠে মাঠে প্রভাতী আলোর রূপালি ঢেউ তুলে তাদের পরিণতি ঘোষণা করছে সবুজ শস্যের দল।
যদি অন্তরের অসীম অসংযত কামনাদের জয় করতে পার তাহলেই অতদূরে দেখতে পাবে এক উজ্জ্বল গৌরবের রাজ্য। যে মহানিদ্রার হালকা আবরণে আবৃত তোমার জীবন, ছিন্ন করে ফেল সে আবরণ। অবিশ্বাসী অপরিণাশদশী সাধারণ মানুষ শুধু কামনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে জানে, কিন্তু কামনা পূরণের পথ জানে না। যে সব কিছু দেখে ভাবনা-চিন্তা করে কাজ করে যায় সেই তার আকাঙ্ক্ষিত বস্তুকে লাভ করে জীবনে।
(একটি জোর শব্দ সূর্যের আগমন ঘোষণা করল)
এরিয়েল : ঐ শোনো, আকাশে নবজাত দিনের আবির্ভাব ঘোষিত হচ্ছে প্রচণ্ড শব্দে। সূর্যদেবতা ফিবাসের রথচক্রনিনাদের সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। স্বর্গমর্তব্যাপী সে আলোর উজ্জ্বলতায় চোখ দিয়ে উঠছে। ঐ শোনো। পাহাড়ে অরণ্যে প্রতিটি কুসুমকোরকের গভীরে অনুপ্রবিষ্ঠ সে আলোর আশ্চর্য অশ্রুত ধ্বনি।
ফাউস্ট : হে পৃথিবী, যদিও এখন রাত্রির অন্ধকার অবিচলভাবে ঘন হয়ে রয়েছে তোমার বুকে তথাপি এক নূতন প্রাণস্পন্দনে সজীব হয়ে জেগে উঠেছি আমি। নূতন আশার আনন্দ জাগছে আমার হৃদয়ে, আমার বহু-আকাঙ্ক্ষিত বৃহত্তর জীবনলাভের জন্য এক বলিষ্ঠ সংকল্প অটল হয়ে উঠছে আমার মধ্যে। উপত্যকার বুক থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে ভোরের আকাশ। অসংখ্য কণ্ঠ গুঞ্জরিত হয়ে উঠছে কুঞ্জবনে। নানাবিধ বৃক্ষের পত্রপুষ্পশোভিত শাখাপ্রশাখাগুলোর প্রত্যূষের আলোর মুখ তুলে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন স্বর্গ নেমে এসেছে পৃথিবীতে। সূর্যকিরণ প্রথমে পৰ্বত-শৃঙ্গের মুকুটগুলোকে চুম্বন করে সানুদেশের ঢাল প্রান্তরভূমি পার হয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছে সমতলভূমিতে। সে কিরণে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আমার। এইভাবে আমাদের সব ইচ্ছা যদি পূরণ হয়, যদি আমাদের সর্বোচ্চ আশার আলোর পূর্ণতার প্রান্তরভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সার্থক হই আমরা। কিন্তু যদি সে আশার আলোর পরিবর্তে নেমে আসে জ্বলন্ত
অগ্নিপ্রবাহ, আসে ঘৃণা অথবা প্রেমের আগুন, আনন্দ-বেদনার দ্বৈত উত্তাপে পীড়িত হই। আমরা, তখন অনিবারণীয় কামনার আবেগে সংসারের দিকে ছুটে যাই আমরা, ছদ্ম যৌবনের মিথ্যা রঙে-রূপে অলঙ্কৃত করে তুলি নিজেদের।
