ব্র্যান্ডার : শোনো সকলে। আমার কথা শোনো মনোযোগ দিয়ে। আমি স্বীকার করছি হে ভদ্রমহোদয়গণ, আমি জানি কেমন করে বাঁচার মতো বাঁচতে হয়। এখানে যারা আছেন তারা সকলেই প্রমোদভিলাষী। তাঁদের আপন আপন গুণানুসারে আমি সকলকেই কিছু না কিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করব। শোনো তোমরা, এই সুরটা আমার নূতন ধাচের। শুনতে শুনতে সকলেই তাল দেবে।
গান
কোনও একটা বাড়িতে বাসা নিয়েছিল একটি বেঁড়ে ইঁদুর।
মাখন আর যত সব চর্বি জাতীয় খাদ্য খেয়ে তার দেহটা
হয়ে উঠেছিল গোলগাল আর মসৃণ।
ডাক্তার লুথারের মতো তার পিঠে একটা কুঁজ ছিল।
একদিন রাঁধুনি মেয়েটি কৌশলে বিষ মিশিয়ে
দিল খাবারের সঙ্গে আর সেই খাবার খেল ধেড়ে ইঁদুরটি।
তখন তার প্রাণান্তকর অবস্থা।
তখন তার সে অবস্থা দেখে মনে হলো,
তার বুকের ভিতর প্রেমের পাখিটা যেন ছটফট করছে।
কোরাস
তার বুকের ভিতর প্রেমের পাখিটা যেন ছটফট করছে।
ব্র্যান্ডার
সে তখন যন্ত্রণায় ছোটাছুটি করতে লাগল।
তার গায়ের জ্বালা মেটাবার জন্য চৌবাচ্চার
ময়লা জলে ডুব দিল।
সারা বাড়িটা আঁচড় কেটে বেড়াতে লাগল;
কিন্তু কিছুতেই যন্ত্রণার উপশম ঘটল তা তার।
উন্মাদের মতো যেখানে সেখানে ঝাঁপাতে লাগল,
ঘুরপাক খেতে লাগল; দেখে মনে হলো,
তার বুকের ভিতর প্রেমের পাখিটা যেন ছটফট করছে।
কোরাস
যেন তার বুকের ভিতর প্রেমের পাখিটা ছটফট করছে।
ব্র্যান্ডার
অবশেষে সেদিন সেই স্পষ্ট দিবালোকেই
সে নির্লজ্জের মতো ছুটে চলে গেল রান্নাঘরে।
তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল জ্বলন্ত উনোনটার উপর।
প্রচণ্ডভাবে ছটফট করতে থাকা দেহটা তার হঠাৎ নিথর
হয়ে গেল শেষবারের মতো আর ঠিক তখনি
খুনী রাধুনি মেয়েটা হি হি করে হাসতে হাসতে
বলল, বাছাধন, এবার তাহলে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছেন,
যেন ওর বুকের ভিতর প্রথম প্রেম জেগেছে।
কোরাস
যেন ওর বুকের ভিতর প্রথম প্রেম জেগেছে।
সীবেল : দেখো দেখো, বোকা লোকগুলো কেমন ঘটনাটিকে মজার ব্যাপার হিসাবে উপভোগ করছে। আমার কাছে কিন্তু এর অর্থ ভিন্ন। আমার মতে এভাবে বিষ দিয়ে ইঁদুর মারা একটা জঘন্য কৌশলমাত্র।
ব্র্যান্ডার : তুমি তাহলে তাদের পক্ষ অবলম্বন করবে।
আলত্মেয়ার : আমি জানি ন্যাড়ামাথা উঁড়িমোটা লোকটা জীবনে অনেক ঘা খেয়েই একথা বলেছে। বিষ খেয়ে মরা ঐ ইঁদুরটার মধ্যে ও হয়ত নিজের জীবনের স্বাভাবিক পরিণতিটাই দেখতে পাচ্ছে।
ফাউস্ট ও মেফিস্টোফেলিস
মফিস্টোফেলিস : এই সব প্রমোদপিপাসু স্ফুর্তিবাজ লোকদের সামনে তোমাকে নিয়ে এসেছি। আমি তোমাকে এখানে এনে দেখাতে চাই এখানে জীবনের গতি কত সাবলীল, কত স্বচ্ছ। এখানে এরা প্রতিটি দিন ছুটির দিন হিসাবে উপভোগ করে। বিড়ালছানা যেমন তাদের লেজ নিয়ে একটা ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে খেলা করে, ওরাও তেমনি একটা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সারা জীবন ধরে ঘুরপাক খায়, ওদের মাথার বুদ্ধিসুদ্ধি নেই। যদি বড় রকমের কোনও মাথাব্যথা না ঘটে এবং যতদিন পর্যন্ত না পৃথিবীতে ওদের আতিথেয়তার অবসান হয় ততদিন ওরা বেশ হাসিখুশির মধ্যেই জীবনযাপন করবে।
ব্র্যান্ডার : আসল কথাটা খুবই সহজ। ওদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে ওরা যেন দেশভ্রমণ থেকে হঠাৎ এখানে এসে পড়েছে যেন এক ঘণ্টাও এখনও অতিবাহিত হয়নি।
প্ৰসক্ : ঠিক আসল জায়গায় ঘা দিয়েছ তুমি। ঠিক বলেছ, লিপজিগ আমার খুবই প্রিয়। প্যারিস অবশ্য কিছুটা। ওখানকার লোকগুলো কি করে এত মার্জিত হয় কে জানে।
সীবেল : আমাদের মধ্যে বিদেশী বলে কাদের মনে হয় তোমার?
প্রসক্ : ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দাও। আমি তাদের মদ পান করাব। তারপর যেমন কৌশলের সঙ্গে ছেলেদের মুখ থেকে দুধ-দাত টেনে বার করে নেওয়া হয়, আমিও তেমনি ওদের ভিতর থেকে সব গোপন কথা বার করে নেব। ওদের দেখে বেশ বড় ঘরের লোক বলেই মনে হয়। কিন্তু বেশ বোঝা যাচ্ছে ওদের মন-মেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে।
ব্র্যান্ডার : আমাদের এই সব হৈহুল্লোড়ের মাঝে আল্পস পর্বতের ম ব্লা শৃঙ্গের মতো অটল গম্ভীর হয়ে আছে।
আলতুমেয়ার : এই দেখো, আমি এবার ওদের সিগারেট খাওয়াব। মুখে ধোয়া দেব।
মফিস্টোফেলিস : এই লোকগুলো এত সরল প্রকৃতির যে, শয়তান যদি ওদের ঘাড় না ধরে তাহলে কোনওমতেই কাউকে শয়তান বলে সন্দেহ পর্যন্ত করবে না।
ফাউস্ট : আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুণ ভদ্রমহোদয়গণ!
সীবেল : আমাদেরও অভিবাদন ও ধন্যবাদ গ্রহণ করুন।
(পাশে মফিস্টোফেলিসকে দেখতে পেয়ে কিছু গুঞ্জনধ্বনি তুলল উপস্থিত সকলে)
লোকটার একটা পা খোঁড়া।
মফিস্টোফেলিস : এখানে বহু চেষ্টা করেও মদপানের কোনও সুযোগ পাওয়া যায় না। আপনাদের এই প্রমোদানুষ্ঠানে আমরা যোগদান করতে পারি কি? আপনাদের সাহচর্যে আমরা যথেষ্ট আনন্দ পাব।
আলত্মেয়ার : আপনাকে দেখে খুব খুঁতখুঁতে লোক বলে মনে হচ্ছে।
প্রসক্ : বিপাক থেকে রওনা হতে নিশ্চয় আপনারা দেরি করেছিলেন? মনে হয় সেখানে হ্যাঁনদের সঙ্গে নৈশভোজন সারতে গিয়ে দেরি হয়ে যায়।
মফিস্টোফেলিস : আজ অবশ্য আমাদের কেউ কোথাও ডাকেনি। তবে রওনা হবার সময় ঐ ভদ্রলোকের জ্ঞাতিভাইরা আমাদের ছেকে ধরেছিল। তাদের সঙ্গে কিছু কথা বলেছিলাম আমরা। তারা চাইছিল আমরা তাদের প্রত্যেককে পৃথকভাবে বিদায় জানাই।
