মেফিস্টোফেলিস : মানুষের চেহারা দেখে মনের ভাব সে চমৎকার বুঝতে পারে। আমি আসার সঙ্গে সঙ্গে সে সচকিত হয়ে ওঠে। কেন জানি না, আমার মুখোশের আড়ালে মনের যে ভাব লুকিয়ে থাকে তা সে বুঝতে পারে। বুঝতে পারে, আমি একটা আস্ত শয়তান হলেও আমি একটা বিরাট প্রতিভা। ঠিক আছে, আজই রাত্রিতে–
ফাউস্ট : কি আজ রাত্রিতে?
মেফিস্টোফেলিস : আজ রাত্রিতে আমিও কিছু আনন্দ উপভোগ করব।
সপ্তদশ দৃশ্য
ঝর্নায়
কলসীসহ মার্গারেট ও লিসবেথ
লিসবেথ : বারবারার কথা কিছু শুনেছ?
মার্গারেট : না, কোনও কথাই শুনিনি?
লিসবেথ : সত্যিই তাই। আজই সিবিল্লা বলেছে বারবারা যে ঠকেছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। অহঙ্কার ও দম্ভের প্রতিফল সে পেয়েছে।
মার্গারেট : কি ভাবে?
লিসবেথ : তার বমি বমি ভাব আসে। পানাহারের সময় সে বেশ বুঝতে পারে তার পেটে সন্তান এসেছে।
মার্গারেট : আঃ।
লিসবেথ : অবশেষে সে যোগ্য প্রতিফল লাভ করেছে। মেয়েটা ছোকরাটাকে দীর্ঘদিন নিবিড়ভাবে ধরে রেখেছিল। সে কি গলায় গলায় ভাব।! গায়ের সর্বত্র তাদের দুজনকে দেখা যেত, দেখা যেত নাচগানের আসরে। ছেলেটা মেয়েটাকে দেখত মদের মতোই ভোগের এক উপকরণরূপে আর মেয়েটা চাইত তার বেশভূষার পারিপাট্য আর রূপের প্রসাধনে ছেলেটার মন ভোলাতে। মেয়েটা এত নীচ আর নির্লজ্জ যে সে ছেলেটার কাছ থেকে যে কোনও উপহার গ্রহণ করতে কোনওরূপ কুণ্ঠা বোধ করত না। এইভাবে কত সব মদির চুম্বন, আলিঙ্গনের পালা শেষ হতেই প্রেমের কুসুম শুকিয়ে গেল।
মার্গারেট : আহা বেচারী!
লিসবেথ : তার প্রতি দয়া দেখাচ্ছ? যখন আমরা রাত্রিতে মার কাছে বসে সেলাই এর কাজ করতাম কষ্ট করে, মা আমাদের একবারও বাইরে কোথাও যেতে দিত না। মেয়েটা তখন তার প্রেমিকের সঙ্গে অন্ধকার গলির মধ্যে ভাব জমাত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গল্প করত। সময়ের কোনও জ্ঞান থাকত না। এখন বাছাধন আর মুখ তুলতে পারবে না, গির্জার এককোণে বসে শুধু অনুতাপের আগুনে জ্বলবে।
মার্গারেট : ছেলেটা নিশ্চয় তাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করবে।
লিসবেথ : তাহলে বোকার মতো কাজ করবে ছেলেটা। তরুণ যুবকের চঞ্চল মন। আবার অন্য কোথাও চলে যাবে। তাছাড়া সে এর মধ্যেই চলে গেছে।
মার্গারেট : এটা কিন্তু খুব খারাপ।
লিসবেথ : মেয়েটা যদি ছেলেটাকে বিয়ে করে তাহলে তাকে সাবধান করে দিও। পাড়ার ছেলেরা ও আমরা তা বরদাস্ত করব না। তারা তার গলার মালা ছিঁড়ে দেবে। আর আমরা তার ঘরের দরজার সামনে আবর্জনা ফেলে দেব।
মার্গারেট : একটি মেয়ে যখন প্রতারিত হয় একটি ছেলের দ্বারা তখন আমি ঘৃণাভরে কত তার নিন্দা করেছিলাম। তীক্ষ্ণ ভাষায় অপরের দোষের সমালোচনা করেছিলাম। তাদের দোষটা যত না কালো ছিল তার থেকে বেশি কালো মনে হয়েছিল আমার কাছে এবং নিজেকে ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য মনে করেছিলাম। অথচ আসলে জীবন্ত পাপের এক মূর্ত প্রতীক আমি। তবু আমার অন্তর থেকে যেকথা তখন বেরিয়েছিল তা সব সত্য।
অষ্টাদশ দৃশ্য
ডন জন
(একটি দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে একটি বেদীর উপর কুমারী ডলোররাসার প্রতিমূর্তি। মূর্তির সামনে একটি ফুলদানী)
মার্গারেট : (ফুলদানীতে টাটকা ফুল সাজিয়ে রাখতে রাখতে) আমার কথা শোনো হে কুমারী মাতা। দুঃখে ভারাক্রান্ত তোমার হৃদয়। তোমার মুখের উপর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বেদনার ছাপ। অন্তর্বেদনার যে তীক্ষ্ণ তরবারি তোমার বুকের মাঝে লুকোনো আছে তাই নিয়ে তুমি তাকিয়ে আছ সেই স্থানের উপর যেখানে তোমার পুত্র নিহত হয়। তুমি মাঝে মাঝে পরম পিতার পানেও তাকাচ্ছ। ধীরে ধীরে পুঞ্জীভুত হয়ে উঠছে। তোমার দীর্ঘশ্বাস। পরম পিতার দুঃখের সঙ্গে তোমার দুঃখে মিশিয়ে তা ঊর্ধ্ব তুলে ধরছ তুমি।
হায়, যে গভীর গোপন অন্তর্বেদনায় আমার সারা দেহমনে মুচড়ে উঠছে আমি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। আমার এই উদ্বিগ্ন অন্তরে কিসের এত জ্বালা, সংশয়ের কেন এত কম্পন, কামনার কেন এই ব্যাকুলতা তা একমাত্র তুমিই জান। একমাত্র তুমিই জান যেখানেই আমি যাই কিসের দুঃখ, সে কোন বেদনায় পীড়িত হতে থাকে আমার অন্তর। ঘরে আমি যখন একা থাকি তখন সর্বক্ষণ বিনিদ্র অবস্থায় আমি শুধু কাঁদতে থাকি। অবিরলভাবে চোখের জল ফেলে যাই। আর সহ্য করতে পারছি না। অন্তর ভেঙে পড়ছে আমার। প্রথম সকালের শিশিরভেজা ফুলের মতো জানালার ধারের পাত্রগুলো আমার চোখের জলে ভিজে যায়। আমার অন্তরের নিভৃতে সকালের সূর্য লাল আলো ফেলে। তবু আমি বুকের ভিতর একরাশ বিষাদ নিয়ে বিছানার উপর বসেছিলাম।
হে কুমারী দেবী, মৃত্যু ও যন্ত্রণার এই দুর্বিষহ পীড়ন থেকে উদ্ধার করো আমায়। হে বিষাদময়ী, তোমার উদার মুখের মমতা নিয়ে আমার অবস্থার উপর নজর দাও।
ঊনবিংশ দৃশ্য
রাত্রি
(মার্গারেটের ঘরের সম্মুখস্থ রাজপথ)
ভ্যালেন্টাইন।
মার্গারেটের ভাই ও একজন সৈনিক
মা: ভাই : আমি বসে বসে এতক্ষণ কতকগুলো লোকের দম্ভোক্তি ও গর্বোক্তি শুনছিলাম। প্রত্যেকেই তাদের আপন আপন সুন্দরী প্রেমিকাদের প্রশংসা করছিল আমার কাছে। তারা তখন সকলেই টোস্ট আর মদ খাচ্ছিল। আমি এককোণে শান্তভাবে বসে বসে তাদের গর্বোক্তি শুনছিলাম। আমি তখন আমার দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললাম, সকলেই তো প্রেমের ব্যাপারে বাহাদুর। কিন্তু সারা দেশের মধ্যে এমন কি কেউ আছে যে মার্গারেটের মতো খাঁটি মেয়ের সামনে বাতি তুলে ধরতে পারে? তখন সকলেই আমার কথায় সচকিত হয়ে উঠল। কেউ কেউ বলল, “ও ঠিকই বলছে। আবার কেউ কেউ বলল, মার্গারেট সত্যিসত্যিই এক নারীরত্ন। নারীত্বের নিষ্পাপ কুসুম আজও ফুটে আছে তার মধ্যে। আমার সেই কথায় তাদের সব গর্বোক্তি স্তব্ধ হয়ে যায় একেবারে। কিন্তু আজ? আজ ক্রোধে ও বিরক্তিতে আমার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হচ্ছে এবং মাথাটাকে ফাটিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। আজ যে কোনও একটা বাজে ছোকরা আমার মুখের উপর তার নাক নেড়ে বিদ্রুপের দ্বারা বিদ্ধ করতে পারে আমায়।
