মার্গারেট : বিদায়?
মার্থা : বিদায়ের আগে এক মুহূর্তের জন্য একটা কথা আছে। আমি আমার স্বামীর মৃত্যুর আইনসঙ্গত সাক্ষ্য-প্রমাণাদি পেতে চাই। কোথায় কখন কিভাবে তার মৃত্যু হয় তা জানা দরকার। আমি তার মৃত্যুর কথা কোনও সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশ করব।
মেফিস্টোফেলিস : হ্যাঁ, হে আমার প্রিয়তমা, উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণাদিই কোনও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। আমার এক উচ্চপদস্থ বন্ধু আছে। সেও এই ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে। আমি তাকে নিয়ে আসব।
মার্থা : হ্যাঁ, তাই করুন।
মেফিস্টোফেলিস : এই তরুণীই তখন উপস্থিত থাকবেন। আমি যাকে আনব, আমার সেই বন্ধু একজন সাহসী যুবক, প্রচুর দেশভ্রমণ করেছে। তাকে পেয়ে এঁর মতো মেয়েরা আনন্দ পাবেন।
মার্গারেট : তাঁর কাছে যেতে আমার লজ্জা পাবে।
মেফিস্টোফেলিস : কোনও রাজার সামনে লজ্জা পাওয়া উচিত নয়। ও কথা বলা ঠিক নয়।
মার্থা : আমার বাড়ির পিছনের দিকে বাগানে আজ সন্ধ্যায় তাহলে আমি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করব।
একাদশ দৃশ্য
রাজপথ
ফাউস্ট। মেফিস্টোফেলিস
ফাউস্ট : কি ব্যাপার? সব ঠিক হয়ে গেছে? প্রস্তুতিপর্ব শেষ?
মেফিস্টোফেলিস : থামো থামো। তুমি যে দেখছি কামনার আগুনে জ্বলছ? ঠিক আছে, শীঘ্রই তুমি মার্গারেটকে পাবে। তার প্রতিবেশিনী মার্থার বাড়িতে তুমি তাকে আজ সন্ধ্যায় দেখতে পাবে। অবৈধ প্রেমসম্পর্কের ব্যাপারে তার মতো মেয়ের কোনও তুলনা নেই জানবে।
ফাউস্ট : ভালো কথা।
মেফিস্টোফেলিস : তবে আমার দিক থেকে একটা কাজ করার আছে।
ফাউস্ট : কারো কাছ থেকে কিছু পেতে হলে কিছু দিতেই হবে।
মেফিস্টোফেলিস : তাকে আমাদের বুঝিয়ে বলতে হবে তার স্বামীর মৃতদেহ এখন পদুয়ার পবিত্র ভূমিতে যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে সমাধির মধ্যে শায়িত আছে।
ফাউস্ট : খুব ভালো কথা। তবে আমাদের এখন সর্বপ্রথম সেখানে অর্থাৎ পদুয়ায় যেতে হবে তো?
মেফিস্টোফেলিস : কষ্ট করে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। তুমি শুধু বলে দেবে তুমি এটা জান।
ফাউস্ট : তুমি যদি ভালো কথা না শোনো, তাহলে আমি তোমার পরিকল্পনা ছিন্নভিন্ন করে দেব।
মেফিস্টোফেলিস : ঠিক আছে, ধার্মিক সাধু মহাশয়। এই কি জীবনে প্রথম তুমি মিথ্যা সাক্ষ্যদান করছ? যে ঈশ্বর এই পৃথিবীর স্রষ্টা এবং সর্বত্র বিরাজ করছেন সেই ঈশ্বর ও মানুষ সম্বন্ধে তুমি কি এক নির্লজ্জ সাহসিকতার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলনি? ব্যাপারটা যদি তুমি গভীরভাবে তলিয়ে দেখ তাহলে দেখবে তুমি সোযাতেনের মৃত্যু আর সমাহিত হওয়ার খবরটা জান। আর সেই কথাটাই পরিষ্কার বলে দেবে।
ফাউস্ট : তুমি দেখছি বরাবর নাস্তিক আর মিথ্যাবাদী রয়ে গেছ।
মেফিস্টোফেলিস : হ্যাঁ, আমি তোমার মনের গভীর কথা সব জানি বলেই একথা । বলেছি। তুমি কি মার্গারেটের মতো সুন্দরী প্রেমিকাকে পাবার জন্য, করায়ত্ত করার জন্য তার তোষামোদ করবে না? অন্তরের সমস্ত নিবিড়তা দিয়ে তার জন্য শপথ করবে না?
ফাউস্ট : আমি আন্তরিকতার সঙ্গে তা করব।
মেফিস্টোফেলিস : চমৎকার। তোমার অনন্ত ভালোবাসা আর সুগভীর বিশ্বাসই কি তোমার অন্তরকে শক্তি জোগাবে?
ফাউস্ট : থামো, থামো। যদি আমার এই জ্বলন্ত কামনার অগ্নিশিখা আর আমার ইন্দ্রিয়চেতনার সমস্ত তীক্ষ্ণতা দিয়ে অনুসন্ধান করেও আমার মনের মতো মেয়ে না পাই তা হলে সারা বিশ্বসৃষ্টি পরিভ্রমণ করে বেড়াব আমি তার সন্ধানে। এর জন্য যে বিপুল উদ্যম আমি ব্যয় করব তা অনন্ত, মহৎ, চিরন্তন। তুমি কি এটাকে শয়তানি খেলা বলে অভিহিত করতে চাও।
মেফিস্টোফেলিস : তা যদি বলি তাহলেও আমি ঠিকই করব।
ফাউস্ট : শোনো। আমার একটা অনুরোধ, আমাকে রেহাই দাও। অনেক বকেছি। কারও যদি জিহ্বার জোর থাকে তাহলে সে তার অধিকার অবশ্যই আদায় করে নেবে। তবে এ বিষয়ে আর কথা বাড়ালে তাতে তিক্ততারই সৃষ্টি হবে। আমি এ কাজ করবই তাতে তুমি যাই বলো।
দ্বাদশ দৃশ্য
বাগান (ফাউস্টের বাহুলগ্ন অবস্থায় মার্গারেট। মার্থা ও মেফিস্টোফেলিস পায়চারি করছিল)
মার্গারেট : আমি বেশ বুঝতে পারছি আপনি আমার জন্য নিজেকে ছোট করে তুলছেন। আর তাতে আমি লজ্জাবোধ করছি। অবশ্য পথিকরা যে কোনও ধরনের। খাবার খেতে অভ্যস্ত। আমি জানি আমার এই সব কথাবার্তা আপনার মতো একজন অভিজ্ঞ লোককে তৃপ্তি দান করতে পারবে না।
ফাউস্ট : তোমার চোখের একটি দৃষ্টি, তোমার মুখের একটিমাত্র কথা জ্ঞানীদের সমস্ত জ্ঞানগর্ভ কথার থেকেও আমাকে বেশি তৃপ্তিদান করবে। (মার্গারেটের হাত চুম্বন করল)
মার্গারেট : না না, নিজেকে এমন ছোট করবেন না। আমার এই নোংরা দেখতে খারাপ হাতটা কেন চুম্বন করছেন আপনি? আমাকে যে কাজ করতে হয় তার জন্য হাতটা এমন শক্ত হয়ে উঠেছে। আমার মা আমার খুব কাছেই রয়েছে।
(তারা চলে গেল)
মার্থা : আপনি কি সব সময়ই দেশে দেশে ঘুরে বেড়ান?
মেফিস্টোফেলিস : হায়! আমার ব্যবসা আর কর্তব্যের খাতিরেই আমাকে এমনভাবে ব্যস্ত হয়ে ছুটে বেড়াতে হয় দেশে-বিদেশে। কোনও জায়গায় কিছুদিন থাকার পর সে জায়গা ছেড়ে যেতে বড় কষ্ট হয়। তবু বেশিদিন সেখানে থাকার সাহস পাই না।
মার্থা : যৌবনের উদ্দামতা যতদিন থাকে ততদিন এভাবে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানো চলে। মুক্ত পাখির মতো বাধাবন্ধনহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু তারপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসে দুর্দিন। তখন আত্মীয়-স্বজনহীন অবস্থায় অসহায়ভাবে কবরে যেতে হয়। তার জন্য চোখের জল ফেলার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। এই ধরনের মানুষের শেষ পরিণতি বড় দুঃখের।
