আমাকে অপমান করতে পারে। আমি তখন কোনও দেউলিয়া ভাগ্যবিড়ম্বিত অধোমর্ণের মতো বসে বসে শুধু ঘামতে থাকি লজ্জায়। আমিও অবশ্য তাদের মুখের উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দিতে পারি। কিন্তু তাদের মিথ্যাবাদী বলতে পারি না। কিন্তু কারা আসছে এই দিকে? আমার যদি দেখতে ভুল না হয় তাহলে ওরা দুজন আছে। যদি একা হয় তাহলে আমি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। তাকে তাহলে আর একা জীবিত অবস্থায় ফিরে যেতে হবে না।
ফাউস্ট। মেফিস্টোফেলিস
ফাউস্ট : দেখো দেখো, কেমনভাবে তার পবিত্র কক্ষের গবাক্ষপথ হতে এক স্বর্গীয় দ্যুতি বেরিয়ে আসছে। কিন্তু একমাত্র সামনে ছাড়া কোনও পাশ থেকে সে আলো দেখা যাচ্ছে না। আর সে আলো দেখতে না পেলেই চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। আর তার ফলে আমার অন্তরের মাঝেও অন্ধকার জমছে।
মেফিস্টোফেলিস : আমার মনে হচ্ছে আমি যেন কোনও ভাবপ্রবণ বিড়ালের মতো আগুনের লম্বা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছি। চুপিসারে চঞ্চল গতিতে চোরের মতো উপরে উঠে যাচ্ছি। তথাপি আমার মধ্যে আছে টনটনে ধর্মজ্ঞান। আমার প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গে আমি অনুভব করছি যেন আগামী পরশু তারিখে অনুষ্ঠিতব্য অপেরার সুর বাজছে।
ফাউস্ট : আমার প্রিয়তমারূপ রত্ন এখানে কি ওঠেনি? আমার মনে হচ্ছে আমি ওই জানালার ধারে তাকে দেখতে পাচ্ছি।
মেফিস্টোফেলিস : কেটলির ঢাকনা খুললেই যেমন গরম চা পাওয়া যায় তেমনি একটু পরেই তুমি আনন্দ উপভোগ করবে। একটু আগে আমি আড়চোখে দেখেছিলাম সে ঘরের মধ্যেই আছে এবং তাকে চমৎকার দেখাচ্ছে।
ফাউস্ট : আমার প্রিয়তমাকে সাজাবার মতো কোনও গহনা তো দূরের কথা, একটা আংটি পর্যন্ত নেই।
মেফিস্টোফেলিস : আর পাঁচটা জিনিসের মধ্যে আমি একছড়া মুক্তোর হার রেখেছিলাম।
ফাউস্ট : তাহলে খুবই ভালো হয়। তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে যদি কোনও উপহার দিতে না পারি তাহলে সেটা বড় দুঃখের।
মেফিস্টোফেলিস : বিনা উপহারে তাকে উপভোগ করার ব্যাপারটাতে এত অস্বস্তিবোধ করো না। এই শান্ত সুন্দর রাত্রিতে আকাশে যখন নক্ষত্ররা কিরণ দান করছে, আমি তখন এক চমৎকার গান গাইব। এ গানের মধ্য দিয়ে প্রথমে তাকে কিছু নীতিশিক্ষা দান করব। পরে তাকে প্রতারিত করব।
গান
তোমার প্রেমিকের দরজার সামনে
এই আলোকোজ্জ্বল সোনালী সকালে
কি করছ প্রিয়তমা ক্যাথারিন?
কিন্তু সাবধান! ঐ ঘরের মধ্যে একটি
মেয়ে ঢুকেছে এবং সে এখনো বেরোয়নি।
এমন লোকের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে
দেবে জোর করে। একবার ছাড়াছাড়ি হয়ে
গেলেই সব ফুরিয়ে যাবে চিরদিনের মতো।
মনে রেখো, প্রেমের জীবনকাল বড়ই স্বল্প বড়ই সীমিত।
সুতরাং হাতে বিয়ের আংটি না নিয়ে কোনও
ভণ্ড প্রতারকের কাছে বিকিয়ে দিও না নিজেকে।
ভ্যালেন্টাইন : (এগিয়ে এসে) ইঁদুর ধরার বাঁশি বাজিয়ে কার মন ভোলাতে চাও। প্রথমে বাজনাটা, তারপর ঐ গায়কটাকে শয়তানের কাছে পাঠিয়ে দেব।
মেফিস্টোফেলিস : আমরা দুজনেই গেলাম।
ভ্যালেন্টাইন : আর একটা মাথা আমার ভাঙতে হবে।
মেফিস্টোফেলিস : (ফাউস্টের প্রতি) হে ডাক্তারমশাই, পালিয়ে যেও না, আমার অনুরোধ। তুমি শুধু যদি একটু সরে দাঁড়াও, আমি তাহলে এ লড়াইয়ে জিতে যাব। তুমি এখনি চলে যাও বলছি। আমি এখনি ঘুসি আর তরবারি চালাব।
ভ্যালেন্টাইন : ঠিক আছে, চালাও।
মেফিস্টোফেলিস : কেন চালাব না? এখন আলো ফুটে উঠেছে।
ভ্যালেন্টাইন : সত্যি নাকি?
মেফিস্টোফেলিস : অবশ্যই তাই।
ভ্যালেন্টাইন : শয়তান দুটো তাহলে লড়বে। কিন্তু আমার হাত যে খোঁড়া। আমি কি করব?
মেফিস্টোফেলিস (ফাউস্টকে) তরবারিটা একেবারে আমূল বসিয়ে দাও।
ভ্যালেন্টাইন : (পড়ে গেল) হা ভগবান।
মেফিস্টোফেলিস : এবার দুষ্টু বদমাশটা জব্দ হয়েছে। কিন্তু পালিয়ে চলো তাড়াতাড়ি। এখানে আর থাকা চলবে না আমাদের। খুন খুন বলে চিৎকার করছে লোকে। পুলিশকে তবু পার পাওয়া যায়, কিন্তু ফৌজদারি আদালতে এর বিচার হবে।
(প্রস্থান)
মার্থা : (জানালায়) শীগগির এস। শীগগির এস।
মার্গারেট : (জানালায়) তাড়াতাড়ি একটা আলো নিয়ে এস।
মার্থা : (উপর থেকে) ওরা আমাদের আক্রমণ করার ও লড়াই করার হুমকি দিচ্ছে।
জনতা : এখানে একটা লোক মরে রয়েছে। দেখো দেখো।
মার্থা : (উপর থেকে নেমে এসে) খুনীরা কোন দিকে পালাল?
মার্গারেট : (বেরিয়ে এসে) কে ওখানে পড়ে রয়েছে?
জনতা : তোমার মার পুত্র।
মার্গারেট : হে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর! কী দুঃখের কথা।
ভ্যালেন্টাইন : আমি মরতে চলেছি। তবে একেবারে এখনও মরে যাইনি। কথাটা বড় তাড়াতাড়ি বলা হয়ে গেছে। কই মেয়েরা, চেঁচাচ্ছ কেন? তার চেয়ে এদিকে এস। এখানে এস। আমার কথা শোনো। (সকলে এসে জড়ো হলো) হে আমার প্রিয় বোন মার্গারেট, তুমি এখনও বয়সে তরুণী আছ। তোমার এখনও বুদ্ধিসুদ্ধি হয়নি। তুমি বড় হালকা। তাই আমি একটা উপদেশ তোমায় দিতে চাই। মনে রাখবে। এখন তুমি যখন একটা বারবণিতায় পরিণত হয়েছে তখন প্রকাশ্যেই তোমার ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
মার্গারেট : ভাই হয়ে এমন কথা বলতে তুমি পারলে? হা ভগবান!
ভ্যালেন্টাইন : এই সবক প্রমোদক্রীড়ায় বলা যায় না একদিন ঈশ্বরও হয়ত জড়িয়ে পড়তে পারে। যা একবার হয়ে গেছে তা আর ফিরবে না। এরপর কি ঘটবে তাই ভেবে দেখতে হবে। প্রথমে একজনকে নিয়ে এ খেলা শুরু করলে তারপর আর একজন এসে জুটবে। এইভাবে যখন ডজনখানেক লোক আনাগোনা করবে তখন শহরে তোমার নাম ছড়িয়ে পড়বে সব জায়গায়। এ ব্যাপারে যখন প্রথম লজ্জা জন্মায় মনে তখন এ ধরনের মেয়েরা তাদের সব কাজ গোপন রাখার চেষ্টা করে এবং ধীরে ধীরে প্রকাশ করার চেষ্টা করে। পরে লজ্জার কালো অবগুণ্ঠনটা মাথার ওপর তুলে দেয়। তখন সকলেই তাদের ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে। আর তারাও মনের মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করতে করতে প্রকাশ্যে দিনের আলোতেও পাপকাজ চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না যত তারা নির্লজ্জ হয়ে পড়ে ততই তাদের কুৎসিত দেখায়। আমি বেশ বুঝতে পারছি এমন সময় আসতে তোমার দেরি নেই যখন সকলেই তোমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। একমাত্র মৃত্যু ছাড়া তখন তুমি কোথাও কোনও নিরাপদ আশ্রয় পাবে না। যে গলিত মৃতদেহ সংক্রামক রোগ ছড়ায় তার থেকে মানুষ যেমন দূরে থাকতে চায় তেমনি তোমাকেও এড়িয়ে যাবে সবাই। তোমার নিজের পাপ আত্মা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে তোমার কাছে। তোমার মুখপানে কেউ তাকিয়ে সোনার হার উপহার দেবে না। পূজার বেদীতে, নাচগানের আসরে, সব জায়গায় তোমাকে পরিহার করে চলবে সবাই। তোমাকে তখন এককোণে নির্জনে বসে শুধু বিষণ্ণ চিন্তায় ডুবে থাকতে হবে। ভিখারী আর পঙ্গুদের মাঝখানে লুকিয়ে থাকতে হবে তোমায়। ঈশ্বর না করুন, পৃথিবীতে যতদিন বাঁচবে, এক অভিশপ্ত জীবনযাপন করতে হবে তোমাকে।
