ফাউস্ট : (উচ্চৈঃস্বরে) মার্গারেট, মার্গারেট।
মার্গারেট : (মনোযোগ সহকারে শুনে) এ কণ্ঠস্বর আমার প্রেমিকের না। (হঠাৎ লাফিয়ে উঠে) কোথায় সে? সে আমার নাম ধরে ডাকছিল। আমি শুনতে পেয়েছি। আমি এখন মুক্ত, কেউ আমাকে আর বাঁধতে পারবে না। আমি আমার প্রণয়ীর কাছে চলে যাব। তার বুকের উপর শোবো। সে একটু আগে আমার নাম ধরে ডাকছিল। নরকের গোলমালের মাঝে নানারূপ নারকীয় তর্জন গর্জনের মাঝে আমি তার মধুর কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি।
ফাউস্ট : এই সেই আমি।
মার্গারেট : সেই তুমি! আবার বলো (জড়িয়ে ধরে) আমার সেই ভালোবাসার মানুষ। কোথায় আমার যন্ত্রণা? কোথায় কারাগার আর শৃংখলজনিত মনোবেদনা? তুমি! তুমি এসেছ আমাকে উদ্ধার করতে। এখন আমি মুক্ত। আবার আমি দেখতে পারি সেই রাজপথ যেখানে প্রথম দেখি তোমায়। দেখব সেই ফুল্লকুসুমিত উদ্যান যেখানে একদিন আমি মার্থার সঙ্গে তোমার প্রতীক্ষা করতাম।
ফাউস্ট : (যাবার জন্য উদ্যত হয়ে) এস, এস আমার সঙ্গে।
মার্গারেট : একটু থামো। তোমার সঙ্গে কিছুটা সময় থাকতে চাই।
(চুম্বন করে)
ফাউস্ট : এখনি পালিয়ে চলো। দেরি করলে পরে আমাদের দুঃখ ভোগ করতে হবে।
মার্গারেট : আমাকে চুম্বন করো। তাও কি করতে পার না? তুমি কি আগের মতো চুম্বন করতে ভুলে গেছ? আজ তোমার বুকে এত সংশয় জাগছে কেন? একদিন তোমার চোখের দৃষ্টির মধ্যে স্বর্গ খুঁজে পেতাম আমি। তোমার কথার মধ্যেও স্বর্গলাভ করতাম। একদিন তুমি এমন নিবিড়ভাবে চুম্বন করতে যাতে আমার মনে হতো আমি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাব। আমাকে চুম্বন করো। (আলিঙ্গন করল) হায়, তোমার ঠোঁট দুটো এত ঠাণ্ডা কেন? কেমন যেন প্রাণহীন। তোমার প্রেমাবেগের মধ্যে আর সেই নিবিড়তা নেই। কে আমার এই ক্ষতি করেছে? (নিজেকে সরিয়ে নিল)
ফাউস্ট : এস আমার সঙ্গে। প্রিয়তমা, সাহস অবলম্বন করো। পরে আমি হাজার গুণ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরব। কিন্তু এখন আমার পিছু পিছু চলে এস।
মার্গারেট : সেই তুমি ঠিক বটে তো?
ফাউস্ট : সেই আমি, চলে এস।
মার্গারেট : তুমি আমার শৃংখল খুলে দেবে। তুমি আমার আবার স্থান দেবে তোমার কোলে। তুমি আমার দেখে ঘৃণা করছ না কেন? তুমি জান তো কাকে মুক্ত করছ?
ফাউস্ট : চলে এস, রাত্রি শেষ হয়ে গেছে।
মার্গারেট : আমি আমার মাকে হত্যা করেছি। তোমার ঔরসজাত সন্তানকে আমি জলে ডুবিয়ে মেরেছি। তোমার হাতটা দাও। স্বপ্ন দেখছি না তো? কিন্তু এ হাত ভিজে কেন? চোখের জল মুছে ফেলো। কিন্তু এ হাতে রক্ত কেন? হা ভগবান! কি করছ তুমি? তরবারিটা খাপের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখো। আমাকে ভয় দেখিও না।
ফাউস্ট : অতীতকে ভুলে যাও। তোমার কথায় মরতে ইচ্ছা করছে আমার।
মার্গারেট : না না, তুমি আমাদের থেকে বাঁচবে। তুমিই আমাদের সকলকে কবর দেবে। সবচেয়ে ভালো করে আমার মাকে শায়িত করবে। তার পরেরটাতে আমার ভাইকে। তার থেকে একটু দূরে আমাকে কবর দেবে। আমার ডান দিকে থাকবে আমার শিশুসন্তান, আর কেউ না। তোমার বাহুলগ্ন হয়ে থাকাটা আমার কাছে স্বর্গসুখ। কিন্তু সে সুখ সম্ভব নয়। তোমার গলগ্রহ হয়ে থাকতে হবে তাহলে আমাকে। তুমি আমার চুম্বন এখন আর চাও না। অথচ তুমি কত ভালো, কত দয়ালু।
ফাউস্ট : তুমি যদি আমাকে চিনতে পেরে থাকো, তাহলে আমার সঙ্গে এস।
মার্গারেট : বাইরে?
ফাউস্ট : স্বাধীনতার রাজ্যে।
মার্গারেট : যেতে পারি যদি সেখান থেকে উন্মুক্ত সমাধি, যদি মৃত্যু আমার জন্য প্রতীক্ষা করছে সেখানে, যদি সেখানে পাই অনন্ত শান্তি। আর কোথাও যেতে চাই না আমি। তুমি চলে যাও হেনরি! আমি কি করে যাব?
ফাউস্ট : তুমি পারবে। দ্বার উন্মুক্ত।
মার্গারেট : যেতে আমার সাহস হচ্ছে না। আমার আর কোনও আশা নেই। কি হবে পালিয়ে গিয়ে? ভিক্ষা করতে বাধ্য হব। আহত বিবেক আমার দুঃখ বাড়িয়ে দেবে। আমি পরিত্যক্ত অবস্থায় কিভাবে থাকব? আমাকে আবার ওরা ধরে ফেলবে।
ফাউস্ট : আমি তোমার সঙ্গে থাকব।
মার্গারেট : তাড়াতাড়ি করো, তাড়াতাড়ি করো। তোমার ডুবন্ত ছেলেটাকে বাঁচাও। বনের মাঝে নদীর উপর সাঁকোর তলায় বাঁ দিকে এখনও শিশুটা ওঠার জন্য আঁকপাক করছে, চেষ্টা করছে। তাকে ধরো।
ফাউস্ট : আর এক পা গেলেই মুক্তি। তারপর যত খুশি পুরনো কথা স্মরণ করো।
মার্গারেট : সেই পাহাড়টা কি আমরা পার হয়ে গেছি, যে পাহাড়টার একটা পাথরের উপর আমার মা বসে আছে। আর মাথা নাড়াচ্ছে। অনেক দিন ধরে আমার মা ঘুমোচ্ছে, কিন্তু জাগছে না।
ফাউস্ট : আর এক পা গেলেই মুক্তি। তারপর যত খুশি পুরনো কথা স্মরণ করে নিয়ে যাব।
মার্গারেট : না না, আমাকে ছেড়ে দাও। জোর করো না। তোমার প্রেমের খাতিরে জন্য যে কোনও কাজ করতে পারি।
ফাউস্ট : সকাল হয়ে গেছে প্রিয়তমা।
মার্গারেট : সকাল? হ্যাঁ, আমার জীবনের শেষ দিন। অথচ আজ আমার বিবাহের দিন হওয়া উচিত ছিল। কাউকে যেন বলল না তুমি মার্গারেটকে ভালোবেসেছি। আবার আমাদের অবশ্যই দেখা হবে। তবে নাচের আসরে নয়। মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। সমাধিভূমির মতো মৃত্যুর স্তব্ধতা বিরাজ পৃথিবীতে।
ফাউস্ট : হায়, আমার যদি জন্ম না হতো।
মেফিস্টোফেলিস : (বাইরে থেকে) তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এস। না হলে সকাল হবার আগেই ধরা পড়বে। শুধু বাজে কথা বলে দেরি করছ। এদিকে আমার ঘোড়াগুলো চিৎকার করছে। ভোর হয়ে গেছে।
