ফাউস্ট : দেবদুতোপমা ঐ সুন্দরীর কোনও না কোনও একটা স্মৃতিচিহ্ন আমাকে দাও। সেখানে সে নিদ্রা যায় তার সেই সুরম্য শয়নকক্ষে আমাকে নিয়ে যাও। তার বক্ষের রুমাল একটা এনে দাও অথবা তার পায়ের মোজার একটা গার্টার অন্তত দাও।
মেফিস্টোফেলিস : এবার দেখবে কত শীঘ্র তোমার অতৃপ্ত কামনাকে পরিতৃপ্ত করতে পারি। আর এক মুহূর্তও বৃথা ব্যয় করব না। আর শয়নকক্ষ খুঁজে বার করে সেখানে আজ তোমাকে নিয়ে যাবই।
ফাউস্ট : আমি কি তাকে দেখতে পাব–তাকে লাভ করব?
মেফিস্টোফেলিস : না। কোনও এক প্রতিবেশীর কাছে সে নিশ্চয় যাবে। ইতিমধ্যে তুমি ভবিষ্যৎ আনন্দোপভোগের আশায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আমরা সেখানে গিয়ে তাকে ধরব। তার সাহচর্য সেখানে তুমি পূর্ণমাত্রায় পাবে।
ফাউস্ট : সেখানে কি আমরা এখন যেতে পারি?
মেফিস্টোফেলিস : এখনও সে সময় হয়নি।
ফাউস্ট : আমি চাই তার কাছ থেকে তার কোনও উপহার আমাকে এনে দাও। (প্রস্থান)।
মেফিস্টোফেলিস : এখনি সেটা চাও? ঠিক আছে। অবশ্যই সে মেয়েটিকে পাবে। আমোদ-প্রমোদের বহু স্থানই আমার জানা আছে। বহু গুপ্তধনের সন্ধানও আমার জানা। আছে। দরকার হলে এ বিষয়ে আমাকে জোর করতে হবে। বলপূর্বক ব্যাপারটার নিষ্পত্তি করতে হবে। (প্রস্থান)
অষ্টম দৃশ্য
ক্ষুদ্র পরিচ্ছন্ন একটি প্রকোষ্ঠ
সন্ধ্যাকাল
মার্গারেট : (চুল বাঁধছিল) আমি যদি জানতে পারতাম ভদ্রলোক কে তাহলে আমি তাকে কিছু না কিছু দিতে পারতাম। নিশ্চয় ভদ্রলোক সম্ভ্রান্ত বংশজাত কোনও বীরপুরুষ হবেন। তাঁর মুখ দেখেই আমি তা বুঝতে পেরেছি। তা না হলে তাঁর মুখে এমন বীরত্ব ও সাহসিকতার চিহ্ন ফুটে উঠত না। (প্রস্থান)
মেফিস্টোফেলিস। ফাউস্ট।
ফাউস্ট : এসো, কিন্তু খুব ধীর গতিতে। আমাকে অনুসরণ করো।
ফাউস্ট : (কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর) আমাকে একা থাকতে দাও, আমি অনুরোধ করছি।
মেফিস্টোফেলিস : সকল মেয়েই এমন পরিচ্ছন্ন থাকে না।
ফাউস্ট : (চারদিকে তাকিয়ে) হে সুন্দর ও মেদুর গোধূলি, এই পবিত্র স্থানটিকে উজ্জ্বল করে আছ। হে মধুর প্রেমের বেদনা, ক্রমবিলীয়মান আশার শিশির বুকে নিয়ে যে অন্তর এক ব্যর্থ প্রতীক্ষায় সঁপে দিয়েছে নিজেকে সে অন্তরকে অনতিশক্ত এক বন্ধনের দ্বারা আবদ্ধ করো। চারদিকে কেমন এক শান্তি-শৃঙ্খলা আর তৃপ্তির স্রোত বয়ে চলেছে। এক পরমানন্দের প্লাবন বয়ে চলেছে আমার ক্ষুদ্র অন্তরে, অথচ কিসের এক অনিৰ্দেশ্য আকুতি প্রবল হয়ে উঠছে ক্রমশ।
(বিছানার কাছে চামড়ার এক আর্মচেয়ারে বসে)।
হে আমার প্রেয়সী, তোমার মুক্ত ও প্রসারিত বাহুর দ্বারা আমাকে আলিঙ্গন করো। তোমার বাহুলগ্ন হয়ে আমার মনে হচ্ছে আমার হারানো আনন্দবেদনাখচিত অতীতের উজ্জ্বল দিনগুলো আবার ফিরে এসেছে আমার কাছে। আমার মনে হচ্ছে এই আসনে যেখানে আজ আমি বসে রয়েছি সেখানে আমার পিতা একদিন বসে থাকতেন এবং আজও বসে আছেন। আর তুমিও আমার কলগুঞ্জনরত দুরন্ত সন্তানদল পরিবৃত্ত হয়ে খ্রিস্টোৎসবের উপহার হাতে বসে রয়েছ। চঞ্চল ছেলেরা ভয়ে ভয়ে তাদের পিতামহের শীর্ণ শুষ্ক হাতটি চুম্বন করছে। হে আমার প্রিয়তমা, আমি যেন অনুভব করছি তোমার উপস্থিতি। তুমি যেন চুপিসারে কথা বলছ আমার সঙ্গে। তোমার দেহের বহির্বাসবিমুক্ত কোনও কোনও অংশে ফুটে উঠেছে যৌবনসমৃদ্ধ মাতৃত্বের বিরল মহিমা। শুচিশুভ্র হয়ে উঠেছে তোমার পায়ের তলার মাটি। তোমার এই সুন্দর হাতই মর্ত্যভূমিবিধৃত এই গৃহকোণকে পরিণত করে তুলতে পারে স্বর্গলোকে।
(বিছানা থেকে মশারি তুলে দিয়ে)
আমার রক্তে এমন মধুর রোমাঞ্চ জাগছে কেন? এখানে আমি সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারি। এখানে প্রকৃতি তার নিজের হাতে ফুলের কুঁড়ির মতো এক শুচিশুভ্র দেবদূতকে গড়ে তুলেছে খেলাচ্ছলে। এইখানেই শায়িতা ছিল একদিন আমার সন্তান। তার সুন্দর কচি বুকে ছিল প্রাণের উত্তাপ। তার দেবোপম দেহে ছিল স্বর্গীয় সুষমা আর পবিত্রতা। আর আমি? যথাযোগ্য ক্ষমতা সংগ্রহ করে কি কারণে আমি এখানে এসেছি? এই মুহূর্তে এত বিচলিত হয়ে উঠেছি কেন? কি চাই আমি? আমার অন্তরে কেন এত সংক্ষোভ? কেন এত আঘাত, কিসের ক্ষত? হে হতভাগ্য ফাউস্ট! আমি আর তোমাকে চিনতে পারছি না।
এখানে কি ঐন্দ্রজালিক কোনও বায়বীয় শক্তি কাজ করছে? আমি এখানে এসেছিলাম ক্ষণকালীন আনন্দের সন্ধানে। সে আনন্দ প্রেমের স্বপ্নের এক মধুর অবকাশে নিঃশেষে কোথায় তলিয়ে গেছে। প্রতিটি পরিবর্তনশীল ক্ষণভঙ্গুর কালখণ্ডের হাতে আমরা কি তবে খেলার পুতুল?
আর যদি সে ঠিক এই মুহূর্তে এখানে এসে পড়ে তাহলে কেমন করে আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব? আমার অন্তরস্থিত উদ্ধত অহকারী দৈত্যটা কিভাবে তখন শান্ত হয়ে পড়বে তার পায়ে?
মেফিস্টোফেলিস : তাড়াতাড়ি করো। আমি দেখতে পাচ্ছি সে ফিরে আসছে।
ফাউস্ট : যাও, যাও, আমি আর কখনও ফিরে যাব না।
মেফিস্টোফেলিস : এখানে একটি কৌটো রয়েছে। আমি কিছুক্ষণ আগে এটা পেয়েছি। এটা তাড়াতাড়ি চাপা দিয়ে লুকিয়ে রাখ। কারণ এটা সে দেখতে পেলেই তার মাথাটা ঘুরে যাবে। এর মধ্যে আমি কিছু খেলনা রেখেছি যাতে তুমি আর একটা কৌটো লাভ করতে পার। খেলা খেলা এবং শিশু শিশু। তুমি একটা শিশু ছাড়া আর কিছু নও।
