আলত্মেয়ার : না না, আমার পানে তাকাও। আমার মুখপানে তাকাও। আমার মনে হচ্ছে আমাদের ঠকিয়ে তুমি মজা করছ?
মফিস্টোফেলিস : না না, তোমাদের মতো ভদ্রলোকের সঙ্গে আমি প্রতারণা করতে কখনও সাহস পাই? বলো বলো, তোমাদের পছন্দের কথা বলো তাড়াতাড়ি। বলো, কি মদ তোমাদের দেব?
আলত্মেয়ার : যে কোনো মদ–তবে আমাদের চাহিদা যেন মেটে।
মেফিস্টোফেলিস : (নিজে একক অঙ্গভঙ্গি সহকারে)।
আঙ্গুর গাছে আঙ্গুর থোকা যেমন শোভা পায়
তেমনি মাথার শিং নিয়ে পাঁঠারা বেড়ায়।
আঙ্গুর গাছে কাঠ আছে আঙ্গুর ভর্তি রসে
বলো, কাঠের টেবিলে মদ কেমন করে আসে।
দেখবে যাদু প্রকৃতিতে যেদিকে তাকাও।
ছিপি খুলে বোতল থেকে দেদার মদ খাও।
(তারা সবাই ছিপি খুলতেই সকলে আপন আপন বোতলে পছন্দমতো মদ পেয়ে গেল)
বাঃ চমৎকার, মদের ঝর্না বয়ে যাচ্ছে যেন! যে যত খুশি মদ খেয়ে যাও।
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু দেখো,. যেমন মদ মাটিতে পড়ে না যায়। ফেলো না।
(তারা বারবার মদ পান করল,
সকলে গান করতে লাগল)
যেন পাঁচশত বুনোশুয়োর মিলিত হয়েছে
আমরা এক পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করছি।
মফিস্টোফেলিস : দেখো দেখো, ওরা কেমন সুখী, ওরা কেমন স্বাধীন।
ফাউস্ট : আমি এখন এখান থেকে চলে যেতে চাই।
মফিস্টোফেলিস : লক্ষ্য করবে, ওদের এই পাশবিক আনন্দোন্মত্ততা হতে এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হবে।
(সীবেল অন্যমনস্কভাবে মদ পান করতে গিয়ে কিছু মদ মাটিতে পড়ে যেতেই তা আগুন হয়ে জ্বলে উঠল।)
সীবেল : কে আছ বাঁচাও। বাঁচাও। আগুন, আগুন। সাক্ষাৎ নরকাগ্নিকে যেন পাঠিয়ে দিয়েছে।
মফিস্টোফেলিস : (মন্ত্র দ্বারা আগুন নিভিয়ে দিয়ে) শান্ত হও বন্ধুগণ, শান্ত হও।
(উপস্থিত প্রমোদাভিলাষী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে)
আমাদের বাড়াবাড়ির জন্য এ শুধু এক ভর্ৎসনা।
সীবেল : কি বলতে চাও তুমি? থামো থামো। এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে। আমরা তোমাকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেব আমরা কে আর সেটা ভালো হবে না তোমার পক্ষে।
প্ৰসক : ও খেলা আর যেন খেলতে এসো না আমাদের সঙ্গে।
আলত্মেয়ার : আমার মনে হয় ওকে আমরা যদি একটা কাঠের বাক্সের মধ্যে প্যাক করে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিই তাহলে ভালো হয়।
সীবেল : কি দাদা! এতদুর সাহস কোথা হতে পেলেন? আমাদের ঠকানো হচ্ছে। ম্যাজিকের নাম করে!
মেফিস্টোফেলিস : চুপ করে থাকো, একটা বুড়ো মদের পিপে কোথাকার!
সীবেল : ঝটা কোথাকার! দূর হয়ে যা বেয়াদব, মাথা মোটা।
ব্র্যান্ডার : থামো থামো, সবাই মিলে ঘুষি মার ওকে। ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
আলত্মেয়ার : (দেশলাই-এর একটা কাঠি জ্বালাতেই আগুন মুখে এসে লাগল।) পুড়ে গেলাম। পুড়ে গেলাম।
সীবেল : আবার ম্যাজিক! ওকে মার। শয়তনটা দস্যু। ছুরি দিয়ে কেটে ওকে টুকরো টুকরো করো।
(সকলে ছুরি নিয়ে ছুটে গেল মেফিস্টোফেলিসের দিকে)।
মফিস্টোফেলিস : (গম্ভীরভাবে) মিথ্যা কথা আর হাওয়া দিয়ে ভরা এক-একটা ফানুস কোথাকার। আপন আপন স্থান পরিবর্তন করো। এখানে-ওখানে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাক। আপন আপন বিপন্ন বিহ্বল ইন্দ্রিয়চেতনার মাঝে বন্দি। থাক অসহায়ভাবে।
(তারা হতবুদ্ধি হয়ে পরস্পরের মুখপানে আশ্চর্য হয়ে তাকাতে লাগল)
আলত্মেয়ার : কোথায় আমি? কী সুন্দর দেশ!
প্রসক্ : আঙ্গুর গাছ নয়? আমি কি আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারি?
সীবেল : কত নীলচে থোকা থোকা আঙ্গুরের গুচ্ছ হাতের কাছে।
ব্যান্ডার : এখানে হাতের কাছে নুয়ে পড়া শাখায় আঙ্গুর ঝুলছে। কী চমৎকার! (একে অন্যকে ধরাধরি করে দেখাতে লাগল। পরে ছুরি নিয়ে গাছ থেকে আঙ্গুর পাড়ার জন্য হাত বাড়াল)
মেফিস্টোফেলিস : (আগের মতো গম্ভীরভাবে) ওদের চোখ থেকে মায়ার কাজল ঘুচিয়ে দাও। এবার দেখো শয়তানের খেলা। এবার তোমরা চেতনা ফিরিয়ে নাও। (ফাউস্টসহ মেফিস্টোফেলিস চলে যেতেই আমোদকারীরা স্থান পরিবর্তন করল)
সীবেল : কী ঘটে গেল?
আলত্মেয়ার : কেমন করে ঘটল?
প্রসক্ : আমি তোমার নাকটা কি ধরেছিলাম?
ব্র্যান্ডার : আমি কি তোমার নাকটা এখানে ধরে রয়েছি?
আলত্মেয়ার : প্রত্যেকেই প্রত্যেককে আঘাত করে। আমাকে একটা চেয়ার দাও। আমার শরীর অবসন্ন হয়ে পড়েছে। আমার বুদ্ধি হারিয়ে ফেলছি আমি।
প্ৰসক্ : কিন্তু যা ঘটল তা একবার আমাকে খুলে বলো তো।
সীবেল : লোকটা গেল কোথায়? যদি একবার ধরতে পারি কাপুরুষটাকে তাহলে সে আর জীবিত অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না। এখন হয়ত কোথাও লুকিয়ে আছে।
আলত্মেয়ার : আমি নিজের চোখে দেখেছি মদের বোতলের একটা ছিপির উপর চড়ে সে ঐ দরজা দিয়ে সোজা ছুটে পালিয়ে গেল।
এখনও ভয়ের বোঝায় পাগুলো ভারী হয়ে আছে আমার।
(টেবিলের কাছে গেল)
আমার মনে হয় এখনও মদের নেশা কাজ করে যাচ্ছে আমাদের মধ্যে।
সীবেল : সব মিথ্যা মায়া, প্রতারণা।
প্রসক্ : তবু আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন মদ পান করছিলাম।
ব্র্যান্ডার : কিন্তু আর কোথা থেকে এল তা বলো।
আলত্মেয়ার : আচ্ছা অলৌকিক কোনও ঘটনার বিশ্বাস করা উচিত নয়?
ষষ্ঠ দৃশ্য
যাদুকরীর রান্নাঘর
একটা ছোট চুল্লীর উপর একটা কড়াই বসানো ছিল। চুল্লীতে আগুন জ্বলছিল। কড়াই থেকে যে ধোঁয়া উঠছিল তাতে নানারকমের মূর্তির আবির্ভাব হচ্ছিল। কড়াই-এর ফুটন্ত জল তাতে উথলে কড়াই উপছে না পড়ে তা দেখার জন্য পাশে একটা বানরী বসেছিল। অদূরে তার বাচ্চাদের নিয়ে একটা বানর বসেছিল। রান্নাঘরের দেওয়াল ও কড়িবরগাগুলো অদ্ভুত ধরনের আবরণে ঢাকা। দেখেই বোঝা যায় কোনও যাদুকরের আবাসগৃহ।
