ফাউস্ট : আমি বুঝতে পারছি না এ কাজ করা আমার উচিত হবে কি না।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি আবার জিজ্ঞেস করছ, কুণ্ঠা করছ? তুমি কি নিজেই গোলমালটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাও? আমি তোমাকে বলছিলাম আজকের এই সুন্দর দিনটার মতো তোমার কামনাকে সংযত করে রাখো। আমাকে আর কষ্ট দিও না। তাতে তোমার বিষাদ বা দুঃখের কোনও কারণ দেখি না। যাই হোক, আমি আবার হাতটা ঘষে দেখি ভালো কিছু করতে পারি কি না।
(কৌটোটা হাতে চেপে ধরে তাতে তালা দিল)।
এখন তাড়াতাড়ি চলে যাও। যাও, সেই সুন্দরী কুমারীকে ছলনার দ্বারা মুগ্ধ করে তোমার ইচ্ছার বশীভূত করে তোল তাকে। আর কাছে তুমি এমন একটা ভাব দেখাবে যাতে মনে হবে তুমি এই মুহূর্তে পদার্থবিদ্যা ও অধিবিদ্যার মতো কঠিন দুটি বিষয় সম্বন্ধে বস্তৃতা শোনার জন্য কোনও বক্তৃতাসভায় রাখার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছ। যাও, চলে যাও। (উভয়ের প্রস্থান)
মার্গারেট : (প্রদীপ হাতে) জায়গাটা বড় সংকীর্ণ। এখানে বড় গুমোট গরম। (জানালাটা খুলে দিল) কিন্তু বাইরে এতটা গরম নেই। আমার ভয় হচ্ছে। অথচ বুঝতে পারছি না কেন এই ভয়। আমার মা কি এসে পড়বে? মা কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে? আমার গায়ের রক্ত ঠাণ্ডা হিম হয়ে গেছে। আমার কাঁপুনি আসছে। আমার মনটা দুর্বল। আমি বড় ভীরু প্রকৃতির।
(পোশাক খুলতে খুলতে গান গাইতে লাগল)
থিউল দেশে এক যে ছিল রাজা।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যে তার রানির
প্রতি ছিল একান্তভাবে বিশ্বস্ত, যে রানি মৃত্যুকালে
তাকে দিয়ে গিয়েছিল এক সোনার পানপাত্র।
রাজার কাছে এ পাত্র ছিল সবচেয়ে মূল্যবান।
যখনি তিনি এ পাত্রে মদ পান করতেন
এক চুমুকে শেষ করতেন সে মদ আর
সঙ্গে সঙ্গে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ত
নিঃশেষিত সেই পাত্রের বুকে।
অবশেষে এসে গেল রাজার মৃত্যুর দিন।
উপস্থিত সভাসদদের প্রয়োজনীয় সব কথা
বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর বিষয় সম্পত্তির
সব অধিকার বুঝিয়ে দিলেন তার উত্তরাধিকারীকে;
কিন্তু তার সেই প্রিয় পানপাত্রটি কাউকে দিলেন না।
কাউকে বললেন না তাঁর অশ্রুসজল গোপন রহস্যের কাহিনী।
তখন রাত্রিকাল
রাজার সামনে বসেছিল ভোজসভা।
প্রাসাদের বাইরে গর্জন করছিল তখন
তরঙ্গায়িত রাত্রির সমুদ্র।
প্রিয়তমার সোনালী স্মৃতিবিজড়িত এই পানপাত্রে
শেষবারের মতো মদ পান করলেন রাজা।
তারপর খোলা জানালা দিয়ে পাত্রটা ছুঁড়ে
ফেলে দিলেন সমুদ্রের জলে।
তবু সজল আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেইদিকে তাকিয়ে রইলেন রাজা।
দেখলেন চকিত আলোর মুকুটপরা অন্ধকার তরঙ্গগুলোর সঙ্গে
লড়াই করতে করতে সেই স্বর্ণোজ্জ্বল পানপাত্রটা
একবার ডুবছে অসহায়ভাবে, আবার পরমুহূর্তে ভেসে উঠছে।
অবশেষে চিরকালের মতো ডুবে গেল সেটা।
এদিকে দেখতে দেখতে চিরদিনের মতো মুদ্রিত হয়ে এল
রাজার ক্লান্ত অবসন্ন চক্ষুপল্লব।
(মার্গারেট তার পোশাক গুছিয়ে রাখতে গিয়ে মণিমানিক্যপূর্ণ কৌটোটা দেখতে পেল)
এই সুন্দর কৌটোটা কোথা হতে কি করে এল? আমি তো এটা অবশ্যই সিন্দুকের মধ্যে চাবি দিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। এটা সত্যিই আশ্চর্যজনকভাবে সুন্দর। কি থাকতে পারে এর ভিতর? হয়ত মার কাছে কেউ এটা বন্ধক দিয়ে গেছে এবং মা তাকে কিছু টাকা ধার দিয়েছে। এর সঙ্গে একটা চাবিও রয়েছে। এটা খুলে দেখতে মন চাচ্ছে। একি? হা ভগবান! এ সব জিনিস কোথা থেকে এল? এত সব সুন্দর বস্তু কখনও চোখে দেখিনি আমি। এত সব মূল্যবান গয়না নিশ্চয় কোনও ধনীকন্যার যে উৎসবের দিন এই সব পরে বেড়ায়। এই মুক্তোর চেনটা আমার চুলে থাকবে। এত ঐশ্বর্য কার?
(সব গয়না পরে নিজেকে সাজিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল)
এই কর্ণকুণ্ডলটা যদি আমার নিজস্ব হতো! এ কুণ্ডল পরিধান করার সঙ্গে সঙ্গে চেহারার ভাবটা কেমন বদলে যায় মুহূর্তে; কেমন উদ্দীপিত করে তোলে যে কোনও নারীর যৌবনসৌন্দর্যকে! যারা এই মূল্যবান অলঙ্কারের অধিকারিণী তাদের কতই না সৌভাগ্য। আর যাদের এ বস্তু নেই তারা কিছু মুগ্ধ বিস্ময় আর কিছু ঈর্ষাসহযোগে খণ্ডিত অন্তরে প্রশংসা করে এ বস্তুর সত্ত্বাধিকারিণীদের। তবে স্বর্ণালঙ্কার কে না চায়? সোনার উপরের জীবনের সৌন্দর্য সম্মান অনেকখানি নির্ভর করে। আমরা যারা এই সোনা হতে বঞ্চিত তারা সত্যই হতভাগ্য।
নবম দৃশ্য
পদচারণা
(ফাউস্ট চিন্তান্বিত অবস্থায় পদচারণা করছিল। এমন সময় মেফিস্টোফেলিস তার কাছে এল)
মেফিস্টোফেলিস : জীবনে কোথাও কোনও প্রেম পেলাম না; পেলাম শুধু ঘৃণা আর প্রত্যাখ্যান। প্রজ্বলিত নরকাগ্নির অপরিহার্য লেলিহান শিখার দ্বারা সতত উত্তপ্ত আমার দেহমন। আমি যদি হীনতর ছলনা ও চাতুর্যসহকারে মিথ্যা শপথবাক্যের দ্বারা মুগ্ধ করতে পারতাম মানুষকে।
ফাউস্ট : তোমার কি হলো? কিসের বিষাদ তোমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল যাদুকর? তোমার এমন বিষণ্ণ মুখ কখনও দেখিনি।
মেফিস্টোফেলিস : আমি যদি শয়তান না হই তাহলে শয়তানের কাছে আত্মসমর্পণ করব নিঃশেষে।
ফাউস্ট : দুঃখে তোমার এখন মাথার ঠিক নেই। তুমি এখন উন্মাদের মতো আচরণ করবে আর আবোল-তাবোল বকবে।
মেফিস্টোফেলিস : এখন ভেবে দেখো, মার্গারেটের জন্য যে মুদ্রা রাখা হয়েছিল তা এখন পুরোহিতের পকেটে যাবে। মা তাদের দেখে ফেলে আর সঙ্গে সঙ্গে এক গোপন ভীতিবিহ্বলতা আচ্ছন্ন করে ফেলে তাকে। দূষিত আবহাওয়ার এক স্পষ্ট গন্ধ পেয়েছে। সে। তার মা এমনই মেয়ে যে তার প্রার্থনার বই খুলে তার গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারে কোন শব্দটা ধর্মসমম্মত আর কোন শব্দটা ধর্মসম্মত নয়। তাই মার্গারেটের গায়ে মণিমুক্তোর অলঙ্কার দেখে তার মা বুঝতে পারে এ সব অলঙ্কার সৎ পথে বিধাতার আশীর্বাদস্বরূপ আসেনি। মা বলে, বৎসে, অসৎ পথে অর্জিত বস্তু মানুষের আত্মাকে ফাঁদে ফেলে কুপথে নিয়ে যায়, তার রক্ত শোষণ করে নেয়। সুতরাং এই সব বস্তু আমরা ঈশ্বরমাতা মেরীর সামনে উপস্থাপিত করব, তিনি স্বর্গীয় কোনও উপায়ে এর ঋণ পরিশোধ করবেন। মার্গারেট কিন্তু বিরক্তির সঙ্গে বলল, উপহারের দান-প্রতিদান আজও চলছে। যে ব্যক্তি আমাকে এই সব বস্তু উপহার হিসাবে দান করেছে সে একেবারে নাস্তিক নয়। মার অলক্ষ্যে অগোচরে এক ব্যক্তি আমার ঘরে আসে। এই গয়নার কৌটোটা যেখানে লুকোন ছিল সেখানে তাকিয়ে দেখে এগুলো উদ্ধার করে। তারপর সে বলে, কোনও বস্তু হাতের কাছে পেলে তা আয়ত্ত করতে হয়: এটাই হলো মানবজগতের রীতি। যে সব পবিত্র গির্জা দেখছ, তাদের বিশাল ও বলিষ্ঠ উদর অনেকে জমি গ্রাস করছে। এই সব পবিত্র গির্জাগুলোর অসদুপায়ে অর্জিত সব বস্তুগুলো হজম করার অস্বাভাবিক ক্ষমতা আছে।
