ফাউস্ট : দাঁতে দাঁত চেপে গর্জন করো না আমার দিকে তাকিয়ে। ভয়ঙ্কর ঘৃণা ও বিরক্তিতে মন আমার ভরে উঠছে। হে গৌরমময় শক্তিশালী আত্মা! তুমি আমাকে মূর্তি ধরে দেখা দিয়েছ, তুমি আমার মনের কথা জান। বলল, কেন তুমি এমন একটা লোকের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছ আমাকে যে ক্ষয়ক্ষতি আর ধ্বংস ছাড়া আর কিছু জানে না?
মেফিস্টোফেলিস : তোমার যা বলার তা বলা হয়ে গেছে?
ফাউস্ট : তাকে উদ্ধার করো, তা না হলে তুমি জাহান্নামে যাবে। হাজার বছর ধরে ভয়ঙ্কর অভিশাপ ভোগ করতে হবে তোমায়।
মেফিস্টোফেলিস : তাকে উদ্ধার করব? কে তার ধ্বংস ডেকে এনেছে? আমি না তুমি? (ফাউস্ট চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল) তুমি বজ্র ধারণ করতে চাও? কোনও মরণশীল মানুষ তা পেতে পারে না। কোনও দুর্গত মানুষকে মুক্ত করার নামে এইভাবে অত্যাচারীরা নির্দোষ ব্যক্তিকে শেষে চুর্ণ-বিচুর্ণ করতে চায়।
ফাউস্ট : সেখানে নিয়ে চলো আমাকে। তাকে মুক্ত করব আমি।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু তাহলে যে বিপদে পড়বে তার কথা ভেবেছ? মনে রেখো, তুমি নিজের হাতে যে রক্তপাত করেছ তা এখনও শহর থেকে মুছে যায়নি। যেখানে তুমি হত্যা করেছিলে সেই ঘটনাস্থলে এখনও প্রতিশোধ গ্রহণকারী প্রেতরা ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং হত্যাকারীর জন্য প্রতীক্ষা করছে।
ফাউস্ট : তুমিও তাই করছ। পৃথিবীর সমস্ত হত্যার অপরাধে অভিশপ্ত হও তুমি। জার্নোয়ার কোথাকার। আমাকে সেখানেই নিয়ে চলো তুমি। আমি বলছি, তুমি তাকে মুক্ত করো।
মেফিস্টোফেলিস : আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব। শোনো আমি কি করতে পারি। আমার কি স্বর্গমর্ত্যের সব শক্তি করায়ত্ত আছে। প্রথমে আমি জেলরক্ষীর চেতনাশক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলব। তারপর কারাকক্ষের চাবি নিয়ে তাকে বাইরে নিয়ে আসব। বাইরে প্রস্তুত থাকে ঐন্দ্রজালিক ঘোড়া। আমি তোমাদের দূরে নিয়ে যাব। এত ক্ষমতা আমার আছে।
ফাউস্ট : চলো।
চতুর্বিংশতি দৃশ্য
রাত্রি
মুক্ত প্রান্তর
(কালো ঘোড়র উপর চেপে ফাউস্ট ও মেফিস্টোফেলিস যাচ্ছিল)
ফাউস্ট : ঐ পাথরের চারদিকে বসে কি ওরা বুনছে?
মেফিস্টোফেলিস : আমি জানি না ওরা কি করছে?
ফাউস্ট : কখনও উপরে উঠছে, কখনও নিচে নামছে, কখনও মাথা নত করছে।
মেফিস্টোফেলিস : ডাইনিদের রাজ্য। চলো, চলো।
পঞ্চবিংশতি দৃশ্য
কারাগার
(এক হাতে বাতি আর এক হাতে একগোছা চাবি নিয়ে লৌহকপাটের বাইরে)
ফাউস্ট : এক অভূতপূর্ব কম্পন জাগছে আমার মধ্যে। সমগ্র মানবজাতির পূঞ্জীভূত দুঃখে অভিভূত হয়ে পড়ছি আমি। সে এখন অন্ধকার সঁতসেঁতে রুদ্ধদ্বার কারাকক্ষে বাস করে। অথচ সে এক মিথ্যা অপরাধে অভিযুক্ত। আমি কি তাকে মুক্ত করতে বিলম্ব করছি? আমি কি তার সঙ্গে দেখা করতে ভয় পাচ্ছি? চলো এগিয়ে চলো। এভাবে দেরি করলে মৃত্যুবরণ করতে হবে আমার। (তালা ধরে খুলতে গেল। ভিতরে গানের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।)
গান
আমার মা এক বারবণিতা; সেই আমার
মৃত্যু ঘটিয়েছে। আমার পিতা ছিল এক ভৃত্য;
সে আমার মাথাটা খেয়েছে।
কিন্তু আমার ছোট্ট বোনটা ছিল খুব ভালো।
সে আমার অস্থিগুলোকে এক বনের শ্যাওলাধরা
ভিজে মাটির মধ্যে কবর দেয়।
তখন আমি ছিলাম ছোট একটা পাখি।
হে পাখি উড়ে যাও। উড়ে যাও।
ফাউস্ট : (তালা খুলে) সে এখনও বুঝতে পারছে না তার প্রেমিক কত আছে। সে হাতের শৃঙ্খলের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। (ঘরে ঢুকল)।
মার্গারেট (বিছানার চাদরে মুখ লুকিয়ে) : ধিক ধিক! আবার তারা আসছে। এর থেকে মৃত্যু ভালো।
ফাউস্ট : (চুপি চুপি) চুপ, চুপ। তোমার মুক্তির সময় উপস্থিত।
মার্গারেট : (ফাউস্টের সামনে পড়ে গেল) তুমি যে আমার দুঃখে করুণা দেখাচ্ছ, তুমি কি মানুষ?
ফাউস্ট : তোমার চিৎকারে রক্ষীরা জেগে উঠবে। তারা তোমার ধরে ফেলবে। (তার পায়ের বেড়ি খুলে দিল)।
মার্গারেট : (নতজানু হয়ে) আমার উপর এতদূর অধিকার ফলাতে কে তোমায় দিয়েছে? এই নিশীথ রাতে তুমি এসেছ আমার কাছে। আমার উপর দয়া করো, আমাকে বাঁচতে দাও। একটু পরেই সকাল হবে। (উঠে) আমি কি এখনও তেমনি যুবতী আছি? তবু মৃত্যু আমার কাছে আসছে কেন? আমিও একদিন সুন্দরী ছিলাম। আর সেই সৌন্দর্যই হয়ে ওঠে আমার ধ্বংসের কারণ। একদিন আমার প্রণয়ী আমার ছিল, কিন্তু আজ সে দূরে। আমার মিলনের মালা আজ ছিঁড়ে গেছে, ছড়িয়ে গেছে সে মালার ফুল। এত জোরে আমাকে ধরো না। আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমার কাছে কি করেছি? আমার অনুরোধ যেন বৃথা না হয়। আমি জীবনে তোমার কখনও দেখিনি।
ফাউস্ট : এ দুঃখ জীবনে আমি সহ্য করতে পারব?
মার্গারেট : এখন আমি সম্পূর্ণ তোমার কবলে। কিন্তু প্রথমে আবার বাচ্চাটাকে একটু দুধ খাইয়ে নিতে দাও। আমি সারারাত বাচ্চাটাকে আদর করেছি। কিন্তু ওরা তাকে জোর করে নিয়ে গেছে। অথচ বলছে আমি তাকে হত্যা করেছি। জীবনে আর কোনওদিন সুখী হতে পারব না আমি। ওরা আমাকে নিয়ে গান গায়।
ফাউস্ট : (নতজানু হয়ে) তোমার প্রণয়ী আজ তোমার পদতলে। সে তোমার দাসত্বের বন্ধন ছিন্ন করতে চায়।
মার্গারেট : (পাশে পড়ে গিয়ে) এস, আমরা নতজানু হয়ে সাধুদের কাছে প্রার্থনা করি তারা যেন আমাদের লুকিয়ে রাখে। লুকিয়ে রাখে কোনও তক্তার তলায়। বজ্রাঘাতে সমগ্র নরক কাঁপছে। শয়তানরা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে শিকার খুঁজে বেড়াচ্ছে।
