ফাউস্ট : হে আমার প্রিয়তমা!
মার্গারেট : একটু থামো। (একটি ফুল তুলে তার পাতাগুলো একের পর এক করে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল)
ফাউস্ট : ফুলটা কি নাকে নিয়ে শুকবে?
মার্গারেট : না, খেলা করব।
ফাউস্ট : কিভাবে?
মার্গারেট : যাও তুমি ঠাট্টা করবে আমাকে। (পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলে বিড়বিড় করে কি বলতে লাগল)
ফাউস্ট : কি বিড়বিড় করে বলছ?
মার্গারেট : (অর্ধস্ফুট স্বরে) সে আমার ভালোবাসে না–মোটেই ভালোবাসে না।
ফাউস্ট : হে আমার সুন্দরী প্রিয়তমা। দেবদূতের মতো আমার আত্মা।
মার্গারেট : আমায় ভালোবাসে না–ভালোবাসে না–না, না। (ফুলের বৃন্ত হতে শেষ পাতাটা ছিঁড়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল)।
হ্যাঁ, আমায় ভালোবাসে। ভালোবাসে।
ফাউস্ট : হ্যাঁ, তোমার শিশুসুলভ কণ্ঠে এই ফুলের কুঁড়িটি যে কথা বলছে তার মধ্যে যেন স্বর্গের সুষমা নেমে আসে। হ্যাঁ, সে তোমায় ভালোবাসে। একথার মানে নিশ্চয় তুমি জান? সে তোমায় ভালবাসে)।
(মার্গারেটের দুটি হাত ধরল)।
মার্গারেট : আমার কাঁপুনি আসছে।
ফাউস্ট : না না, কেঁপো না। আমার এই দৃষ্টি আর হাতের উষ্ণনিবিড় স্পর্শের খাতিরে তোমার মনের গভীরগোপন সেই অব্যক্ত কথাটি বলে ফেল। জেনে রেখো, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মধ্যে যে আনন্দ আছে সে আনন্দ শাশ্বত চিরন্তন। বিচ্ছেদে হতাশা আছে ঠিক, কিন্তু বিচ্ছেদ যেন না ঘটে।
মাথা : (সামনে এগিয়ে এসে) রাত্রি নেমে আসছে।
মেফিস্টোফেলিস : এবার আমাদের চলে যেতে হবে।
মার্থা : এখানে তোমাদের আরও কিছুদিন থাকার জন্য বলতাম। কিন্তু এ শহরে নিন্দুকদের জিহ্বা বড় তীক্ষ্ণ। প্রতিবেশীদের কাজকর্মের উপর নজর ছাড়া তাদের অন্য কোনও কাজ নেই। যে যাই করুক, তাই নিয়ে কথা বলাবলি করবে প্রতিবেশীরা। ওরা আবার গেল কোথায়?
মেফিস্টোফেলিস : বসন্তের সুখী পাখির মতো অদূরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মার্থা : ভদ্রলোককে দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেছে।
মেফিস্টোফেলিস : আর মেয়েটাও তার প্রেমে পড়ে গেছে। এইভাবে এই সব ভালোবাসাবাসির মধ্য দিয়েই জগৎ এগিয়ে চলেছে।
ত্রয়োদশ দৃশ্য
বাগানবাড়ি
(মার্গারেট ঘরের ভিতর ঢুকে দরজার কপাটের আড়ালে লুকিয়ে ফুটো দিয়ে দেখতে লাগল)
মার্গারেট : ঐ এসে গেছে ও।
ফাউস্ট : (প্রবেশ করে) দুষ্ট কোথাকার! তুমি আমায় বেশ ঠকিয়েছ। এবার ধরে ফেলেছি। (চুম্বন করল)
মার্গারেট : (ফাউস্টকে জড়িয়ে ধরে চুম্বনের প্রতিদান দিল)।
হে আমার প্রিয়তম! আমি তোমায় অন্তরের সঙ্গে ভালোবাসি।
(মেফিস্টোফেলিস দরজায় করাঘাত করতে লাগল)
ফাউস্ট : কে ওখানে?
মেফিস্টোফেলিস : তোমার বন্ধু।
ফাউস্ট : একটা পশু।
মেফিস্টোফেলিস : আমাদের যাবার সময় হয়ে গেছে।
মার্থা : হ্যাঁ, দেরি হয়ে গেছে।
ফাউস্ট : আমি কি তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারি না।
মার্গারেট : আমার মা ডাকছে–বিদায়।
ফাউস্ট : হায়, আমি কি থেকে যেতে পারি না? বিদায়।
মার্থা : বিদায়।
মার্গারেট : আবার শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে। (ফাউস্ট ও মেফিস্টোফেলিসের প্রস্থান)
মার্গারেট : হা ভগবান! একটা মানুষ এত কিছু জানতে পারে? আমি তার কথা শুনতে শুনতে অবাক বিস্ময়ে শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছি আর মাঝে মাঝে তার সব কথায় ‘হাঁ’ দিয়ে এসেছি। তার কাছে আমি এক অজ্ঞ শিশুমাত্র। জানি না আমার মধ্যে সে কি পেয়েছে। (প্রস্থান)
চতুর্দশ দৃশ্য
অরণ্যপ্রদেশ সংলগ্ন পার্বত্যগুহা
হে মহতী দৈবশক্তি, আমি যা যা প্রার্থনা করেছিলাম তুমি তা সব দিয়েছ। তুমি শুধু প্রজ্বলিত অগ্নির আলোকে তোমার রহস্যময় মুখমণ্ডলটি উদঘাটিত করনি, তুমি আমাকে দান করেছ প্রকৃতির বিরাট রাজ্য আর আমাকে দিয়েছ তা অনুভব করার ও উপভোগ করার ক্ষমতা। তোমার যে মুখমণ্ডল আজ আমার কাছে উদ্মাটিত তা শুধু হিমশীতল ঔদাসীন্যে প্রস্তরীভূত নয়, অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো তোমার বুকের গভীরে সব কিছু প্রত্যক্ষ করতে পাচ্ছি আমি। সমস্ত সচেতন প্রাণীদের আমার কাছে নিয়ে এসে বশীভূত করে দিয়েছ আমায়। বাতাসে জলে নীরব বনভূমিতে আমার ভ্রাতৃপ্রতিম যে সব শক্তি আছে তুমি তাদের চিনিয়ে দিয়েছ আমায়। প্রচণ্ড ঝড়ের গর্জনে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে যখন সমগ্র বনভূমি, দৈত্যকার ফারগাছগুলোর পতনশীল শাখাপ্রশাখা ও কাণ্ডগুলো পরস্পরের আঘাতে বিচুর্ণিত হয়ে থাকে, তখন তুমি আমাকে কোনও নির্জন গুহার নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাও। আমার নিজের অন্তরাত্মাকে উঘাটিত করে তোলো আমার। কাছে। আমার বুকে লুকিয়ে আছে যে রহস্যের ইন্দ্রজাল তার গ্রন্থিগুলোকেও উন্মোচিত করো আমার কাছে। তারপর পূর্ণচন্দ্রের স্নিগ্ধ আলো যখন আমার চোখের সামনে নেমে আসে তখন চারদিকের জটিল বনান্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে যেন সুদূর অতীত যুগের শুভোজ্জ্বল অজস্র প্রেতাত্মা। আমার আনন্দের সমস্ত উচ্ছ্বাসকে সংযত করে তারা। আজ আমি একটি বিষয়ে পূর্ণমাত্রায় সচেতন যে কোনও মানুষই পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারে না। এই সত্যোপলব্ধির গভীরতা আমাকে ঈশ্বরের সামীপ্যে নিয়ে যায়। তারপর হে শক্তি, তুমি আমাকে দাও এমনই এক বন্ধু ও সহকর্মী যাকে ছাড়া আমি আর একবিন্দুও চলতে পারি না, অথচ যে আমাকে আমার নিজের কাছে ছোট করে তোলে সব সময়ে। সে কেমন যেন উদাসীন; তার সাহচর্য ঘৃণ্য বোধ হয় আমার কাছে। তোমার সব দানকে তুচ্ছতায় নিরর্থক করে তোলে। আমার অশান্ত বুকের ভিতর জাগিয়ে তোলে অবৈধ কামনার এক অক্লান্ত অনির্বাণ আগুন। সেই সুন্দরীকে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি আমি। কামনা পরিতৃপ্তির জন্য আমি উন্মত্ত হয়ে ছুটে চলি। কিন্তু সে কামনার বস্তুকে যতই উপভোগ করি ততই বেড়ে যায় সে কামনা।
