মেফিস্টোফেলিস : আমি ভয়ে ভয়ে দেখতে চাই ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে যায়।
মার্থা : তাহলে আপনার ভাগ্যের উন্নতি ঘটাবার চেষ্টা করুন।
(তারা চলে গেল)
মার্গারেট : হ্যাঁ, চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল। আপনার সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার এখন আমার খুবই ভালো লাগছে। কিন্তু আপনার জন্য অন্য অনেক জায়গায় বন্ধুবান্ধব আছে। তারা আমার থেকে অনেক জ্ঞানী।
ফাউস্ট : আমাকে বিশ্বাস করো প্রিয়তমা। লোকে সাধারণত যাদের জ্ঞানী বলে তারা অহঙ্কারী, সংকীর্ণচেতা।
মার্গারেট : তা কি করে হয়?
ফাউস্ট : যারা সরল প্রকৃতির,যারা নির্দোষ তারা জানে না তাদের সরলতা ও নির্দোষিতার মূল্য এবং আবেদন কতখানি। এই সরলতা ও নম্রতা প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ দান, মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ।
মার্গারেট : আপনি যদি আমার কথা মনে এক মুহূর্তের জন্য স্থান দেন, তাহলে আপনি যখন যেখানেই থাকুন আপনার কথা আমি ভাবব।
ফাউস্ট : তোমার হয়ত খুব একা একা লাগে।
মার্গারেট : আমাদের সংসার খুবই ছোট। আপনি সেখানে গেলে ভালো আদরযত্ন পাবেন। আপনার মনে হবে এটা আপনার নিজের সংসার। আমাদের বাড়িতে কোনও দাসী নেই। আমি নিজে ঝট দেওয়া, সেলাই করা, উল বোনা, রান্না করা প্রভৃতি সব কাজই করি। সংসার সম্বন্ধে আমার মার জ্ঞান বেশ পাকা। শুধু যে খরচ বাঁচাবার জন্য আমরা সংসারের সব কাজ নিজেরা করি তা নয়। আমাদের আয় ছিল, আমরা আর পাঁচজনের থেকে আরামে থাকতে পারতাম। আমার বাবা আমাদের জন্য বেশ কিছু বিষয় সম্পত্তি রেখে যান। শহরের কাছে একটা বাড়ি আর একটা বাগান আছে আমাদের। বর্তমানে আমাদের জীবনে খুব একটা অভাবের তাড়না বা ব্যস্ততা নেই। আমার ভাই সৈনিকের কাজ করে। আমরা একটা ছোট বোন ছিল। সে মারা গেছে। তাকে নিয়ে অবশ্য আমাকে বেশ কষ্ট সহ্য করতে হয় কিছুকাল। তবু সে ছিল আমার বড় প্রিয় এবং তার জন্য আবার আমি সেই কষ্টের জীবনযাপন করতে রাজি আছি।
ফাউস্ট : দেবদূতের মতোই গুণবতী তুমি।
মার্গারেট : আমিই তাকে মানুষ করতাম। আমি তাকে দারুণ ভালোবাসতাম। সে ভূমিষ্ঠ হবার আগেই বাবা মারা যান। মা তখন রোগে শয্যাশায়ী, তার অবস্থা তখন বড়ই খারাপ। কোনও রকমে মা ধীরে ধীরে সেরে উঠছিলেন। তাঁর অত্যধিক দুর্বলতার জন্য তিনি শিশুটার দিক নজর দিতে পারছিলেন না মোটেই। তাই আমিই তার দেখাশোনা করতাম। জল দুধ যা খাওয়াবার আমিই তাকে খাওয়াতাম। আমিই তাকে কোলে রেখে গান গেয়ে ঘুম পাড়াতাম। তারপর দিনে দিনে সে বেড়ে উঠতে লাগল। তার স্বাস্থ্য ভালো হতে লাগল। সে আমার মুখপানে তাকিয়ে প্রায়ই হাসত।
ফাউস্ট : তখন নিশ্চয় তুমি এক পবিত্রতম আনন্দ লাভ করতে। তোমার কষ্টের লাঘব হতো।
মার্গারেট : তবে তাকে নিয়ে আমাকে অনেক ক্লান্তিকর মুহূর্ত যাপন করতে হতো। রাত্রিতে আমার সেই ছোট্ট বোনের দোলনাটা রাখতাম আমার বিছানার ঠিক পাশেই। সে একটু নড়লেই আমি টের পেতাম আর আমার ঘুম ভেঙে যেত। তখন আমি তাকে কোলে নিয়ে আদর করতাম। আমার নরম বুকে নিবিড়ভাবে চেপে ধরতাম তাকে। অনেক সময় সে কাঁদলে চুপ করাবার জন্য তাকে নিয়ে বিছানা ছেড়ে ঘরে পায়চারি। করতাম অশান্তভাবে। তারপর দেখতে দেখতে সকাল হয়ে যেত। মুখ-হাত ধুয়ে বাজার করতে যেতাম। রান্নাঘরের কাজে মন দিতাম। দিনের পর দিন কাটতে থাকে। এইভাবে। যতই পরিশ্রমী হোক না কেন কোনও মানুষ, মাঝে মাঝে ক্লান্তি তার। অবসাদ আসে তার শরীরে। সে তখন ভালো আহার আর বিশ্রাম চায়।
(তারা চলে গেল)।
মার্থা : এটা সত্যি কথা। গরিব ঘরের মেয়েগুলো বড় নির্লজ্জ। যে সব পুরুষ গোঁড়ামির সঙ্গে কৌমার্যব্রত পালন করে তাদের বিয়েতে মন বসাতে পারে না।
মেফিস্টোফেলিস : তোমার মতো যদি কোনও মেয়ে পাই তাহলে প্রেমের এই সব চটুল অভিনয় ছেড়ে আমার জীবনের পরিবর্তন করি। তাহলে সুদিন নিয়ে আসি আমার জীবনে।
মার্থা : আমাকে সব কথা খুলে বলুন মশাই। আপনি কি এর আগে মনের মতো কোনও মেয়ে পাননি জীবনে? কাউকে আপনার মন দেননি?
মেফিস্টোফেলিস : একটা প্রবাদ আছে, যে কোনও মানুষের জীবনে একটা গরম চুল্লী আর সতীলক্ষ্মী স্ত্রী সোনা বা মণিমুক্তোর মতোই দামী।
মার্থা : আমি বলতে চাই, আপনি কখনও এ বিষয়ে কোনও কামনা অনুভব করেননি?
মেফিস্টোফেলিস : আমি যেখানেই গিয়েছি সর্বত্র আদর-আপ্যায়ন অবশ্য পেয়েছি। পেয়েছি ভদ্র ব্যবহার।
মার্থা : আমি বলতে চাই, আপনি কি কোথাও কোনও প্রেমময় স্পর্শ পাননি?
ফাউস্ট : মেয়েদের ঠাট্টা করা মোটেই উচিত নয় কারো পক্ষে।
মার্থা : আমার কথাটা ঠিক বুঝতে পারছেন না।
মেফিস্টোফেলিস : আমি দুঃখিত যে আমি তা বুঝতে পারছি না। তবে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে আমার প্রতি তোমার দয়ার অন্ত নেই।
(তারা চলে গেল)
ফাউস্ট : আচ্ছা, আমি যখন তোমাদের বাগানের গেট দিয়ে ঢুকি তখন দেখে আমাকে চিনতে পেরেছিলে?
মার্গারেট : তুমি কি দেখতে পাওনি আমি তোমাকে দেখে আমার চোখ নামিয়ে নিই।
ফাউস্ট : তুমি যখন গির্জা থেকে চলে যাচ্ছিলে তখন যদি কিছু বেয়াদবি করে থাকি তবে সে দোষ আমার। আমার এই স্বাধীনতাটুকুকে ক্ষমার চোখে দেখো।
মার্গারেট : আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম। এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি আমার জীবনে। আমাকে অবশ্য কেউ কোনও দোষ দেয়নি। তবু আমার ভাবনা হচ্ছিল আমার আচরণের মধ্যে যদি উনি কিছু অশালীন অসংযমের পরিচয় পেয়ে থাকেন? তাঁর এমনও মনে হতে পারে যে এই মেয়েটি সহজলভ্য ও বহুবলভা। আমি স্বীকার করছি, তোমাকে পাবার জন্য আমার বুকের মাঝে তখন কি ধরনের আকুতি জেগে ওঠে আমি নিজেই বুঝে উঠতে পারছি না। তবে তোমার প্রতি তখন কঠোর হয়ে উঠতে পারিনি, রাগ করতে পারিনি বলে নিজেই উপর ভীষণ রাগ হয়েছিল আমার।
