ছাত্র : আপনার কথা ঠিক আমি বুঝতে পারছি না।
মেফিস্টোফেলিস : সব কিছু শেখার পর যখন শ্রেণীবিন্যাস করতে পারবে বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে তখন সব কিছু বুঝবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
ছাত্র : আপনার কথা শুনে আমার মাথাটা যেন গুলিয়ে গেল। আমার মাথাটা যেন আরও বেশি মোটা হয়ে গেল। আমার মাথার মধ্যে যেন একটা মিলের চাকা ঘুরছে।
মেফিস্টোফেলিস : তোমার প্রথম এবং প্রধানতম কর্তব্য হবে অধিবিদ্যা শেখা। তারপর তার প্রয়োগটা শিখবে দেখবে ব্যাপারটা কত সুন্দর। দেখবে সে সুকঠিন বিদ্যা মানুষের মাথায় ঢোকে না তার থেকে লাভবান হচ্ছ তুমি। এমনকি যে সব তত্ত্ব তোমার মাথায় ঢুকবে না, তুমি তাও মানুষকে উপযুক্ত ভাষা দিয়ে বোঝাতে পারবে। তবে ছটা মাস তোমাকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা সহকারে পড়াশুনা করতে হবে। বুঝতে পারছ? দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা করে পড়তে হবে। ঘড়ি ধরে। তোমাকে এমনভাবে পড়া মুখস্ত করতে হবে যাতে বই-এর একটা কথাও বাদ না যায়। আবার এমনভাবে তাড়াতাড়ি লিখতে শিখবে যাতে মনে হবে সেই ধর্মীয় পবিত্র প্রেত তোমাকে শ্ৰতিলিখন লেখাচ্ছে।
ছাত্র : এ কাজ আমি ঠিক করব। আর আমাকে দুবার বলতে হবে না। আমারও মনে হয় লেখার মতো জিনিস আর নেই। কোনও বিষয় একবার কাগজে লিখে নিতে পারলে তা আমার আয়ত্তে এসে যাবে চিরদিনের মতো।
মেফিস্টোফেলিস : তা তো হলো। তবে একটা বিষয় নির্বাচন করো।
ছাত্র : আমি আইন-তত্ত্বের সঙ্গে মোটেই খাপ খাওয়াতে পারি না নিজেকে।
মেফিস্টোফেলিস : তার জন্য ছাত্রদের আমি দোষও দিতে পারি না। এই আইন তত্ত্বের আজ কি অবস্থা হয়েছে আমি তা জানি। এক যুগ হতে অন্য যুগে, এক স্থান হতে অন্য স্থানে এই সব আইন আর যত সব আইনগত অধিকার এক চিরস্থায়ী রোগের মতো পুরুষানুক্রমে সংক্রামিত হচ্ছে সকলের মধ্যে। যুক্তি পরোপকারপ্রবৃত্তি সব গোল্লায় গেছে। তুমি তো আমার পৌত্রের মতো। এ বিষয়ে তাড়াহুড়ো করার কিছু। নেই। আমরা যারা বয়োপ্ৰবীণ তারা সব ভেবে দেখব।
ছাত্র : আপনার কথা শুনে আইন-তত্ত্বের উপর আমার স্বাভাবিক বিতৃষ্ণা আরও বেড়ে গেল। আপনার কাছে পড়তে পারাটা সত্যিই ভাগ্যের কথা। আমি প্রায় ঠিক করে ফেলেছি আমি ধর্মতত্ত্ব শিখব।
মেফিস্টোফেলিস : আমি চাই না তুমি এ বিষয় শিখতে গিয়ে কারো দ্বারা ভুল পথে পরিচালিত হও। এই তত্ত্বের ব্যাপারে আমি তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি। মানুষ সাধারণত ভুল পথে না গিয়ে পারে না। চিকিৎসাবিদ্যায় যেমন মানুষ ঠিক রোগ ধরতে পেরে ঠিকমতো ওষুধ প্রয়োগ করতে পারে না সব সময় তেমনি ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রেও আসল তত্ত্ব ধরতে পারে না। অনেক গোপন ভ্রান্তি বিষের মতো কাজ করে যাচ্ছে এই তত্ত্বের মধ্যে। শুধু তোমার শিক্ষকদের কথা শুনে যাবে। সেই কথাকেই সত্য বলে। মেনে নেবে। শুধু এই কথাকে অবলম্বন করেই একদিন নিশ্চিত সত্যের মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে।
ছাত্র : তবে এই কথার মধ্যে কিছু ভাব বা আদর্শ থাকা চাই।
মেফিস্টোফেলিস : অবশ্যই। তবে খুব বেশি উগ্র বা তীক্ষ্ণ ভাব থাকা ঠিক নয়। কথা দিয়েই খুব ঝগড়া করা যায় আবার কথা দিয়েই খুব ভালো বন্ধুত্বও গড়ে তোলা যায়। কথা দিয়েই বিশ্বাস উৎপাদন করা যায় মানুষের মনে। এই কথার সম্পদ কেউ চুরি করলেও কথার কিছু যায় আসে না।
ছাত্র : মাফ করবেন। আপনাকে অনেক প্রশ্ন করেছি। আরও কিছু জানার আছে। আমি আপনার কাছ থেকে চিকিৎসাবিদ্যা সম্বন্ধে কিছু শুনতে চাই। আমাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিন। হা ভগবান! মাত্র তিন বছরে কখনও এই শাস্ত্রের ক্ষেত্রটি পুরোপুরি জানা যায়?
মেফিস্টোফেলিস : (স্বগত) এই নীরস কথার কচকচি আর আমার ভালো লাগছে না। আমি বিরক্তি বোধ করছি। আবার আমাকে শয়তানের মতো আচরণ করতে হবে। (উচ্চকণ্ঠে) চিকিৎসাবিদ্যার মূল তত্ত্বটি জানা খুবই সহজ। যদিও পরিশেষে তোমাকে একদিন তোমার এই ব্যক্তিগত ও বিশ্বগত জগৎ ছেড়ে চলে যেতে হবে তথাপি এই জগৎ সম্বন্ধে ভালোভাবে জ্ঞানলাভ করাই হলো বিজ্ঞানের যে কোনও শাখার কাজ। বিজ্ঞানের এক একটি বিশাল ক্ষেত্রকে মানুষ যতই পরিক্রমা করুক না কেন, মানুষ তার নিজের সাধ্যের অতিরিক্ত কিছুই শিখতে পারে না। তবে যে মানুষ যে শিক্ষার্থী প্রতিটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে ঠিকমতো সেই হচ্ছে প্রকৃত মানুষ। তোমার দেহটি বেশ সুগঠিত, এটা অস্বীকার করা যায় না। তুমি অবশ্যই একটু চেষ্টা করলে কৃতকার্য হবে। যদি তুমি নিজের উপর আস্থা রাখো, তাহলে অবশ্যই বাইরের সব মানুষ আস্থা রাখবে তোমার উপর। আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়ের মতো শক্তি আর নেই। তবে নারীজাতির মন জয় করতে হলে তোমাকে বিশেষভাবে তাদের আবেগানুভূতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে হবে। তা যদি বুঝতে পার তাহলে দেখবে অনন্তকাল ধরে যে বেদনা যে ব্যর্থতার হাহাকার অসংখ্য নারীকণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার মূল উৎস কিন্তু এক এবং তার প্রতিকারের উপায়ও এক। যদি তোমার কাজকর্ম অর্ধেক কলাকৌশলেরও পরিচয় দিতে পারে তাহলে তারা তোমার পদানত হয়ে থাকবে। তবে তোমার নামের সঙ্গে একটা জাঁকজমকপূর্ণ উপাধি জুড়ে দিতে হবে এবং দেখতে হবে তোমার দক্ষতা এ ব্যাপারে আর সকলকে ছাড়িয়ে গেছে। তখন তুমি সামান্য অভিবাদনের ভঙ্গিতে অবাধে তাদের দেহ স্পর্শ করতে পারবে। কেউ কোনও বাধা দেবে না। এমনি করে বছরের পর বছর চলতে থাকলে তুমি আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে। তখন তুমি তাদের হাত টিপে হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া পরীক্ষা করতে গিয়ে আড়চোখে তাদের পানে তাকিয়ে তাদের নিতম্বগুলোকে জড়িয়ে ধরতে পারবে। আর দেখবে তখন তাদের দৃঢ় সংবদ্ধ কটিতটের নীবিবন্ধগুলো শিথিল হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
