(মেফিস্টোফেলিস প্রবেশ করল)।
মেফিস্টোফেলিস : এ সব চিন্তা ও অনুধ্যান জীবনে তো অনেক করেছ। এ নিয়ে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন কি? জীবনে যে কোনও পরীক্ষা একবারই করতে হয়। এখন নূতন কিছুর কথা ভাব।
ফাউস্ট : আমার এই শুভ দিনটাকে অশুভ ও দুষিত করে দেওয়ার জন্য আবার কি কাজের পরিকল্পনা নিয়ে এসেছ?
মেফিস্টোফেলিস : হ্যাঁ, আমি তোমাকে নূতন কাজেই নিযুক্ত করব। কিন্তু একথা তোমার মুখ ফুটে আমার কাছে বলা ঠিক নয়। তোমার মতো একটা আধপাগলা, অজ্ঞ, সহকমী আমার না থাকলেও আমার বিশেষ কোনও ক্ষতি হবে না। কিন্তু কাজ ছাড়া তো মানুষ থাকতে পারে না। হাতে কিছু কাজ তো দরকার। সুতরাং তোমার মুখে একথা সাজে না।
ফাউস্ট : তোমার সেই এক কথা। সেই এক সুর। তোমাকে আর আমার মোটেই ভালো লাগে না। ধন্যবাদ, যাও।
মেফিস্টোফেলিস : হে ধরিত্রীর অসহায় সন্তান! আমাকে ছাড়া কেমন করে একা তুমি থাকবে? একদিন আমি তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছি। তোমার চিন্তার দীনতা আর তোমায় পীড়িত করে না। আমি যদি তোমার জীবনে না আসতাম তাহলে তুমি অবশ্য এই গোলাকার পৃথিবীতে ঠিকই চলে ফিরে বেড়াতে। কিন্তু তবে কেন এই পার্বত্যগুহার অন্ধকারে বসে পেঁচার মতো মিটমিট করে চেয়ে আছ? এই সব শ্যাওলাধরা পাথর হতে বিষাক্ত ব্যাঙের মতো চিন্তার কী এমন খোরাক সংগ্রহ করছ? সময় কাটাবার চমৎকার উপায় । আমি দেখছি তোমার মধ্যে সেই ডাক্তারটা এখনও রয়েছে।
ফাউস্ট : এই অরণ্যময় পার্বত্যপ্রদেশের সঙ্গে নিবিড় সহযোগে কী এমন অভিনব প্রাণশক্তি আহরণ করতে পারি বলে তোমার মনে হয়? তবে সত্যিই তোমার যদি ধারণাশক্তি থাকত তাহলে নিশ্চয় তুমি আমি যে শক্তি সে সম্পদ লাভ করেছি এর থেকে তাতে ঈর্ষাবোধ করতে।
মেফিস্টোফেলিস : অতিপ্রাকৃত উৎস হতে পরম সুখ। রাত্রিতে শিশির ভেজা পাহাড়ের উপর আকাশের পানে তাকিয়ে ভাববে আর তোমার আকাশচারী কল্পনার অনন্তপ্রসারী প্লাবনে স্বর্গমর্ত্য সব একাকার হয়ে ভেসে যাবে। তোমার মনে হবে তুমি ঈশ্বরের খুব কাছাকাছি চলে গেছ। মনে হবে এক বিরাট দৈবশক্তি লাভ করেছ। সেই শক্তির এক অনাস্বাদিতপূর্ণ অহঙ্কার এক অপার্থিব সূক্ষ্ম সুখানুভূতি তোমার কর্মজীবনের সমস্ত কঠোরতাকে দূরীভূত করে দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি অস্থিমজ্জায়, তার প্রতিটি অন্ধকার সংকীর্ণতায়, প্রতিটি বস্তুর উপর ঝরে পড়বে। আর ঠিক তখন পরমার্থরূপ চূড়ান্ত পুষ্পটি চয়ন করার এক সমুন্নত প্রবৃত্তি আচ্ছন্ন করে তুলবে তোমার সমগ্র অন্তরাত্মাকে। (অঙ্গভঙ্গি করে) অবশ্য কেমন করে তা সম্ভব হবে তা বলতে পারব না।
ফাউস্ট : তোমার লজ্জা হওয়া উচিত।
মেফিস্টোফেলিস : হ্যাঁ বুঝেছি, কথাটা তোমার খুবই অপ্রিয় লাগছে। বর্তমানে অবশ্য আমাকে লজ্জা দেবার মতো নৈতিক অধিকার আছে তোমার। কোনও সৎ লোকের কাছে এ কথা কেউ বলতে পারে না এবং সৎ লোকের অন্তঃকরণ তা সহ্য করতে পারে না। নিজেকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে প্রতারিত করার তোমার এই আনন্দে কখনই ঈর্ষা বোধ করি না আমি। কিন্তু এ অবস্থা বেশি দিন চলতে পারে না তোমার। তুমি এখনই দারুণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছ। শীঘ্রই ভয়ে উন্মাদ হয়ে যাবে। যাই হোক, ও কথা ছেড়ে দাও। অদূরে বসে রয়েছে তোমার প্রিয়তমা। তাকে বড় বিমর্ষ ও চিন্তাক্লিষ্ট দেখাচ্ছে। এক প্রবল প্রেমানুভূতিতে আলোড়িত হয়ে উঠেছে তার অন্তর। তোমাকে আরও নিবিড় করে পাবার জন্য সে হয়ে উঠেছে আগের থেকে আরও ব্যাকুল। পাহাড় থেকে সমতলভূমির দিকে নেমে আসা বরফগলা জলের স্রোতের মতো একদিন তোমার উচ্ছ্বসিত প্রেমের বন্যায় অবগাহন করে ধন্য হয় সে। আজ তোমার বিরহে শুকিয়ে গেছে সে স্রোতোধারা। আমার মতে এই নির্জন বনপ্রদেশে একা একা বসে না থেকে ঐ তরুণ যুবতীর কাছে গিয়ে তার প্রেমলাভে ধন্য হওয়া ঢের ভালো। তার সময় এখন দুঃখে কাটতে চাইছে না। তার এই ক্রমপ্রলম্বিত সময় কাটানোর জন্য জানালার মধ্য দিয়ে নগর প্রাচীরের উপর ভাসমান মেঘমালার পানে তাকিয়ে থাকে। ‘আমি যদি পাখি হতাম’ এই গানটি সে সারাদিন ও অর্ধরাত্রি পর্যন্ত গেয়ে চলে সকরুণ সুরে। কখনও সে অত্যধিক দুঃখের তাড়নায় চোখের জল ফেলছে, আবার কখনও বা নীরবে বসে বসে ভাবছে। এখন প্রেমোন্মত্ততার লক্ষণগুলো প্রকটিত হয়ে উঠেছে তার মধ্যে পূর্ণমাত্রায়।
ফাউস্ট : সাপ। সাপ। কুটিল সাপের মতোই তুমি ভয়ঙ্কর।
মেফিস্টোফেলিস : (স্বগত) হা-হা। এবার কি তাহলে ফাঁদে ফেলতে পেরেছি তোমায়!
ফাউস্ট : যে অন্যায় করেছ, তাই নিয়েই চলে যাও। আর না। সেই সুন্দরীর নাম আর আমার কাছে করো না। আমার অর্ধাবিষ্ট অর্ধাচ্ছন্ন চেতনার উপর তার লাবণ্যবতী দেহের প্রতি কোনও জারজ লালসাকে নূতন করে জাগিয়ে তুলল না আর।
মেফিস্টোফেলিস : এখন তাহলে তুমি কি করবে? সে ভাবছে তুমি হয়ত চলে গেছ, পালিয়ে গেছ। এখন দেখছি সত্যিই তোমার সত্তার অর্ধেক পালিয়ে গেছে তোমাকে ছেড়ে আর অর্ধেক অবশিষ্ট আছে তোমার মধ্যে।
ফাউস্ট : অথচ আমি কাছেই রয়েছি। আমার প্রিয়তমা আমি দূরে না গেলেও আমাকে পাচ্ছে না। আমার প্রতীক্ষায় মুহূর্ত গণনা করছে। আমি তার মধুর ওষ্ঠাধর স্পর্শ করতে পেলে বেদীর সামনে সহসা আবির্ভূত ঈশ্বরের দেহকেও চাইব না।
