ছাত্র : ভালো কথা। তবে কিভাবে সে দক্ষতা অর্জন করা যায় সেইটাই হলো কথা।
মেফিস্টোফেলিস : শোনো বন্ধু, একমাত্র জীবনকে উপভোগ করো। জীবনের সোনালী গাছই হলো একমাত্র সবুজ আর সজীব। বাকি সব তত্ত্ব হলো ধূসরবর্ণ, সব নীরস।
ছাত্র : এসব কথা আমার কাছে স্বপ্নের মতো শোনাচ্ছে। বুকে অন্তহীন বিশ্বাস নিয়ে আমি যদি আবার আপনার জ্ঞানের কথাগুলো শুনতে পেতাম এবং সেই সঙ্গে দুর্বোধ্য জটিল অংশগুলো আপনি সরল করে বুঝিয়ে দিতেন আমায়।
মেফিস্টোফেলিস : সানন্দে আমি তা যথাসাধ্য অবশ্যই করতাম।
ছাত্র : না না, আমি চলে যেতে পারি না কিছুতেই। আমার স্বাক্ষর-সহ পঞ্জীটি আপনি দেখুন প্রথমে। আমার এ অনুরোধ রাখতেই হবে। এতে আপনাকে কিছু লিখে দিতে হবে।
মেফিস্টোফেলিস : অবশ্যই। (কিছু লিখে তা ফিরিয়ে দিল ছাত্রের হাতে)
ছাত্র : (বইটি বন্ধ করে মেফিস্টোফেলিসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে গেল।)।
মেফিস্টোফেলিস : প্রাচীন শাস্ত্রকে অনুসরণ করে চলো। যে সাপকে পদদলিত করার জন্য একদিন আদেশ দেওয়া হয়েছিল তোমাকে সেই সাপকেই অনুসরণ করে যাবে। তোমাকে দেখতে যতই দেবতার মতো মনে হোক না কেন, আসলে তোমার অবস্থা হবে বড় সকরুণ।
(ফাউস্ট প্রবেশ করলো)
ফাউস্ট : এবার কোথায় কোন দিকে যাব আমরা?
মেফিস্টোফেলিস : যেখানে তোমার খুশি যেতে পারো। আমরা প্রথমে ক্ষুদ্র তারপর বৃহত্তর জগৎকে পরিক্রমা করি। কিন্তু এবার তোমাকে খতিয়ে দেখতে হবে এতদিন ধরে এ দুটি জগৎ পরিক্রমা করে, প্রথম থেকে জীবন শুরু করে কী আনন্দ, কী উত্তম বস্তু লাভ করলে?
ফাউস্ট : আমি আমার দাড়ি ধরে শপথ করে বলতে পারি কোনও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বা সম্মান আমি পাইনি সে জগতে। এক অর্থহীন সংগ্রাম সন্ধান করে প্রচেষ্টার মধ্যে নিঃশেষিত হয়েছে আমার সকল উদ্যম। আমি আমার জীবনযাত্রার সঠিক পথটি চিনতে পারিনি। আর পাঁচজন মানুষের মধ্যে নিজেকে বড় ক্ষুদ্র ও অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। আর তাই ভেবে বড় অস্বস্তি জাগে মনে।
মেফিস্টোফেলিস : তুমি আত্মস্থ হও। ধীর ও প্রশান্ত চিত্তে সব কিছু ভেবে দেখো। তোমার মন থেকে সকল অস্বস্তি দূর হয়ে যাবে। জীবনধারণের সব কলাকৌশল তোমার আয়ত্ত্বের মধ্যেই আছে জেনে রেখো।
ফাউস্ট : এখন কি আমার এই বাড়িটা ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়ব? তোমার লোকজন গাড়ি-ঘোড়া সব গেল কোথায়?
মেফিস্টোফেলিস : আমার একখানি বস্ত্র কায়দা করে শূন্যে বিছিয়ে দেব। তারপর শূন্যে সাঁতার কেটে পথ করে যাব। দেখবে শূন্যে এইভাবে যখন উড়ে যাব আমরা তখন আমাদের মানপত্রগুলোকেও খুব হালকা লাগবে। এইভাবে আমরা পৃথিবী ছেড়ে বহু ঊর্ধ্বে খুব দ্রুত উড়ে যাব। আমি তোমাকে তোমার এই নতুন জীবনকে স্বাগত জানাই।
পঞ্চম দৃশ্য
লিপজিগে অবস্থিত অয়েরবাকের কক্ষ।
পানোন্মত্ত সঙ্গীদের উল্লাসধ্বনি।
প্রসক্ : কই, কেউ হাসছে না। কেউ মদ্যপান করছে না? আমি ভাবছি, কেমন করে হাসতে হয় তা তোমাদের শিখিয়ে দেব। সাধারণত তোমরা বেশ গরম হয়ে থাকো, কিন্তু ভিজে খড়ের মতো এমন মিইয়ে উঠেছ কেন?
ব্র্যান্ডার : সেটা তোমারও দোষ। তুমি মদ্য পান করলেও তোমার মধ্যে তার কোনও লক্ষণই দেখতে পাচ্ছি না। কোনও পাশবিকতা বা নির্বুদ্ধিতারই পরিচয় পাচ্ছি না।
প্রসক্ : (ব্রান্ডারের মাথায় একপাত্র মদ ঢেলে দিল) এই নাও দুই-এর পরিচয়।
ব্র্যান্ডার : আবার দাও।
প্রসক্ : তুমি যা চেয়েছিলে আমি তা দিয়েছি।
ব্র্যান্ডার : যারা ঝগড়া করছে ঘর থেকে বার করে দাও তাদের। পুরো ভরা গলায় কোরাস গাও। মদ পান করো ইচ্ছামতো। হৈহুল্লোড়ে মেতে ওঠ। চিৎকার করো, হুল্লা!
আলত্মেয়ার : হা ভগবান! ষাঁড়ের মতো চিৎকার করছে কে? তুলো নিয়ে এস তাড়াতাড়ি। আমার কানের পর্দা ফেটে গেছে।
সীবেল : যখন গানের শব্দে আকাশ ফাটে তখন বুঝতে হবে গানের পাত্রটি গভীর আর তাতে অনেক মদ আছে।
প্রসক্ : বাঃ বেশ বলেছ। যারা এ সব একটুও পছন্দ করে না তারা বেরিয়ে যেতে পারে। গাও, টারা লারা তা।
আলত্মেয়ার : টারা লারা তা।
প্রসক্ : এবার গলার সুর এসেছে। নাও, শুরু করো।
গান
হে আমার প্রিয় পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য,
কেমন করে তুমি বিধৃত আছে একটিমাত্র ঐক্যসূত্রে।
ব্র্যান্ডার : বাজে গান। ধিক ধিক! এ হচ্ছে রাজনৈতিক গান। অত্যন্ত আপত্তিকর গান। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও। যে প্রতিদিন সকলে তোমাদের রোমান রাজ্য নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। আমি যে দেশের চ্যান্সেলার বা কাইজার হয়ে উঠিনি এজন্য ভাগ্যবান মনে করছি নিজেকে। তবে আমাদের মাথার উপরে অবশ্যই একজন শাসক চাই। তুমি জান গুণই মানুষকে বড় করে তোলে। গুণের জন্যই মানুষকে বড় হিসাবে নির্বাচিত করে।
প্রসক্ : হে আমার মানসী প্রিয় নাইটিঙ্গেল, তোমাকে হাজার বার আমার অন্তরের অভিনন্দন জানাই।
সীবেল : না না, ও আমার প্রিয়া। আমার প্রিয়াকে তোমার বলে চালিও না। এতে আমার রাগ হচ্ছে।
প্রসক্ : আমার প্রিয়াকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি, তাবে চুম্বন করছি। আমি তোমার উক্তির প্রতিবাদ করছি ।
গান
চাবি খোলো, দরজা খোলো, আঁধার হয়েছে
চাবি খোলো, দরজা খোলো, প্রেমিক জেগেছে।
চাবি দাও, দরজা লাগাও, সকাল হয়েছে।
সীবেল : তুমি যত খুশি গান করো। তার গুণগান করো। তার জন্য গর্ব করো। উপযুক্ত সময়ের জন্য আমি অপেক্ষা করব। একদিন যে আমার নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে, এবার তোমাকেও তাই করবে। তার প্রেমিক হবে কোনও একটি কুৎসিত স্কুল প্রকৃতির লোক। ব্লকসবার্গ থেকে আসা একটা বুড়ো পাঁঠা তার সঙ্গে প্রেম করবে। আমাদের মতো দ্রবংশের সন্তান তার উপযুক্ত পাত্র নয়। আমি তাকে স্মরণ করে দেব? অন্তরের প্রতি অভিনন্দন জানাব? কখনই নয়। বরং তার ঘরের জানালা ভেঙে তার সঙ্গে দেখা করব।
