ফাউস্ট : এ কাজ সবাই করে। এক্ষেত্রে রাজা ও সুদখোর ইহুদী একই পথের পথিক।
মেফিস্টোফেলিস : তারপর এক পুরোহিত এই সব রত্ন ও মণিমুক্তো একটা থলেতে ভরে নিয়ে চলে গেল। ঠিক যেন এক বস্তা বাদাম অথবা ব্যাঙের বিষ্ঠা। কোনও ধন্যবাদ নয়, শুধু বলে গেল স্বর্গে এর প্রতিদান পাওয়া যাবে। যাবার সময় মার্গারেট ও তার মাকে প্রচুর নীতিশিক্ষা দিয়ে গেল।
ফাউস্ট : আর মার্গারেট?
মেফিস্টোফেলিস : অশান্ত ও চঞ্চলভাবে বসে বসে শুধু ভাবছে। সে এখন ভেবে ঠিক করতে পারছে না এখন তার কি করা উচিত। অলঙ্কারগুলোর কথা দিনরাত ভাবছে। বিশেষ করে ভাবছে তার কথা যে তাকে এই আনন্দের বস্তুটি দান করে।
ফাউস্ট : আমার প্রিয়তমার দুঃখে আমি বড় ব্যথা পাচ্ছি। ওকে আমার এক সাজ গয়না এনে দাও। আগেরগুলো খুব একটা এনো না।
মেফিস্টোফেলিস : তা বটে। এটা যেন একটা ছেলেখেলা।
ফাউস্ট : আমার ইচ্ছানুসারে সব কিছুর ব্যবস্থা করো। তার কোনও প্রতিবেশীর মাধ্যমে কৌশলে কাজ করবে। শয়তানের মতো অযথা শক্ত হয়ে থেকো না; তার পছন্দমতো নূতন এক কাজ গয়না এনে দাও।
মেফিস্টোফেলিস : ঠিক আছে মহাশয়, তোমার কথামতোই কাজ হবে। (ফাউস্টের প্রস্থান) এই ধরনের মোহগ্রস্ত নির্বোধ প্রেমিকরা তাদের প্রেমিকাদের চিত্তবিনোদনের জন্য সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহ-নক্ষত্রগুলোকে বাতাসে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে থাকে।
দশম দৃশ্য
প্রতিবেশীর গৃহ
মার্থা : (একাকী) ঈশ্বর আমার স্বামীকে ক্ষমা করুন, যদিও সে আমার প্রতি তার কর্তব্য পালন করেনি। আমাকে এই তৃণগুচ্ছের উপর শুতে বাধ্য করে, এই দুঃখের। মধ্যে রেখে সে খুশিমতো পৃথিবী পরিভ্রমণ করতে বেরিয়েছে। তথাপি আমি তাকে কোনওরূপ মনোকষ্ট দিতে চাই না। ঈশ্বর জানেন আমি তাকে কত ভালোবাসি এবং তাকে আমি ভুলতে পারি না। (সে কাঁদতে লাগল) হয়ত আমার স্বামী মারা গেছে। হায় হায়। মৃত্যুর কোনও সার্টিফিকেটও নেই।
মার্গরেট : (এল) শোনো মার্থা।
মার্থা : মার্গারেট, কি হয়েছে তোমার?
মার্গারেট : আমি দাঁড়াতে পারছি না। আমার হাঁটু দুটো কাঁপছে। আমি আমার কক্ষে একটা কৌটো দেখতে পাই। তাতে নানারকমের উজ্জ্বল অলঙ্কার ছিল। এই উজ্জ্বল গয়না আগে কেউ কখনও দেখেনি।
মার্থা : তোমার মাকে তা বলো না। তাহলে তিনি পুরোহিতকে সব দিয়ে দেবেন।
মার্গারেট : দেখো দেখো, তাকিয়ে দেখো।
মার্থা : (তাকে সাজিয়ে) ওঃ, তোমার কি বিরল সৌভাগ্য।
মার্গারেট : কিন্তু হায়, আমি পথে এই সব অলঙ্কার পরে বেড়াতে পারি না, আবার গির্জাতেও যেতে পারি না।
মার্থা : তবে এই সব অলঙ্কার গোপন করে এ পথে বেড়াতে পার না যখন-তখন। এখন আমার ঘরের ঐ আয়ানাটার সামনে পায়চারি করে বেড়াও। তাতে আমাদের দুজন্যেই আনন্দ হবে। আপাতত এই থাক। তারপর যখন কোনও ছুটি বা উৎসবের দিন আসবে তখন একে একে গয়নাগুলো বার করবে। যেমন ধরো প্রথমে হার, তারপর অন্যান্য গয়না। তোমার মা দেখতে পাবে না। তারপর কি করা যাবে বা বলা যাবে না আমরা ভেবে ঠিক করব।
মার্গারেট : যেই আমাকে এই সব মূল্যবান অলঙ্কার এনে দিক না কেন, নিশ্চয়ই কোথাও একটা গলদ আছে, এর মধ্যে কিছু একটা অন্যায় আছে–আমার সন্দেহ হচ্ছে। (দরজায় করাঘাত) হা ভগবান! নিশ্চয়ই আমার মা এসে গেছে।
মার্থা : (ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে) কোনও এক অপরিচিত ভদ্রলোক দেখছি– ভিতরে আসুন।
(মেফিস্টোফেলিসের প্রবেশ)
মেফিস্টোফেলিস : আমাকে এভাবে উপযাজক হয়ে আপনাদের ঘরে ঢুকতে হলো এজন্য আমি ক্ষমা চাইছি হে মহোদয়া।
(মার্গারেটকে দেখে সমসহকারে কিছুটা পিছনে হটে)
আমি মার্থা শোয়াইলিনকে চাই।
মার্থা : আমিই মার্থা। ভদ্রলোকের কি প্রয়োজন আছে?
মেফিস্টোফেলিস : (মার্থাকে জনান্তিকে) তোমাকে পেয়ে ভালোই হয়েছে। তবে তোমার ঘরে এখন একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা অতিথি হিসাবে রয়েছেন। আমি না হয় বিকালে আবার আসব।
মার্থা : (উচ্চৈঃস্বরে) নিশ্চয় নিশ্চয়! শোনো মার্গারেট, উনি তোমাকে একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা ভাবছেন।
মার্গারেট : আমি একজন দরিদ্র তরুণী। ভদ্রমহোদয় দয়াপরবশ হয়ে আমার প্রতি উচ্চ ধারণা পোষণ করেছেন। এ সব অলঙ্কার আমার নয়।
মেফিস্টোফেলিস : শুধু অলঙ্কার নয়। আপনার চোখের দৃষ্টি ও হাবভাবও সম্ভ্রান্ত মহিলাদের মতো। যাই হোক, আমি এখানে অবস্থানের অনুমতি লাভ করে খুশি।
মার্থা : আপনার কি দরকার? আমি তা মেটাবার চেষ্টা–
মেফিস্টোফেলিস : আমার গলার স্বরটা যদি দুঃখে এমন ভারী হয়ে উঠত। কথাটা বলার জন্য যেন কিছু মনে করো না। অন্যভাবে নিও না। তোমার স্বামী মারা গেছে।
মার্থা : মারা গেছে! হায় তার অন্তঃকরণ কি সরলই না ছিল। আমার স্বামী মারা গেছে, আমাকেও মরতে দাও।
মার্গারেট : শোনো মেয়ে। বিপদে ধৈর্য ও সাহস হারিও না।
মেফিস্টোফেলিস : আমাকে এই দুঃখপূর্ণ কাহিনীটা পুরো বলতে দাও।
মার্গারেট : সুতরাং আমি আর কখনও কাউকে ভালোবাসব না। প্রিয়জনের মৃত্যুজনিত এই ধরনের ক্ষতি আমাকে মর্মাহত করবে।
মেফিস্টোফেলিস : যেমন বেদনার পর আনন্দ আসে তেমনি আনন্দের পরও বেদনা উড়ে এসে জুড়ে বসবেই।
মার্থা : তার জীবনাবসান কিভাবে হলো তা বলো আমায়।
মেফিস্টোফেলিস : পদুয়ায় তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে সেন্ট অ্যান্টনির পাশে।
