উভয় কোরাস : এখন ঝড় থেমে গেছে। আকাশ দেখা যাচ্ছে। তবে চাঁদ নাই আকাশে। অন্ধকারের ভিতরে কার এক ঐন্দ্রজালিক গানের সুর ঝরে পড়ছে মৃত্যু বৃষ্টিধারার মতো।
কণ্ঠস্বর : (নিচের থেকে) কে যাচ্ছে ওখানে, থামো।
কণ্ঠস্বর : (উপর থেকে) নিচের থেকে কে ডাকছে?
কণ্ঠস্বর : (নিচের থেকে) আমাকেও নিয়ে যাও। আমাকেও সঙ্গে নাও। আমি তিনশ বছর ধরে উপর ওঠার চেষ্টা করছি। কিন্তু আজও দেখা পাইনি শিখরদেশের। আমিও ঐ উক্ৰমণরত জনতার সামিল হতে চাই।
উভয় কোরাসদল : যতসব কাজের যন্ত্রপাতি নিয়ে আজ রাত্রির মধ্যে যারা উঠতে পারবে না তাদের আর কোনও আশা নেই। তাদের ধ্বংস অনিবার্য।
ডাইনি : (নিচের থেকে) এখন আমি শুধু বারবার পড়ে যাচ্ছি। আমি বড় দূরবস্থার মধ্যে আছি। অথচ অন্যেরা আমাকে ছাড়িয়ে কত দূরে চলে গেছে। বাড়িতে আমার কোনও বিরাম বা শান্তি নেই। আর এখানেও সে বিরাম বা শান্তিলাভ করতে পারছি না।
ডাইনিদের কোরাস : ডাইনিদের খুশি করলেই সব পাবে। সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একটা কম্বল তাদের দান করলে একটা জাহাজ পেয়ে যাবে। অথচ আমাদের সঙ্গে যদি আজ রাতে না আসতে পার তাহলে পরে জাহাজ পেলেও কোনও ফল হবে না।
উভয় কোরাসদল : আমরা যখন এই শিখরদেশের চারদিকে উঠে বেড়াচ্ছি তখন তোমরা সোজা নিচে মাটিতে নেমে যাও। নেমে চারদিকে বনের আশেপাশে ডাইনিদের কাজকর্মের উপাদান খুঁজে বেড়াবে।
মেফিস্টোফেলিস : তারা একসঙ্গে সমবেতভাবে এগিয়ে চলেছে। এগিয়ে চলেছে কলরব করতে করতে। তারা কখনও আগুনে পুড়ছে, এবং তাদের গা থেকে গন্ধ বার হচ্ছে। আবার কখনও শুধু আলোক বিচ্ছুরিত হচ্ছে তাদের গা থেকে। প্রকৃত ডাইনি কাকে বলে তা আমরা বুঝতে পারছি তাদের দেখে কাছে এস। তা না হলে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব ওদের দল থেকে। কোথায় তুমি?
ফাউস্ট : (দূরে) এই যে এখানে।
মেফিস্টোফেলিস : সে কি! এত দূরে ছিটকে পড়েছ? আমাকেই পথ পরিষ্কার করে দিতে হবে দেখছি। হে জনতা, একটু সরো দেখি, একটু পথ করে দাও। আমাকে ধরো ডাক্তার। এক লাফে আমরা জনতার থেকে কিছুটা দূরে ফাঁকা জায়গায় গিয়ে পড়ব। অদূরে কিসের একটা স্পষ্ট আলো জ্বলছে ঐ বনের মধ্যে। ওখানে গিয়ে তা দেখতে ইচ্ছা করছে আমার। চলে এস। ওই বনটার কাছে চলে যাই।
ফাউস্ট : হে বিরোধ ও বিভেদের আত্মা। এগিয়ে চলো। আমি তাকে অনুসরণ করব প্রত্যক্ষভাবে। ঠিকভাবে বিচার করে দেখতে গেলে এ পরিকল্পনা ভালোই হয়েছে। আমরা আজ এই ওয়ালাপার্গিস নৈশ উৎসবের দিন ব্রোকেন পাহাড়ের শিখরদেশে আরোহণ করব। আর তার জন্য আমরা ইচ্ছা করে তাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু দেখো দেখো, কত বিচিত্র বর্ণের অগ্নিশিখা দেখা যাচ্ছে বনের ভিতর।
ফাউস্ট : আমার পক্ষে এখন এই শিখরদেশে উঠে যাওয়াই ভালো। সেখানে আগুন আর ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখা যাচ্ছে। মানুষ বিবাদ ও গোলমালের সময় কোনও অশুভ শক্তিরও সন্ধান করে। সেই শক্তির কাছে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান হয়।
মেফিস্টোফেলিস : সেখানে আবার অনেকে নতুন সমস্যার জটও পাকিয়ে যায়। জনতা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে চেঁচামেচি করে মরুক। আমরা এই নির্জনে শান্তিতে থাকব। এইভাবে এই বিরাট পৃথিবীর মাঝে মানুষ ছোট ছোট এক-একটি শান্ত নির্জন জায়গা বেছে নেয়। আমি দেখছি তরুণ যুবতী ডাইনিরা উলঙ্গ অবস্থায় সমবেত হয়েছে এবং বৃদ্ধারা ঘোমটা মাথায় দিয়ে কাপড়ে গা ঢেকে এসেছে। আমার খাতিরে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। এতে কোনও ক্ষতি হবে না, বরং মজা পাবে। আমি শুনতে পাচ্ছি বাদ্যযন্ত্র বাজছে। এই যন্ত্রধ্বনি অশুভ হলেও তা শুনতে হবে। আমার সঙ্গে এস। আমি আগে গিয়ে তোমাকে পরিচিত করে দেব তাদের সঙ্গে। তুমি এই প্রথম আসছ। জায়গাটা ছোট নয়, কি বলো বন্ধু? সামনে তাকিয়ে দেখো, দেখবে। তার শেষ দেখতে পাবে না। প্রায় একশোটা অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে আর তার চারদিকে তারা রান্না করছে, পানাহার করছে এবং উন্মত্তের মতো নাচছে। এটা কি কম মজার কথা?
ফাউস্ট : আমাকে পরিচিত করিয়ে দিতে গিয়ে তুমি কি পুরুষ ডাইনি বা শয়তানের ভূমিকা গ্রহণ করবে?
মেফিস্টোফেলিস : আমি অবশ্য অজানা পথিক হিসাবে তাদের মাঝে যেতে অভ্যস্ত। কিন্তু এই ঝড় ও দুর্যোগের রাত্রিতে আজ আমার পরিচয় দিতে হবে। তবে এখানে পা দিয়ে ঘরের মতো স্বস্তি পাচ্ছি। অদূরে একটা শামুক দেখতে পাচ্ছ? কেমন ধীর গতিতে আসছে ওটা। তেমনি এখানকার লোকেরা ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমার আগমন আগেই বুঝতে পেরেছে। এখানে চেষ্টা করেও আমি ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারব না। এখন এস, এখন এই আগুন থেকে অন্য একটা আগুনের কুণ্ডের কাছে যাই। আমিই প্রথমে যাব। (পোড়া কাঠের পাশে বসে থাকা কিছু লোককে বলল) হে দ্রমোদয়গণ, কেন তোমরা এক পাশে বসে রয়েছ? তোমরা যদি ঐ সব যুবকদের মাঝে গিয়ে আনন্দোৎসব করতে পার তাহলে তোমাদের আমি প্রশংসা করব।
সকলে : বলো, কে বৃদ্ধদের আর বিশ্বাস করবে? যদিও বৃদ্ধদের পরিকল্পনামতো অনেক কাজ হয়েছে। সাধারণ জনগণ আর নারীদের কাছে যুবকরাই বেশি খাতির পায়।
মন্ত্রী : তারা এখন ন্যায় ও সত্যের পথ থেকে দূরে সরে গেছে। আমি বৃদ্ধদের আজও প্রশংসা করি আর তার কারণও যথেষ্ট আছে। আমাদের হাতে যখন শাসকক্ষমতা ছিল তখন দেশে ছিল স্বর্ণযুগ।
