(ডাইনি অনেক আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মের পর পাত্রে মদ ঢেলে দিল। ফাউস্ট পাত্রটি ঠোঁটে স্পর্শ করতেই আগুন জ্বলে উঠল)
খেয়ে নাও, খেয়ে নাও। পানপাত্রটি শেষ করে ফেল এখনি। এটা পান করার সঙ্গে সঙ্গে নূতন নূতন কামনা ও কামনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠবে তোমার অন্তর। মনে রেখো, শয়তানের সঙ্গে কলাবিদ্যার গলায় গলায় ভাব। তুমি আগুনকে ভয় পাচ্ছ?
(ডাইনি গণ্ডিটা মুছে দিতেই ফাউস্ট ভিতরে ঢুকল)
মেফিস্টোফেলিস : এবার তুমি যাও। তুমি বিশ্রাম লাভ করনি অনেকক্ষণ।
ডাইনি : এই মদ তোমার অনেক ভালো করবে।
মেফিস্টোফেলিস : ওয়ালপারগিসের রাত্রিতে তোমার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা হবে সর্বসমক্ষে। পারিতোষিক হিসাবে তোমাকে যা কিছু আমার দেবার আমি সেই সময় দেব।
ডাইনি : একটা গান আছে। যদি তুমি মাঝে মাঝে সেটা গাও তাহলে এক আশ্চর্য ফল পাবে।
মেফিস্টোফেলিস (ফাউস্টকে) : এস এস, এখনি চলে এস। হঠাৎ হাতের কাজ এসে গেলে শত পরিশ্রম সত্ত্বেও ঘর্মাক্ত কলেবরে তা করা উচিত। এক মদের প্রভাবে এখনি তোমার দেহের মধ্যে ক্রিয়া করতে শুরু করেছে। এক মধুর আলস্যের মাধ্যমে কিভাবে আনন্দ লাভ করতে হয় সে বিষয়ে শিক্ষা দেব তোমায়। এক নিবিড় পুলকের রোমাঞ্চ জাগবে তোমার দেহ-মনে আর সেই সঙ্গে তুমি বুঝতে পারবে লঘুচঞ্চল এক পক্ষবিস্তার করে কিভাবে কামদেবী উড়ে বেড়াচ্ছে তোমার অন্তরের আকাশে।
ফাউস্ট : কী সুন্দর ঐ নারীর রূপ। যে আয়নায় তার প্রতিফলন পড়েছে সেটা আমার একবার দেখতে দাও।
মেফিস্টোফেলিস : না, না, আমায় বিশ্বাস করো, সৌন্দর্যের এক সাক্ষাৎ খনি। আয়না কেন, তুমি শীঘ্রই তাকে জীবন্ত দেখতে পাবে। তার দেহের উত্তাপ স্পর্শ করতে পাবে। (স্বগত) এই মদ পানের ফলে তোমার দেহের রক্ত এমনই উত্তপ্ত ও উত্তাল হয়ে উঠবে যে, যে কোনও নারীকেই তোমার হেলেনের মত সুন্দরী মনে হবে।
সপ্তম দৃশ্য
রাজপথ
ফাইস্ট ও মার্গারেট পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছিল।
ফাউস্ট : হে সুন্দরী, কিছু মনে করো না, রুষ্ট হয়ো না। আমি তোমার হাত ধরে তোমার বাড়িতে পৌঁছে দেব। তোমাকে সঙ্গ দান করব তোমার পথে।
মার্গারেট : আমি নারীও নই, সুন্দরীও নই এবং তোমার সাহায্য ছাড়াই আমি বাড়ি যেতে পারব।
(ফাউস্টের হাত ছাড়িয়ে চলে গেল)
ফাউস্ট : সত্যিই অপূর্ব। জীবনে আমি যত নারী দেখেছি তার মধ্যে সৌন্দর্যে অতুলনীয়া সে। তার অন্তঃকরণে কত পবিত্র এবং বিবিধ গুণরাজিতে পরিপূর্ণ। তবে কিছুটা অহঙ্কারী। তার ওষ্ঠাধর কী চমৎকার লাল। তার গণ্ডদ্বয় প্রথম প্রত্যূষের মতোই উজ্জ্বল। যতদিন আমার দেহে প্রাণ থাকবে আমি তাকে ভুলব না। চকিতে হরিণের মতো যে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল আমার অন্তরে তা মুদ্রিত হয়ে থাকবে চিরদিন। সে। স্বল্পভাষিণী, অথচ তার কণ্ঠস্বর কত তীক্ষ্ণ। তার সঙ্গলাভ সত্যিই এক গভীর আনন্দের। ব্যাপার। একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
(মেফিস্টোফেলিস প্রবেশ করল)
ফাউস্ট : আমি যে মেয়েটিকে এখনি লাভ করতে গিয়েছিলাম তার কথা জান?
মেফিস্টোফেলিস : কোন মেয়েটি।
ফাউস্ট : এই তো এখনি চলে গেল।
মেফিস্টোফেলিস : ওই ওখানে যে যাচ্ছে? ওর তো স্বীকারোক্তি করে এইমাত্র আসছে। যত রকমের পাপ আছে তা তো করেছে এবং তা স্বীকার করেছে। আমি নিকটে পিছনে থেকে সব শুনেছি। এত পাপ সত্ত্বেও ও খুব নিরীহ ও এবং নির্দোষ। স্বীকারোক্তির কোনও প্রয়োজনই ছিল না। এমন কাঁচা বয়সের ছেলেমেয়েদের উপর কোনও অশুভ প্রভাব বিস্তার করতে পারি না আমি।
ফাউস্ট : তবে ওর বয়স তো চোদ্দর থেকে বেশি।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি বাজে লোকের মতো কথা বলছ। এমনভাবে কথা বলছ যাতে মনে হবে জগতে যেখানে যত সুন্দর ফুল ফোটে তা শুধু তোমার জন্য। জগতে। সব শ্রদ্ধা ও সম্মানের একমাত্র পাত্র তুমি। কিন্তু এতেও তুমি সব সময় সব বিষয়ে। সাফল্য লাভ করতে পার না। তোমার আকাক্ষিত বস্তুকে আয়ত্ত করতে পার না।
ফাউস্ট : হে সুযোগ্য প্রচারক, শোনো। আর নৈতিক আইনের কোনও কথা বলো না। আমি আমার অধিকারের কথাই বলছি। আজ রাত্রির মধ্যে যদি আমার সেই আনন্দের প্রতিমাকে হাতে না পাই তাহলে রাত্রি মধ্যপথে উপনীত হতে না হতেই আমাদের সব চুক্তি ভঙ্গ হবে।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু সুবিধা-সুযোগের কথাটাও তো একবার ভাবতে হবে। আমি অন্তত এক পক্ষকাল সময় চাইছি যাতে তার মধ্যেই কোনও সুযোগ পেয়ে যাব।
ফাউস্ট : যদি আমি সাতটা ঘণ্টা হাতে পাই তাহলে শয়তানকে ডাকব না আমার সাহায্যে। আমি নিজেই তাকে বুঝিয়ে করায়ত্ত করব।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি ঠিক ফরাসিদের মতো বড় বড় কথা বলছ। আমার কথা শোনো, বিরক্ত হয়ো না। কেন হঠাৎ এমন করে আমোদ-প্রমোদে ছেদ টেনে দিচ্ছ? তুমি ভাবছ তোমার সমগ্র জীবন এমনই অন্তহীন অবিচ্ছিন্ন সুখ আর সৌভাগ্যে ভরা যাতে করে তুমি ইচ্ছা করলেই সমস্ত সুন্দর বস্তুকে করায়ত্ব করতে পার আর ইতালীয় প্রেমকাহিনীর নায়কের মতো তার মনটাকে জয় করে স্বমতে নিয়ে আসতে পার।
ফাউস্ট : ওসব কথা বাদ দাও। আমার ক্ষুধা আছে।
মেফিস্টোফেলিস : এখন ঠাট্টা-বিদ্রূপ বাদ দাও। আমি তোমাকে শেষ কথা বলে। দিচ্ছি। অত তাড়াতাড়ি ঐ সুন্দরী বালিকাকে করায়ত্ত করতে পারবে না। ঝটিকা। আক্রমণের দ্বারা যে বস্তুকে লাভ করা যায় না তাকে কৌশল প্রয়োগের দ্বারা লাভ করতে হয়।
