মার্থা : তোমার কি আর কিছু বলার আছে?
মেফিস্টোফেলিস : দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ের কিছু দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর তার কিছুই ছিল না। তাকে ঋণের অভিশাপ থেকে বাঁচাবার জন্য আমি নিজের তিনশো টাকা খরচ করেছি। ফলে আমার হাত এখন খালি।
মার্থা : কি! তার পকেটে একটা কানাকড়িও নেই? কোনও মণিমুক্তো কিছুই নেই? যে কোনও মানুষই হয় চাকরি করে অথবা ভিক্ষে করে কিছু সঞ্চয় করে। এমন নিঃস্ব হয়ে কেউ মরে না।
মেফিস্টোফেলিস : এটা সত্যি দুঃখের বিষয় ভদ্রমহোদয়া। তবে একটা কথা আমি বলতে পারি, সে কোনও বিষয়ে কখনও বাজে খরচ করেনি। তাছাড়া তার অনুশোচনাও কম ছিল না। তার দুর্ভাগ্যের জন্য প্রায়ই খেদ করতে সে।
মার্থা : হায়! মানুষ কতই না হতভাগ্য! আমি অবশ্যই তার আত্মার জন্য প্রার্থনা জানাব ঈশ্বরের কাছে।
মেফিস্টোফেলিস : আপনি শীঘ্রই আবার বিবাহের প্রস্তাব পাবেন। আপনার সে যোগ্যতা আছে। আপনি দয়ালু, মমতাময়ী।
মার্থা : না না। তাতে কোনও ফল হবে না।
মেফিস্টোফেলিস : দ্বিতীয়বার স্বামী না হলেও একজন সুদর্শন প্রেমিক হিসাবে কাউকে গ্রহণ করতে পারেন। প্রেম নিবেদন করার জন্য মনমতো লোক পাওয়াটা ঈশ্বরের একটা বড় দান।
মার্থা : এদেশের প্রথা তা নয়।
মেফিস্টোফেলিস : প্রথা থাক বা নাই থাক, এটাই সাধারণ ঘটে থাকে।
মার্থা : আপনি বলে যান।
মেফিস্টোফেলিস : আমি তার মৃত্যুশয্যায় পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। শয্যা নয়, যেন আধপচা খড় দিয়ে তৈরি সারের স্তূপ। তথাপি সে একজন খ্রিস্টান হিসাবেই মৃত্যুবরণ করে। যে যখন দেখে মৃত্যুর পর দুর্নাম রটবে চারদিকে তখন সে চিৎকার করে বলতে থাকে, আমি আমার নিজের আচরণকেই ঘৃণ্য বলে মনে করি। এইভাবে আমার স্ত্রী, পরিবার, আমার ব্যবসাকে ছেড়ে যাওয়া উচিত নয়। এই সব কিছুর স্মৃতি মৃত্যুযন্ত্রণার সমতুল। আশা করি আমি আমার স্ত্রীর প্রতি যদি কোনও অন্যায় করে থাকি ঈশ্বর তাহলে তা ক্ষমা করবেন।
মার্থা : (কাঁদতে কাঁদতে) আহা কী ভালো সে। সে ক্ষমা সে পেয়েই গেছে।
মেফিস্টোফেলিস : তথাপি তার স্ত্রীকেই সে দোষ দিয়ে গেছে। আমাকে নয়।
মার্থা : সে মিথ্যা বলেছে। মৃত্যুকালে সে মিথ্যা নিন্দার কথা বলে গেছে আমার নামে।
মেফিস্টোফেলিস : শেষ সময়ে তার চেতনা শিথিল হয়ে পড়ে, আমার যতদূর মনে হয়। সে বলে, আমার কোনো স্বাধীনতা ছিল না, খেলাধুলা বা আনন্দোৎসবের কোনও সময় ছিল না। প্রথম কথা সন্তানদের ভাবনা ভাবতে আর তাদের খাবার জোটাতেই সব সময় কেটে যেত আমার। তার জন্য রাতদিন খাটতে হতো হাড়ভাঙা খাটুনি। তবু শান্তিতে পেট ভরে দুবেলা দুমুঠো খেতে পেতাম না।
মার্থা : মরণকালে বিস্মৃতিবশত সে কি সব প্রেম ও ঈশ্বরবিশ্বাসের কথা ভুলে গিয়েছিল একেবারে? আমিও যে দিনরাত খাঁটি, সমান উদ্বেগ ভোগ করি সেকথা ভুলে গিয়েছিল সে।
মেফিস্টোফেলিস : ঠিক তা নয়। সে কথা তার মনে ছিল। সে বলেছিল যখন আমি মালটা থেকে চলে এসেছিলাম তখন আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাই নিবিড়ভাবে। দয়া করে ঈশ্বর বিশেষ এক সৌভাগ্য ও দান। করেন। একজন তুর্কী ব্যবসায়ীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। তার কাছে ছিল প্রচুর সম্পদ। সে তাই নিয়ে সোভান যাচ্ছিল। সাহসের সঙ্গে তাঁর সঙ্গী হিসাবে আমি তাকে। পথে সাহচর্য দান করি আর তার ফলে সেই সাহসিকতার মূল্যস্বরূপ আমার প্রাপ্য সে যথাযথভাবে দিয়ে দেয়।
মার্থা : বলো, বলো কেমন করে? কোথায়? তার কাছে কি টাকাটা ছিল?
মেফিস্টোফেলিস : কে তার খবর রাখে? কে জানে কোথায় কোন বাতাসে সে টাকা উড়ে গেছে? সে যখন নেপলস-এর একাকী নির্বান্ধব অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল তখন এক সুন্দরী কুমারী তাকে ভালোবেসে সঙ্গ দান করে। সে ভালোবাসার কথা শেষ পর্যন্ত মনে ছিল তার।
মার্থা : শয়তান! নিজেদের ছেলেদের না দিয়ে সে টাকা ভোগ করা মানে চুরি করা। এত দুঃখকষ্ট পাওয়া সত্ত্বেও তার চৈতন্য হয়নি? সে এই ধরনের নির্লজ্জভাবে উঙ্খল জীবনযাপন করে?
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু দেখ! যাই হোক, সে এখন মৃত। আমি যদি তোমার অবস্থায় পড়তাম, এই সব কিছু সত্ত্বেও তার জন্য পুরো এক বছর শোক প্রকাশ করতাম আমি। তার পরের বছর আমি নিজের দিকে তাকাতাম। নিজের কথা ভাবতাম।
মার্থা : হা ভগবান! আমার প্রথম স্বামীর মতো এমন ভালোবাসার লোক জগতে কোথাও পাব না আমি। লোকটা বোকা-বোকা হলেও তার স্বভাবটা ছিল বড় মিষ্টি। শুধু সে মাঝে মাঝে আমাকে ছেড়ে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াত। বিদেশী মদ, মেয়েমানুষ আর পাশাখেলার ঝোঁক ছিল তার।
মেফিস্টোফেলিস : ঠিক আছে। তাও যদি বা সে সুচতুরভাবে তোমার পদস্খলনের ব্যাপারগুলোকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে এড়িয়ে যেত। আমি প্রতিজ্ঞা করছি তোমার এই অবস্থা জেনেও আমি তোমার সঙ্গে আংটি বিনিময় করতে রাজি আছি।
মার্থা : ভদ্রমহোদয় ঠাট্টা করতে ভালোবাসেন।
মেফিস্টোফেলিস : (স্বগত) সময় বুঝে এখান থেকে কেটে পড়ব আমি। তার কথায় বিশ্বাস করে সে শয়তানকেই গ্রহণ করবে আমার মনে হয়। (মার্গারেটকে) কথাটা শুনে তোমার কেমন লাগছে?
মার্গারেট : আপনি আসলে কি বলতে চাইছেন?
মেফিস্টোফেলিস : (স্বগত) তুমি যেমনি সুন্দরী তেমনি নির্দোষ। (উচ্চৈঃস্বরে) ভদ্রমহোদয়গণ, বিদায়।
