তুমি কোথায় পাবে? আর যে খোঁড়া পাটার কথা বললে সে পা রাখলে কেউ আমার। কাছে আসত না, সবাই আমাকে ত্যাগ করে যেত। আমি তাই আর পাঁচজন যুবকের। মতো এই কয় বছর ধরে নকল পা ধারণ করেছি।
ডাইনি : (নাচতে নাচতে) এই জমিদার শয়তানকে দেখার পর থেকে আমি আমার যুক্তি ও বুদ্ধি সব হারিয়ে ফেলেছি।
মেফিস্টোফেলিস : হে নারী, ও নাম আর করো না।
ডাইনি : কেন নয়, তাতে তোমার কি?
মেফিস্টোফেলিস : রূপকথার বই-এ অনেক কাল আগে হতেই একথা লেখা আছে। কিন্তু একথা কেউ ঠিক মেনে চলে না বলে ভালো মানুষ একটাও দেখতে পাচ্ছি না। সেই আদি শয়তানটাও চলে গেছে, কিন্তু তার জায়গায় অসংখ্য শয়তান নিজেদের প্রতিষ্ঠা অর্জন করে নিয়েছে। আমাকে নাইট উপাধিধারী একজন ব্যারন বা সামন্ত বলে ডাকবে। তাহলে খুবই ভালো হয়। আমি একজন বীর অশ্বারোহী। আমার বংশমর্যাদা সম্বন্ধে তোমার মনে নিশ্চয় কোনও সন্দেহ নেই। আমি যে কোনো অফ আর্মস চিহ্ন ধারণ করে রয়েছি তা দেখ।
(এক অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করল)।
ডাইনি : (কুৎসিত এক হাসি হেসে) হা হা। আমি জানি এটাই তোমার রীতি। তুমি একটি আস্ত শয়তান। সব সময় সেই একইভাবে আছ।
মেফিস্টোফেলিস : শোনো বন্ধু আমার অনুরোধ, খুব সাবধান! ভাই, নিজের থেকে সাবধান হও। ওদের এই হলো রীতি।
ডাইনি : আপনার কি সেবা করতে পারি মহাশয়?
মেফিস্টোফেলিস : আমাকে সুপরিচিত এক মিষ্টি রসে ভরা এক পানপাত্র দাও। তবে পুরনো হলেই ভালো হয়। এসব জিনিস যত পুরনো হবে ততই তার শক্তি বাড়বে।
ডাইনি : সানন্দে এবং আন্তরিকতার সঙ্গেই আমি তা করব। এই নাও বোতল। এই বোতলের রস থেকে মাঝে মাঝে আমিও আমার গলা ভেজাই। এর কোনও খারাপ গন্ধও নেই। আমি বোতল থেকে এক গ্লাস ঢেলে নিচ্ছি।
(চুপিচুপি বলতে লাগল)
কিন্তু এই ভদ্রলোকটি যদি ঠিকভাবে প্রস্তুত না হয় এবং অভ্যস্ত না থাকে, যদি হঠাৎ এই রস পান করে তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হবে। তুমি তা জান।
মেফিস্টোফেলিস : ও আমার এক বন্ধু। ওটা খেলে ওর কিছু হবে না। তোমার রান্নাঘরের সবচেয়ে ভালো খাদ্য ও খাবার যোগ্যতা রাখে। একটা গণ্ডি টান। মন্ত্রপাঠ করো। পানপাত্রটা ভরে দাও।
(ডাইনি উন্মাদের মতো অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে একটি গণ্ডি টেনে অদ্ভুত কতকগুলো জিনিস তার মধ্যে রাখল। এমন সময় কাঁচের পাত্রগুলো আপনা থেকে বেজে উঠল এবং চুল্লীর উপর কড়াইটা হতে শব্দ হতে লাগল। কারা যেন বাজনা বাজাচ্ছে। এরপর ডাইনি বানরদের ডেকে তাদের অর্ধবৃত্তাকারে সাজিয়ে বসিয়ে তাদের মাথার উপর একটা মোটা বই এনে রাখল। বানরগুলো হাতে করে মশালের আলো দেখাতে লাগল। অবশেষে ফাউস্টকে ইশারা করে ডাকল ডাইনি।)
ফাউস্ট : (মেফিস্টোফেলিসকে) এসব কি হবে? এই সব প্রাণীগুলো অতি প্রাচীন। এদের আচরণ অদ্ভুত এবং উন্মাদসুলভ এদের অঙ্গভঙ্গি। আমার সামনে যত সব ঘৃণ্য প্রতারকদের দেখছি। আমি এদের জানি এবং ঘৃণা করি।
মেফিস্টোফেলিস : বাজে! ওটা একটা হাসির ব্যাপার। তুমি ওটাকে এত গুরুত্ব। দিচ্ছ কেন? ও তোমাকে একজন ডাক্তার হিসাবে জ্ঞান করছে। পরে যথাসময়ে তার প্রদত্ত মদ তার প্রভাব বিস্তার করবে।
(ফাউস্টকে গণ্ডির মধ্যে পা দিতে বাধ্য করল)
ডাইনি : (বই থেকে মন্ত্র পড়তে শুরু করল জোর দিয়ে) এই দেখো, এইভাবে এটা হলো। এক থেকে দশ করো এবং তার থেকে দুই বা তিন করো। তাহলেই তুমি ধনী হবে। পাঁচ ও ছয় থেকে চারের উপর জাল ফেলল। যাদুর কসরৎ দেখাও। তারপর সাত আর আট করো। ব্যস, তাহলেই সব শেষ। নয় মানেই এক। দশের কোনও দাম নেই। এই হলো যাদুকরীর এক থেকে একের খেলা।
ফাউস্ট : ও এমনভাবে কথা বলছে যেন মনে হচ্ছে ও জ্বরে প্রলাপ বকছে।
মেফিস্টোফেলিস : এখান থেকে যাবার আগে আরো অনেক কিছু শুনবে। বই-এর কথাই ও বলছে। আমিও বই থেকে মুখস্থ বলতে পারি। আমি ইতিহাস পড়ে কত সময় নষ্ট করেছি। এক বিরাট বৈপিরীত্য, জ্ঞানী ও অজ্ঞানীদের মধ্যে সমানভাবে এক রহস্যের সৃষ্টি করে আসছে। চিরকাল ধরে সেই এক শিক্ষা সকল মানুষ শিখে। আসছে–সেই এক আর তিন আর তিন আর এক সারা জগৎ জুড়ে যুগে যুগে এক মিথ্যাকে সত্য বলে ছড়িয়ে আসছে। তারা ভুল শিখিয়ে আসছে, মিথ্যা শিখিয়ে। আসছে। অথচ কোনও মানুষ তার প্রতিবাদ করে না। নির্বোধ শিক্ষকের হাতে শুধু অসংখ্য নির্বোধ তৈরি হচ্ছে। মানুষ সাধারণত যা শোনে তা বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে তাদের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার সব উপাদানও বিনষ্ট হয়ে যায়, বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ডাইনি : (বলে চলল) বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ কলাকৌশল আজও মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে গভীর গোপনে লুকিয়ে আছে। যার এ বিষয়ে কোনও আগ্রহ নেই, জ্ঞান নেই, যে চায় না। অযাচিতভাবে বিজ্ঞানের সম্পদকে তারই কাছে এনে দেওয়া হয়।
ফাউস্ট : কী যা তা বাজে সব বকে চলেছে। সব কিছুর নিন্দা করে চলেছে। আমার ভয় হচ্ছে আমার মাথার সব স্নায়ু ছিঁড়ে যাবে। আমার মনে হচ্ছে এক লক্ষ নির্বোধ গান করে চলেছে সমবেতভাবে।
মেফিস্টোফেলিস : হে সিবিল, চমৎকার। অনেক মন্ত্র পাঠ করেছ। এইবার তোমার রান্নার জিনিসপত্র সব নিয়ে এস। পানপাত্র পূর্ণ করো কানায় কানায়। এই পানীয় আমার বন্ধুর কোনও ক্ষতিই সাধন করবে না। সে হচ্ছে এমনই এক মানুষ যে জীবনে অনেক ডিগ্রি লাভ করেছে এবং অনেক রকমের মদ পান করেছে।
