আমার মনে হচ্ছে যেন আমরা এক স্বপ্নের মায়াপুরীতে এসে পড়েছি। আমাদের কথা শোনো। তুমি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাও যাতে আমরা এই জনহীন স্থানে ঠিকমতো পথ চিনে এগিয়ে যেতে পারি।
ঐ দেখো গাছগুলো কত তাড়াতাড়ি এক জায়গা হতে আর এক জায়গায় লাফিয়ে যাওয়া-আসা করছে। খাড়াই পাহাড়গুলো মাথা নত করছে আমাদের সামনে। আমরা। কি কোনও গোলমাল শুনছি? নাকি কোনও গান? পাথরের উপর দেখছি ঘাস গজিয়েছে। প্রবহমান জলস্রোতগুলো কোনও গুহার মাঝে আশ্রয় খুঁজছে। আমরা কি কোনও গোলমাল শুনছি, নাকি কোনও গান অথবা কোনও প্রেমের আবেদন? অনন্ত আশা ও অমরত্ব সম্বলিত কোনো স্বর্গীয় দেবদূতের কণ্ঠস্বর শুনছি কি আমরা? পুরাতন প্রথার মতো তার ক্ষীণ প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে চারদিকে। হু হু করে পেঁচা ডাকছে। ওরা কি এখনও জেগে আছে? সালামান্দার কি পেটমোটা লোকটাকে ঝোঁপের মাঝে ফেলে দিল? বড় বড় সাপগুলো কিলবিল করতে করতে আমাদের ছড়িয়ে ধরার জন্য এগিয়ে আসছে। আমাদের গা শিউরে উঠছে। শ্যাওলাধরা পাথর ও ঝোঁপের উপর। দিয়ে বিচিত্র বর্ণের ইঁদুর ছুটে বেড়াচ্ছে। যে জোনাকিরা জ্বলতে জ্বলতে উড়ে বেড়ায় তারা বিষণ্ণ হয়ে ঝাঁক বেঁধে বসে রয়েছে। আমাকে বলে দাও, আমরা কি দাঁড়িয়ে রয়েছি না উপর উঠছি? আমার মনে হচ্ছে সব কিছু ঘুরছে, সব কিছু ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। গাছ পাথর পাহাড় সব। দূরের ইতস্তত সঞ্চরমান আলোকবিন্দুগুলো ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে।
মেফিস্টোফেলিস : আমার জামার দিকটা সাহসের সঙ্গে ধর। এখানে মাঝামাঝি ধরনের এক পর্বতশৃঙ্গ রয়েছে। এখান থেকে আশ্চর্য রকমের এক আগুন দেখা যাচ্ছে। এই আগুনের মধ্যে এক আশ্চর্য সম্পদ পাবে।
ফাউস্ট : ঐ শৃঙ্গটার ভিতর থেকে প্রত্যূষের উজ্জ্বল আলোর মতো এক আলোকশিখা বেরিয়ে আসছে। যেন মনে হচ্ছে এক গভীর শূন্যতায় কোথায় এক। অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে। আর তার থেকে কখনও এক ঝলক অগ্নিশিখা, কখনও বা একরাশ ধোয়া বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়ছে। কখনও বা ঝর্নাধারার মতো জ্বলন্ত আগুনের একটা স্রোত সমস্ত উপত্যকাভূমিকে প্লাবিত করছে আর তার থেকে অসংখ্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সোনালী বালুকণার মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। মোট কথা সেই ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আগুনের শিখায় সমস্ত পার্বত্যপ্রদেশ আলোকিত হয়ে উঠছে।
মেফিস্টোফেলিস : পর্বতের অধিষ্ঠাতা দেবতা ম্যাথন আজ রাতে এক ভোজসভা আহ্বান করেছেন। তুমি ভাগ্যবান যে এ দৃশ্য দেখতে পেয়েছ। নিমন্ত্রিত অতিথিরা আসছে একে একে।
ফাউস্ট : কী প্রচণ্ড বেগে ঝড় বয়ে যাচ্ছে দেখো। আমার ঘাড়ের উপর যেন আছাড় খেয়ে পড়ছে ঝড়টা।
মেফিস্টোফেলিস : পিছনের দিকে পাহাড়ের পুরনো পাথরগুলোকে শক্ত করে ধরো, তা না হলে পাশের শূন্য খাদের মধ্যে পড়ে যাবে। চারদিকে কালো কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে রাত্রি। ঝড়ের আঘাতে ঘর্ষণক্লিষ্ট গাছগুলোর আর্ত মর্মরধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ভয় পেয়ে পেঁচার ছানাগুলো চারদিকে ছুটে পালাচ্ছে। সমস্ত বনভূমি কাঁপছে, পাথরের স্তম্ভগুলো যেন ভেঙে পড়ছে। প্রতিটি গাছের কাণ্ড ও শাখাপ্রশাখাগুলো মুচড়ে একে অন্যের উপর পড়ে যাচ্ছে। তাদের শিকড়গুলো পর্যন্ত উপড়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের প্রতিটি কন্দরে ও গুহায় ঝড় প্রচণ্ড বেগে বয়ে যাচ্ছে গর্জন করতে করতে। এর মাঝে কাদের গান শুনতে পাচ্ছ? দূরে অথবা নিকটে কারা যেন গান গাইছে সমবেত কণ্ঠে। পাহাড়ের গায়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই গানের সুর।
ডাইনিরা : (সমবেত কণ্ঠে) ডাইনিরা এখন ব্রোকেন পাহাড়ের উপর উঠেছে। ফসলের মাথাগুলো সবুজ। কিন্তু তাদের গোড়াগুলো হলুদ। ফসল ওঠার উৎসবে সমবেত হয়েছে উল্লসিত জনতা। সকলের উপরে বসে আছে ইউরিয়ান। সে হচ্ছে এক ডাইনি।
একটি কণ্ঠস্বর
একটি বুড়ি ববো এক আসছে। সে আসছে লাঙ্গলের সঙ্গে সংযুক্ত মই-এর উপর চেপে।
কোরাস : তাহলে যোগ্য ব্যক্তিকে সম্মান দাও। তাহলে বুড়ি ববোই এখন ডাইনিদের পরিচালিত করে নিয়ে যাবে। ডাইনিরা এবার তারই অনুসরণ করবে।
কণ্ঠস্বর : এখান থেকে তাহলে কোন পথে যাবে?
অন্য
কণ্ঠস্বর : ইনসেন পাহাড়ের উপর দিয়ে। আমি একটা পেঁচার বাসায় উঁকি মেরে দেখেছিলাম সে কেমন আমার পানে কটমট করে তাকাচ্ছিল।
প্রথম
কণ্ঠস্বর : নরকে যাও তুমি। এত তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছ কেন? তার ফলে পড়ে যাচ্ছ।
ডাইনিরা : (সমবেত কণ্ঠে) এ পথ একই সঙ্গে দীর্ঘ এবং প্রশস্ত। জনতা উন্মত্ত। ঝাঁটাগুলো সব তারা ফেলে দিচ্ছে। শিশুগুলো চুপ করে আছে। কিন্তু মারা বিরক্তিতে ফেটে পড়ছে।
পুরুষ ডাইনিরা : খোলার মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রেখে যেমন করে শামুক চলে আমরাও তেমনি শামুকের মতো এগিয়ে চলেছি। আমাদের সামনে যাচ্ছে মেয়েরা। তবে তখন কোনও শয়তানের বাড়ির সামনে এসে পড়ি তখন মেয়েরা খুব তাড়াতাড়ি অতি দ্রুতপায়ে এগিয়ে যায়।
অন্যদল : আমরা কিন্তু এভাবে বিচার করি না। মেয়েরা পুরুষদের থেকে হাজার পা এগিয়ে থাকলেও পুরুষরা এক লাফে তাদের ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কণ্ঠস্বর : (উপর থেকে) ঐ পাহাড় ঘেরা হ্রদ থেকে চলে এস।
কণ্ঠস্বর : (নিচের থেকে আমরা উপরে উঠে যেতে চাই। আমরা নিরন্তর জলধারার দ্বারা বিধৌত এবং শুচিত। তথাপি আমরা চিরকালের জন্য সৃষ্টিকার্যে অক্ষম।
