মেফিস্টোফেলিস : তোমাদের সুন্দর জুটি দেখে আমার বড় ঈর্ষা হয়। তোমরা দুজনে যখন ঘুরে বেড়াও তখন দেখে মনে হয় তোমরা যেন গোলাপের মধু খেয়ে বেড়াচ্ছ গোলাপ বনে।
ফাউস্ট : দূর হয়ে যাও মিথ্যাবাদী।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি আমাকে গাল দিচ্ছ, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তুমি কৌতুক করছ। যে ঈশ্বর বিশ্বে যৌবন ও সুন্দরী তরুণীদের সৃষ্টি করেছেন তিনি যুবক-যুবতীদের মিলনের ব্যবস্থাও করে রেখেছেন তার সৃষ্টি রক্ষার্থে। এই মিলনের পিছনে আছে গভীর ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য। সুতরাং যাও। মনে রেখো, মৃত্যুর কবলে নয়, তোমার প্রতীক্ষমানা প্রিয়তমার নিভৃত কক্ষে যাওয়াই তোমার এখন সবচেয়ে বড় কর্তব্য।
ফাউস্ট : তার আলিঙ্গনের মধ্যে কি আছে? স্বর্গীয় সুখের সুষমা? যদিও তার অমিত চুম্বনমাধুর্যে আমি ধন্য, তথাপি তার কোনও অভাব বা প্রয়োজন মেটানোও কি আমার কর্তব্য নয়। আমি একজন পলাতকের মতো গৃহহারা অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমার কোনও উদ্দেশ্য নেই, লক্ষ্যস্থল নেই। উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুটে চলা উন্মত্ত কোনও পার্বত্য নদীর মতোই আমার জীবন। আর সে আমার এই চলমান জীবন-স্রোতের ধারে প্রস্তরকঠিন এক দৃঢ় ভিত্তিভূমির উপর শান্ত সংসার জীবনযাপন করছে। তার জগৎ এই শান্ত সরল সংসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর আমি আমার অর্থহীন উদ্দেশ্যহীন গতির উন্মত্ত আঘাতে পথের দুপাশের পাথরগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে ধুলো করে দিচ্ছি। তবু তার শান্ত গৃহকোণের সেই সুখকে এখনও ঘৃণা করি, তুচ্ছ জ্ঞান করি আমি। হে নরকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, তুমি কি তাকে তোমার বলি হিসাবে চাও? হে আমার প্রিয় শয়তান, আমাকে এই দুঃখের মাঝে পথ দেখাও। যা হবার তা যেন তাড়াতাড়ি হয়। তার ভাগ্যকে আমার ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে দাও। তারপর দুটি ভাগ্যকেই পূর্ণ বিচূর্ণ করে দাও। আমরা দুজনেই ধ্বংস হয়ে যাই একসঙ্গে একেবারে।
মেফিস্টোফেলিস : আবার আবেগে বকতে শুরু করেছে। যাও নির্বোধ, তার কাছে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দাওগে। তোমরা যখন কোনও সমস্যার সমাধান খুঁজে পাও না, কোনও পথ খুঁজে পাও না তখনই ভাব মৃত্যু এসে গেছে নিকটে। যে বিপদের মধ্যে স্থির থাকতে পারে দৃঢ়চেতা স্থিরবুদ্ধি সেই মানুষকে সাদরে বারণ করে নেবে। এমন কি দরকার মনে করলে শয়তানের রূপ ধারণ করবে। হতাশার মতো আর কোনও জিনিস কোনও মানুষকে এত দুর্বল করতে পারে না।
পঞ্চদশ দৃশ্য
মার্গারেটের কক্ষ
মার্গারেট : (একাকী চরকা কাটছিল) আমার মনের শান্তি চলে গেছে। আমার হৃদয়ের ক্ষতে রক্ত ঝরছে। হায়, আমি আর তাকে কখনও দেখতে পাব না। কখনও না। অথচ তাকে কাছে না পেলে আমার মৃত্যুবরণ করা ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না। গোটা জগত্তা বিষাক্ত ঠেকছে আমার চোখে। তিক্ত লাগছে সবকিছু। আমার অসহায় মস্তিষ্ক উন্মাদের মতো ঘুরছে। আমি আমার চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। বিহ্বল হয়ে পড়েছে আমার চেতনা। আমার মনের শান্তি চলে গেছে। হৃদয়ের ক্ষতে রক্ত ঝরছে। হায়, আমি তাকে আর কখনও দেখতে পাব না। অথচ তাকে দেখার জন্য আমি এই জানালার ধারে বসে আছি। শুধু তাকে দেখার জন্যই আমি আবার বাড়ি ত্যাগ করেছি। তার আনন্দোচ্ছল স্বভাব, উন্নত চেহারা, তার সুন্দর মুখের হাসি, তার চোখের উজ্জ্বল দৃষ্টি, তার কথা বলার আশ্চর্য ঐন্দ্রজালিক ভঙ্গিমা, তার হাতের স্পর্শ ও চুম্বনের মাধুর্য সবকিছু পেতে চাই আমি। আজ আমার অন্তর শুধু তাকে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে একান্তভাবে। আজ আমি যদি তাকে আলিঙ্গন করতে পারতাম নিবিড়ভাবে। আজ যদি তাকে প্রাণভরে চুম্বন করতে করতে সেই চুম্বনানন্দের মধ্যে নিঃশেষে তলিয়ে যেত আমার সমস্ত জীবনচেতনা তাহলে কত ভালো হতো।
ষোড়শ দৃশ্য
মার্থার বাগান
মার্গারেট। ফাউস্ট
মার্গারেট : বলল, আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও হেনরি–
ফাউস্ট : বলো কিসের প্রতিশ্রুতি!
মার্গারেট : তোমার ধর্ম কি? মানুষ হিসাবে তুমি ভালো, তোমার অন্তঃকরণ সৎ। তবু মনে হয় ধর্মেকর্মে তোমার মন নেই।
ফাউস্ট : ওকথা এখন বাদ দাও বাছা। তুমি জান আমার প্রেম কত গভীর, কত খাঁটি। এই প্রেমের খাতিরে আমার দেহের রক্ত ও প্রাণ পর্যন্ত দান করতে রাজি আমি। কিন্তু ধর্মের জন্য নয়।
মার্গারেট : সেটা ঠিক নয়। ধর্মে বিশ্বাস রাখা ভালো।
ফাউস্ট : তাই নাকি?
মার্গারেট : তোমার উপর যদি কোনও প্রভাব খাটাতে পারতাম তাহলে হয়ত তুমি ধর্মে বিশ্বাস করতে না।
ফাউস্ট : ধর্মে শ্রদ্ধা আমার আছে।
মার্গারেট : কিন্তু ধর্মের কোনও সত্যকে তুমি লাভ করতে চাও না। বহুদিন হলো তুমি প্রার্থনা বা স্বীকারোক্তি করনি। অথচ বলছ ঈশ্বরে বিশ্বাস করো।
ফাউস্ট : হে আমার প্রিয়তমা, কে জোর গলায় বলতে পারে আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি? কোনও পুরোহিত বা সাধককে জিজ্ঞাসা করো। তার উত্তরটা প্রশ্নকারীর কানে উপহাসের মতো শোনাবে।
মার্গারেট : তাহলে তুমি বিশ্বাস করো না?
ফাউস্ট : আমার কথায় ভুল বুঝো না সুবদনে। কে ঈশ্বরের মহিমাকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারে? কে ঈশ্বরকে সর্বক্ষণ অবলম্বন করে বলতে পারে আমি তাকে বিশ্বাস করি? আবার এমনই বা কে আছে যে তার সমস্ত অনুভূতি ও দৃষ্টিশক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস করতে পারে? ঊর্ধ্ব অধঃ ও সর্ব দিকে যিনি ব্যপ্ত তিনি তোমাকে আমাকে ও নিজেকে আচ্ছন্ন করে নেই। আমাদের মাথার উপরে কি আকাশ নেই, আমাদের পায়ের নিচেও কি পৃথিবীর মাটি নেই? সেই আকাশের উপর কি উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজি কিরণ দান করে না? তোমার চোখে চোখ দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি কি আমার মস্তিষ্কে ও অন্তরের অন্তঃস্থলে সেই আশ্চর্য শক্তির অস্তিত্বকে অনুভব করছি না, চিরন্তন যে শক্তি অনন্তকাল ধরে আমাদের জীবনে কখনও দৃশ্যত আবার কখনও অপরিদৃশ্যভাবে রহস্যের জাল বুনে চলেছে, সেই মহাশক্তির দ্বারা তোমার অন্তঃকরণকে পরিপূর্ণ করে তুলতে পার। যখন সেই মহাশক্তিকে অন্তরে অনুভব করবে আর সেই অনুভূতির দ্বারা তোমার সমগ্র প্রাণমন আচ্ছন্ন হয়ে উঠবে তখন তুমি তাকে পরম সুখ, ঈশ্বর প্রভৃতি যে কোন নামে অভিহিত করতে পার। আমি তাকে কোনও নামে ডাকতে চাই না। অনুভূতিই হলো আসল কথা। যত সব নামই বিভ্রান্তির ধূম্রজাল সৃষ্টি করে ঈশ্বরের উজ্জ্বল জ্যোতিকে ম্লান করে দেয়।
