মার্গারেট : এসব কথা শুনতে খুবই ভালো লাগে। ধর্মপ্রচারকরা এইভাবেই কথা বলেন। শুধু শব্দ প্রয়োগের কিছু তারতম্য আছে।
ফাউস্ট : সব জায়গায় সেই একই ব্যাপার চলছে। কোনও ধর্মীয় উৎসবের দিনে সব মানুষ যেমন একই আনন্দ অনুভব করে আর সেই আনন্দ আপন আপন ভাষায় প্রকাশ করে, আমিও তেমনি আমার আনন্দ আমার নিজস্ব ভাষায় প্রকাশ করি।
মার্গারেট : তোমার কথা শুনে মনে হয় ঠিক আছে। কিন্তু পরে বোঝা যায় তোমার কথার মধ্যে কিছু অবাঞ্ছিত দিক আছে, কারণ তুমি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করনি।
ফাউস্ট : হে আমার প্রিয়তমা।
মার্গারেট : আমি বহু দিন ধরে আশা করে এসেছি তুমি এই ধর্ম সম্প্রদায়ের লোক হয়ে উঠবে।
ফাউস্ট : কেমন করে!
মার্গারেট : যে লোকটি তোমার সাথী হিসাবে তোমার সঙ্গে ঘোরাফেরা করে তাকে আমি অন্তর থেকে গভীরভাবে ঘৃণা করি। মুখদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে আমার অন্তরে যে দুঃসহ ঘৃণার অনুভূতি জেগে ওঠে, আমার সারাজীবনের মধ্যে তেমন অনুভূতি আর কখনও জাগেনি।
ফাউস্ট : না না, তাকে ভয় করো না প্রিয়তমা।
মার্গারেট : সে এখানে এসে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয় কোনও অশুভ শক্তি এসে হাজির হয়েছে। সে ছাড়া আর সব লোকের প্রতিই আমার সহানুভূতি আছে। যখনি তোমাকে দেখার জন্য অন্তর আমার ব্যাকুল হয়ে ওঠে তখনি তার সম্বন্ধে একটা গোপন বিভীষিকা আমাকে পেয়ে বসে, একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমার মনে হয় লোকটা এক পাকা জুয়াচোর। যদি আমি তার প্রতি কোনও অন্যায় করে থাকি। তাহলে ঈশ্বর আমায় ক্ষমা করুন।
ফাউস্ট : এই ধরনের কিছু অদ্ভুত পাখি এখানে ওখানে আছে।
মার্গারেট : ওই ধরনের লোকের সঙ্গে বাস করা কখনই সম্ভব নয় আমার পক্ষে। সে ঘরের ভিতর ঢুকেই চারদিকে নাসিকা কুঞ্চিত করে কি সব দেখতে থাকে। তার দৃষ্টির সঙ্গে মিশে থাকে অহেতুক রোষ! তার কপালের উপর যেন একটা ব্যথা লেখা আছে। সে ব্যথা হলো, প্রেম মাত্রই ঘৃণ্য তার কাছে; অথচ দেখো, আমার আলিঙ্গনের মধ্যে আমি কত সুখ পাই। মুক্তিতে কত অন্তহীন, আত্মসমর্পণে কত নিবিড় আর প্রেমে কত উত্তপ্ত হয়ে উঠি আমি। অথচ তার উপস্থিতিতে পাথরের মতো কঠিন হয়ে ওঠে আমার অন্তরাত্মা।
ফাউস্ট : খুব ভীতু তুমি।
মার্গারেট : এই ভয় আমাকে এতদূর আচ্ছন্ন করে ফেলে যে যখন যেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয়, মনে হয় আমি তোমার প্রতিও আমার সব ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছি। সে কাছে থাকলে আমি ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করতে পারি না। আমার অন্তরে জ্বলতে থাকে শুধু তখন অহেতুক এক বিতৃষ্ণার আগুন। সে আগুনের ছোঁয়া থেকে তুমিও বাদ যাও না।
ফাউস্ট : আসলে ওটা তোমার মনের স্বাভাবিক বিরাগ।
মার্গারেট : কিন্তু আমি ওটাকে দূর করতে পারি না।
ফাউস্ট : আচ্ছা আমরা কি কোথাও পরস্পরের খুব কাছাকাছি কিছু নিবিড় নির্জন মুহূর্ত কাটাতে পারি না? সে নৈকট্যের নিবিড়তায় দুজনের দেহ-মন এক হয়ে মিশে যায়, সে নৈকট্য লাভ করতে পারি না?
মার্গারেট : হায়, যদি আমার পৃথক শোবার ঘর থাকত! আমি তাহলে তোমাকে নিয়ে আমার ঘরে গিয়ে খিল দিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমাকে মার কাছে শুতে হয় এবং মার ঘুম এমনই সজাগ যে আমরা সেখানে যাওয়া মাত্র তিনি জানতে পারবেন আর সেটা হবে আমার পক্ষে মৃত্যুর সমতুল।
ফাউস্ট : ভয় করো না প্রিয়তমা। এই শিশিটায় ওষুধ আছে। এর তিন ফোঁটা কোনও পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে তাঁকে যদি খাইয়ে দিতে পার তাহলে এমন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন তিনি যে কোনও চেতনাই তার তখন থাকবে না। কিছুই টের পাবেন না।
মার্গারেট : তোমার আনন্দ বিধানের জন্য এমন কি কাজ আছে যা আমি পারব? এ ওষুধ প্রয়োগ করলে তার কোনও ক্ষতি হবে না তো?
ফাউস্ট : ক্ষতি হলে আমি তোমাকে এটা প্রয়োগ করতে বলতাম না।
মার্গারেট : হে প্রিয়তম, তোমার মুখপানে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে জানি না কেন আমি সব কিছু ভুলে যাই। তোমার ইচ্ছাপূরণই তখন আমার একমাত্র কাম্য হয়ে ওঠে। তোমার জন্য আমি আগেই অনেক কিছু করেছি। সুতরাং করার আর অল্পই বাকি আছে। (প্রস্থান)
মেফিস্টোফেলিসের প্রবেশ
মেফিস্টোফেলিস : ওহে বাঁদর মশাই! মেয়েটা চলে গেছে?
ফাউস্ট : আবার গুপ্তচরগিরি করছ?
মেফিস্টোফেলিস : আমি শুনতে পেয়েছি কিভাবে মেয়েটা তোমাকে তার কাছে টেনে নেয় আপন করে। এটা এখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ডাক্তার ফাউস্ট এখন তার কবলে। আমার আশা, এতে তোমার অনেক মঙ্গল হবে। প্রাচীনদের মতে মেয়েরা চায় তাকে প্রণয়ীরা একই সঙ্গে যৌবনসৌন্দর্য ও সততায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক। কারণ একমাত্র সৎ যুবকরাই তাদের অকুষ্ঠভাবে অনুসরণ করে।
ফাউস্ট : তুমি একটা পশু। তুমি জানতে চাও না এত ভালো মেয়েটা যার অন্তঃকরণ এত পবিত্র সে কেন খারাপ হলো (যদি কিছু খারাপ থাকে তার মধ্যে)। তার বিশ্বাস প্রেমের মধ্যেই সে খুঁজে পাবে তার মুক্তি। তার একমাত্র ভয় যাকে সে ভালোবাসে সেই ভালোবাসার মানুষ বুঝিবা তার হাতছাড়া হয়ে যায়।
মেফিস্টোফেলিস : ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও ইন্দ্রিয়াতীত কামনাবাসনায় পূর্ণ তুমি। তুমি বুঝতে পারছ না একটা সামান্য নারী তোমার নাকে দড়ি ধরে ঘোরাচ্ছে।
ফাউস্ট : এই সব কুচিন্তা মনে থেকে দূর করে দাও।
