বানর ও বানরী : নির্বোধরা তা জানে না। তারা এই পাত্র ও কেটলির মর্ম বুঝবে না।
মেফিস্টোফেলিস : বেয়াদপ পশু কোথাকার!
বানর : এই ব্রাশটা নিয়ে ঔ পিঠওয়ালা বেঞ্চটার উপর অন্তত বসো।
(মেফিস্টোফেলিসকে বসার জন্য অনুরোধ করল)।
ফাউস্ট : (ফাউস্ট এতক্ষণ একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল। ক্রমে সে সেখান থেকে সরে এল) আমি কি দেখছি? কোন সে ইন্দ্রপুরী হতে আগত ও স্বর্গীয় সুষমায় মণ্ডিত এই ঐন্দ্রজালিক মূর্তি প্রতিফলিত হয়ে উঠল সহসা এই কাঁচের আয়নার মধ্যে। হে প্রেম, তোমার দ্রুতগামী পাখা দুটি একটি বারের জন্য দাও আমায়। সে পাখা আমাকে নিমেষমধ্যে নিয়ে যাক ওর অনিন্দ্যসুন্দর রূপের মায়াময় জগতে। আমি ওর কথা মনে ভাবতে ভাবতে এখান থেকে যেখানেই যাই, যেদিকেই তাকাই সেখানেই একরাশ আলতো কুয়াশায় আবির্ভূত হয় তার অতুলনীয় রূপামাধুর্য। অত্যুজ্জ্বল রূপযৌবনসম্পন্না এক নারী। কোনও নারী, সামান্য এক মর্ত্যের মানবী কখনও এত সুন্দর হতে পারে? স্বর্গীয় দ্যুতি আর সুষমার উজ্জ্বলত মূর্তিমতী প্রতীক ঐ নারীকে আমি কি ওখানে বাস্তব অবস্থায় পাব? সারা মর্ত্যভূমিতে কি এই ধরনের এত সুন্দরী নারী দেখতে পাওয়া যায় কোথাও?
মেফিস্টোফেলিস : আমার মনে হয় নিশ্চয় কোনও দেবতা ছয় দিন নিদারুণ দুশ্চিন্তার পর নিজে নিজেই এক অকারণ আত্মপ্রসাদ লাভ করে আপন মনে বলে ওঠেন এই ধরনের সুচতুর এক জীবকে সৃষ্টি করতে হবে। এবার হয়েছে তো? তৃপ্ত হয়েছে তোমার দুচোখের দৃষ্টি? আমি তোমার এই অনিন্দ্যসুন্দরী প্রেমাস্পদকে খুঁজে বার করবই। যে ব্যক্তি তার সুন্দরী প্রিয়তমাকে বন্ধু হিসাবে ঘরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় সে ব্যক্তি সত্যিই খুব ভাগ্যবান।
(ফাউস্ট সেই আয়নার দিকে অবিরাম অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইল। মেফিস্টোফেলিস সেই বেঞ্চের উপর পা ছড়িয়ে শুয়ে ব্রাশটা হাতে নিয়ে খেলা করতে লাগল)।
সিংহাসনে উপবিষ্ট রাজার মতোই এখানে বসে আছি আমি। মাথায় আমার রাজমুকুট না থাকলে এই ব্রাশটাই যেন আমার রাজদণ্ড।
প্রাণীরা : (যে সব বানরগুলো এতক্ষণ ধরে বিভিন্ন রকমের ও অদ্ভুত ধরনের অঙ্গভঙ্গি করছিল, তারা একটি মুকুট এনে মেফিস্টোফেলিসকে দিল) তুমি এবার ভালো হয়ে ওঠ। ঘাম আর রক্তের সঙ্গে এই মুকুট তুমি পরিধান করো।
(তারা মুকুটটাকে এমনভাবে দিল যে তা পড়ে দুখণ্ড হয়ে ভেঙে গেল।) ঠিক আছে। তা যাক। আমরা কথা বলছি, আমরা সব দেখছি। আমি কানে সব শুনছি এবং ছন্দ সৃষ্টি করছি।
ফাউস্ট : (আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে) ধিক ধিক আমাকে! আমার মনে হচ্ছে বুদ্ধি লোপ পেয়ে যাবে।
মেফিস্টোফেলিস : (প্রাণীদের দিকে তাকিয়ে)। আমার নিজের মাথাও ঘুরছে। আমিও হয়তো চেতনা হারিয়ে ফেলব।
প্রাণীরা : আমাদের লক্ষ্য যদি ঠিক হয়, আমাদের চেষ্টা যদি সঠিক হয় তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আসলে আমার চিন্তা। আমরা শুধু চিন্তা করে যাচ্ছি।
ফাউস্ট : সেই অত্যুজ্জ্বল রূপের স্মৃতি বুকের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে আমার। চলো এখান থেকে যত শীঘ্র সম্ভব পালিয়ে যাই।
মেফিস্টোফেলিস : তবে যে কোনও মানুষকে একথা অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করতে হবে যে এই সব প্রাণীরা যথার্থ কবি।
বানরীটি এতক্ষণ চুল্লীর উপর বসানো কড়াইটার দিকে নজর দেয়নি। এখন তার জল ফুটতে ফুটতে উথলে উঠল। সহসা তীব্র এক অগ্নিশিখা জ্বলে উঠে চিমনি স্পর্শ করল আর সেই অগ্নিশিখাকে অবলম্বন করে উপর থেকে এক ডাইনির আবির্ভাব ঘটল।
ডাইনি : ওঃ! ওঃ! ওঃ! শয়তান জন্তুটা পালিয়ে গেল কেটলি থেকে। আবার গান গাইতে শুরু করেছে। জান্নামে যাক।
(ফাউস্ট ও মেফিস্টোফেলিসকে দেখে)
ওখানে কারা? তোমরা কারা? কি চাও তোমরা? কে আমাদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছে? যারা তা করছে তাদের ঘর আর মাথা আগুনে জ্বলে পুড়ে যাক।
(ডাইনি কড়াই-এর মধ্যে হাতাটি ঢুকিয়ে দিয়ে কিছু কিছু আগুন ফাউস্ট ও মেফিস্টোফেলিক ও বানরদের দিকে ছুঁড়ে দিল। বানরগুলো চিৎকার করতে লাগল)
মেফিস্টোফেলিস : (হাতে ধরে থাকা ব্রাশটা উল্টে তা দিয়ে জার ও কাঁচের পাত্রগুলোতে আঘাত করতে লাগল)।
সব ভেঙ্গে দু’খানা হয়ে যাও, সব পাত্র ভেঙে যাক। যত সব জারিজুরি সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। বদমাস গাধা কোথাকার!
(যাদুকরী ডাইনি ক্রোধে সন্ত্রাসে অভিভূত হয়ে পড়ল)
এবার বুঝেছ আমি কে? তোমাকে আমি ঘৃণা করি। অবশেষে তোমার প্রকৃত মালিক ও প্রভু কে তা জানতে পারলে? জানতে পারলে কোন কারণে আমি এই মুহূর্তে তোমাকে ও তোমার বানরসত্তাদের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত ও বিপন্ন করে তুললাম না? খয়েরি এই কোটের প্রতি কি কোনও শ্রদ্ধা অনুভব করছ না? সেই লম্বা মোরগের পালক চিনেত পারছ এবার? আমার মুখটাকে আমি কি ঢেকে রেখেছি? আমি কি আমার নাম বলব। চামড়ার মুখওয়ালা বুড়ি কোথাকার!
ডাইনি : আমাকে ক্ষমা করুন মশাই। আমি সাদাসাপটাভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনাকে। কিন্তু আপনার সেই খোঁড়া পা-টা কোথায়? আর আপনার সেই দুটো দাঁড়কাকই বা কোথায়?
মেফিস্টোফেলিস : এবারকার মতো আমি তোমাকে ঋণের ভার থেকে মুক্তি দিলাম। তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হওয়ার পর থেকে বহুদিন কেটে গেছে। যে। কৃষ্টি যে সংস্কৃতি সারা জগৎকে আচ্ছন্ন করে আছে তা শয়তানদেরও অব্যাহতি দেয় না। উত্তরের সেই সব ভূতপ্রেতদের দিন আর নেই। সেই সব শিং, লেজ আর থাবা আজ
