ফাউস্ট। মেফিস্টোফেলিস
ফাউস্ট : যাদুকরীর এই সব যাদুবিদ্যার কৌশলগত জিনিসপত্র আমার মোটেই ভালো লাগে না। তুমি কি বলছ এই যাদুকরীর উন্মাদসুলভ কিছু যুক্তিহীন ক্রিয়াকাণ্ডের মাধ্যমে আমার পূর্ণজ্ঞান আমি ফিরে পাব। আমি কি এই সামান্য বৃদ্ধা যাদুকরীর কাছ থেকে সাহায্য চাইব? আর তার অশুভ প্রভাব আমার জীবনের তিরিশটি বছরের এক বিরাট অস্তিত্বকে মুছে দেবে আমার কাছ থেকে? ধিক আমাকে! অন্য কোনও ভালো উপায় থাকে তো বলো। আর একটি আশা নিশ্চয়ই সকরুণভাবে ব্যর্থ হবে। প্রকৃতি বা মানবজগতে এর কি কোনো শক্তিশালী ওষুধ আজও আবিষ্কৃত হয়নি?
মেফিস্টোফেলিস : আবার একবার তুমি বিজ্ঞের মতো কথা বললে। তোমার যৌবনসুলভ প্রাণশক্তিকে ফিরিয়ে আনার একটা সহজ উপায় আছে। তোমার কথা অন্য একটি পৃথক গ্রন্থে লেখা আছে আর তা বড় জটিল।
ফাউস্ট : তবু তা আমি জানতে চাই।
মেফিস্টোফেলিস : ঠিক আছে। উপায় খুঁজে পাওয়া গেছে। টাকা-পয়সা, যাদু বা চিকিৎসক কিছুই চাই না। শুধু হাতে তুমি ঐ নিকটবর্তী মাঠটায় চলে যাও। ওখানে এক খণ্ড জমি খুঁড়তে থাকো। নিজের কামনা-বাসনাকে সংযত করে ঐ ভূমিখণ্ডটুকুর মাঝে এমন ফসল ফলাবার চেষ্টা করো যা দিয়ে তোমার শরীর পুষ্ট হতে পারে, যা দিয়ে তুমি ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পার। ভূমিচাষের জন্য যে বলদ ব্যবহার করবে তার সঙ্গে বলদের মতো বাস করতে হবে। যে ভূমিতে তুমি ভালো ফসল ফলাতে চাও তাতে সেই সব বলদের গোময় সার হিসাবে ব্যবহার করবে। মনে রাখবে এটাই হলো সবচেয়ে সোজা পথ এবং এই পথেই তুমি দীর্ঘ আশি বছর পর্যন্ত তোমার যৌবনকে অক্ষুণ্ণ রেখে দিতে পারবে তোমার দেহে।
ফাউস্ট : আমি এ কাজে অভ্যস্ত নই। আমি তো চেষ্টা করে দেখতেও পারব না। কোদাল হাতে নিয়ে কাজ করা বা লাঙল দিয়ে কর্ষণ করা আমার দ্বারা হবে না। ছোট একখণ্ড জমি নিয়ে সারাক্ষণ কাটানো আমার দ্বারা সম্ভব হবে না।
মেফিস্টোফেলিস : তাহলে যাদুকরীর সাহায্যই তোমাকে চাইতে হবে।
ফাউস্ট : কেন একমাত্র বুড়ি যাদুকরী ছাড়া আর কোনও উপায় নেই? নিজে কোনও ওষুধ তৈরি করে দিতে পার না?
মেফিস্টোফেলিস : এ এক মজার খেলা এবং এ খেলা আমি ভালোই জানি। ইতিমধ্যে হাজারটা সেতু নির্মাণ করব আমি। আমার একটা পরিকল্পনা আছে। শুধু বিজ্ঞান ও কলাবিদ্যার দ্বারা সব কাজ হয় না, বড় কাজ করতে হলে ধৈযের দরকার।
আমার শান্ত শীতল মস্তিষ্ক দীর্ঘদিন যে সৃষ্টিশীল কাজে নিরত রয়েছে, কালের দীর্ঘ সে কাজের প্রচেষ্টাকে নিবিড় আর তার সাফল্যকে সুনিশ্চিত করে তুলেছে। সে কাজের সাফল্য দেখে তুমি বিস্ময়ে অবাক হয়ে যাবে। সে কাজ অদ্ভুত মনে হবে তোমার কাছে। শয়তান স্বয়ং আমাকে তা শেখায়, কিন্তু তবু শয়তান নিজে সে কাজ সমাধা করতে পারবে না।
(কয়েকটি প্রাণী দেখে)
দেখো দেখো, কত সুক্ষ্ম প্রাণী ওরা। ওরা হলো নারী, ওরা হলো পুরুষ।
প্রাণীদের প্রতি
মনে হচ্ছে তোমাদের রাণি চলে গেছে?
প্রাণীরা : আজ মদ খেয়ে মাতলামি করতে করতে কোথায় পালিয়ে গেছে চিমনি দিয়ে।
মেফিস্টোফেলিস : কোন সময়ে সে পালিয়ে গেছে।
প্রাণীরা : যখন আমরা আমাদের থাবাগুলো গরম করার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
মেফিস্টোফেলিস : (ফাউস্টকে) কেমন লাগছে এই সব শান্ত প্রাণীগুলোকে?
ফাউস্ট : জীবনে যা কিছু আমি দেখেছি তার থেকে বিদঘুঁটে লাগছে।
মেফিস্টোফেলিস : এই ধরনের কথাবার্তা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে কেন তা বুঝতে পারি না।
প্রাণীদের উদ্দেশ্যে
হে অভিশপ্ত প্রাণীগণ, বলো, কোন তোমরা ওই কড়াইটাকে এমন করে ঘাটছ।
প্রাণীগণ : আমরা ভিক্ষুকদের জন্য জলের ঝোল বানাচ্ছি।
মেফিস্টোফেলিস : তাহলে অনেক লোক তোমরা আমাদের দেখাতে পারবে?
বানর : (মফিস্টোফেলিসের কাছে আবদারের ভঙ্গিতে বলল) নাও পাশার চাল ফেল। তিন দানে আমাকে ধনী করে দাও। আমাকে জিতিয়ে দাও। আজকাল সময় বড় খারাপ যাচ্ছে। মাথার ঠিক থাকছে না। কিন্তু টাকাকড়ি ধনদৌলত পেলেই আমার মাথার সব ঠিক হয়ে যাবে।
মেফিস্টোফেলিস : কি করে বানরটা জানল একবার তার ভাগ্য পরীক্ষা করলেই তার ভাগ্য ফিরে যাবে।
(যে সব বাচ্চা বানরগুলো একটা বড় বল নিয়ে খেলা করছিল তারা খেলা বন্ধ করে এগিয়ে এল)
বানর : পৃথিবীটা একটা বলের মতোই ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে ওঠানামা করছে। অবিরাম ঘুরছে। একটা গোলাকার কাঁচের ফাঁপা জিনিসের মতো ঘুরছে। যে কোনও মুহূর্তে এটা পড়ে যেতে পারে। ভেঙে যেতে পারে। কোথাও এটাকে উজ্জ্বল আবার কোথাও উজ্জ্বলতর লাগছে। হে আমার প্রিয় পুত্র, আমি বর্তমানে বেঁচে আছি। তুমি সরে যাও। তোমার মৃত্যুর দিন বিধিনির্দিষ্ট। জীবনের এই পাত্রটি মাটির মতোই ঠুনকো। যে কোনও সময়ে ভেঙে যেতে পারে মাটির পাত্রের মতো।
মেফিস্টোফেলিস : ওই ছাঁকনিটোতে কি হবে?
বানর : (ছাঁকনিটা হাতে নিয়ে) তুমি কি একজন চোর? আমি তোমার স্বরূপ প্রকাশ করব এবং তোমায় লজ্জায় ফেলব।
(বানর বানরীর কাছে ছুটে গিয়ে ছাঁকনির মধ্যে দিয়ে দেখতে দেখতে বলল)
দেখ দেখ, ছাঁকনির ভেতরটা ভালো করে তাকিয়ে দেখ। চোরটাকে চিনতে পারছিস? কিন্তু তার নামটা জোর করে বলতে সাহস পাচ্ছিস না?
মেফিস্টোফেলিস : (চুল্লীর কাছে গিয়ে) এটা কিসের পাত্র চাপানো আছে চুল্লীর উপর?
