মার্থা : ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাও। পরনিন্দার দ্বারা নিজেকে অহেতুক ভারাক্রান্ত করে তুলছ তুমি।
ভ্যালেন্টাইন : চুপ করো, ঘৃণ্য পাজি বুড়ি কোথাকার! আমি যদি তোর এই শুকনো রোগা দেহটাকে মৃত্যুর কোলে শুইয়ে দিতে পারতাম তাহলে আমার সব পাপ ঈশ্বর ক্ষমা করে দিতেন।
মার্গারেট : চুপ করো ভাই। এসব কথা নারকীয়।
ভ্যালেন্টাইন : চোখের জল ফেলো না আর। আমার কথা শোনো। তুমি যখন জীবনে সম্মান হারিয়ে ফেলো তখন আমি অন্তরে বড় আঘাত পাই। এখন আমি অন্তহীন নিদ্রার মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরের কাছে যাচ্ছি বীর সৈনিকের মতো।
বিংশতি দৃশ্য
শেষকৃত্য, শোকসঙ্গীত
অন্যান্যদের মাঝে মার্গারেট। মার্গারেটের পিছনে অশুভ আত্মা
অশুভ আত্মা : এটা কেমন হলো মার্গারেট? তুমি যখন নির্দোষ নিষ্পাপ তখন কেন তুমি এই বেদীমূলে এসে ঐ পুরনো বই খুলে প্রার্থনার বাণী পাঠ করলে? এই। বাণীপাঠের মধ্যে কিছুটা ছিল তোমাদের শিশুসুলভ ক্রীড়ার ভাব আর কিছুটা ছিল ঈশ্বরভক্তি। মার্গারেট, কি ভাবছ? তোমার বুকের মধ্যে কোনও গোপন পাপকে লুকিয়ে রেখেছ? তুমি কি তোমার যে মা দীর্ঘদিন পরলোকগমন করেছেন তাঁর আত্মার নামে প্রার্থনা করছ? তোমাদের ঘরের সামনে কার রক্ত দেখা যাচ্ছে? কে নিস্পন্দ অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং তোমার অন্তরটাই বা কাঁপছে কেন? তোমার এই অশান্ত জীবনের ভবিষ্যৎ খুবই শঙ্কাকীর্ণ।
মার্গারেট : হায়, হায়! যে সব চিন্তাগুলো বারবার আমার মনের চারদিকে ভিড় করে আসছে সেই সব চিন্তা থেকে আমি যদি মুক্তি পেতাম!
অশুভ প্রেতাত্মা : ক্রোধ তোমাকে আচ্ছন্ন করে বসেছে। জয়ঢাক বাজছে। কবরের মাটি কাঁপছে। হিমশীতল প্রাণহীন ভস্মতূপ থেকে জেগে উঠে তোমার জীবন জ্বলন্ত আগুনে জ্বলছে।
মার্গারেট : আমি যদি এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারতাম কোথাও। আমার মনে হচ্ছে অন্তিম সঙ্গীতের এই বাদ্যধ্বনি আমার প্রাণবায়ু রুদ্ধ করে দিচ্ছে। আমার অন্তর বিগলিত হয়ে যাচ্ছে।
কোরাস
(গীত ও বাদ্য)
মার্গারেট : আমি আর নিশ্বাস ফেলতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে চারদিকের বিরাট বড় বড় স্তম্ভগুলোর মাঝে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি আমি। মনে হচ্ছে গোটা ছাদটা ভেঙে পড়ছে আমার উপর। বাতাস কই?
অশুভ আত্মা : নিজেকে কোথাও লুকিয়ে রাখোে। মনে রাখবে পাপ ও লজ্জার কাজ কখনও গোপন থাকে না। আলো-বাতাস চাও? জাহান্নামে যাও তুমি।
কোরাস
গান
অশুভ আত্মা : তারা ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তোমার উপর থেকে। যারা পূতঃচরিত্র নিষ্পাপ তারা তোমার হাতের হাত রাখতে গিয়ে হাত সরিয়ে নিচ্ছে ঘৃণায়।
মার্গারেট : হে আমার প্রতিবেশী! তোমার আন্তরিক সহানুভূতি আমি চাই। (মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল)
একবিংশতি দৃশ্য
হার্তস পর্বত
(স্কার্ক ও এলেন্দ অঞ্চল)
ওয়ালপার্গিস রাত্রি
ফাউস্ট। মেফিস্টোফেলিস
মেফিস্টোফেলিস : তুমি কি কোনও তেজী ঘোড়ার সাহায্য নিতে চাও না? আমি তো একটা বলিষ্ঠ পাঁঠার দেখা পেলেও বেঁচে যাই। আমরা যে পথে চলেছি তাতে লক্ষ্য এখনও অনেক দূর।
ফাউস্ট : আমি তো আমার দুপায়ে বেশ সজীবতা অনুভব করছি। চারদিকের এই অরণ্যসমাচ্ছন্ন জটিল পর্বতমালা আমার তো ভালোই লাগছে। পথের দূরত্বকে স্বল্প করার চেষ্টা করছ কেন? প্রথমে এই সব উপত্যকার গোলকধাঁধায় কিছু ঘুরে বেড়ানো, তারপর ঐ সব অদূরবর্তী পর্বতপ্রাচীরের উপর আরোহণ করা। সেখানে দেখবে কত ঝর্না হতে অন্তহীন জলধারা বিচ্ছুরিত হচ্ছে অনন্তকাল হতে। সে দেখার আনন্দ। উপভোগ করতে গিয়ে আনা থেকে শ্লথ হয়ে আসবে আমার পায়ের গতি। ফুল্লকুসুমিত ও সুবাসিত বার্চ ও ফার গাছের বনে এখন বসন্ত এসেছে। তাদের বুকে এখন উল্লাসের দোলা। এই দোলা থেকে, এই বসন্তের ছোঁয়া থেকে আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো বঞ্চিত রয়ে যাবে বলতে চাও?
মেফিস্টোফেলিস : আমি স্বীকার করছি, আমি কিন্তু ও সব কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে এখন বিরাজ করছে শীতের জড়তা। আমার পথের উপর আমি শুধু আশা করি বরফ আর তুষারের দুঃসহ শীতলতা। অসম্পূর্ণ চাঁদের নির্জন থালাটা কেমন ধীরে ধীরে আকাশে উঠছে দেখ। তার আলোর মধ্যে কোনও উজ্জ্বলতা নেই। সে আলোয় পথ চলতে গেলে পায়ে পায়ে পাথরে হোঁচট লাগবেই। এখন আমাদের পথের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। আমি দেখতে পাচ্ছি অদূরে কে আগুন জ্বালাচ্ছে। কে আছ বন্ধু, আমরা তোমার কাছে যাচ্ছি। কেন বৃথা আলোটার অপচয় করছ?
তার চেয়ে আমাদের ঐ খাড়াই পথটা ওঠার সময় একটু আলো দেখাও।
জনৈক অপরিচিত ব্যক্তি : আশা করি আমার শ্রদ্ধা আমার চঞ্চল মেজাজটাকে শান্ত রাখবে। পথটা খাড়াই আর আঁকাবাঁকা বলে আমি আলো জ্বালাচ্ছি।
মেফিস্টোফেলিস : দেখছি সে গোটা মানবজাতিটাকেই তার আদর্শে দীক্ষিত করে তুলতে চায়। এখন শয়তানের নামে সোজা চলে যাও। তা না হলে তোমার সব আগুন। ও আলো লাথি মেরে ফেলে দেব।
অপরিচিত ব্যক্তি : আমি দেখছি কোনও বাড়ির কর্তার মতোই আপনার মেজাজ। আমি আমার সাধ্যমতো আপনার সেবা করে যাব। কিন্তু ভেবে দেখুন, আজ পাহাড়ের অবস্থা ভালো নয়। এতে আমার মতো এক অজানা লোক পথ দেখালে আপনারা পথ। চিনে যেতে পারবেন না।
(ফাউস্ট, মেফিস্টোফেলিস ও অপরিচিত ব্যক্তি তিনজনে মিলে গান গাইতে লাগল)
