ফাউস্ট : তাকে দেখার কোনও ইচ্ছা নেই আমার।
মেফিস্টোফেলিস : বেচারা ছেলেটি অনেকক্ষণ ধরে আমার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। তাকে এভাবে নিরাশ হয়ে চলে যেতে দেওয়া উচিত হবে না। তোমার টুপি ও পোশাকটা আমাকে একবার ধার দাও। আমি ভালোভাবেই একটু অভিনয় করব। (ছদ্মবেশ ধারণ করল) আমার বুদ্ধির উপর আমার আস্থা আছে। আমার বুদ্ধি ঠিক কাজ করে যাবে। তবে পনেরো মিনিট সময় আমার পক্ষে যথেষ্ট। এর মধ্যেই আমি আমার যাত্রা শেষ করে ফিরে আসব। তুমি তৈরি হয়ে নাও তাড়াতাড়ি। (ফাউস্টের প্রস্থান)
মেফিস্টোফেলিস : (ফাউস্টের লম্বা পোশাক পরে) যে যুক্তি যে জ্ঞান মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তুমি সেই যুক্তি ও জ্ঞানকে ঘৃণা করো। মিথ্যা ছলনার অপদেবতা। ঐন্দ্রজালিক বিদ্যার বন্ধনে তোমাকে আবদ্ধ করে পতনের অন্ধকার গহ্বরে নিয়ে যাক। তোমাকে সেই অবস্থায় আমি শীঘ্রই দেখব। অপ্রতিরোধ নিয়তি তাকে এমন এক মনোভাব দান করেছে যার ফলে সে তার প্রাপ্ত ও প্রাপনীয় পার্থিব ভোেগসুখকে অগ্রাহ্য করে শুধু নিরন্তর অপ্রাপনীয়ের সন্ধানে এগিয়ে চলেছে। আমি তাকে কৌশলে বশীভূত করে উদ্দাম উচ্ছল জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাব। অবিরাম দুঃখ বাধা আর সংগ্রামে পীড়িত করতে করতে তার মনকে এমনই উত্তপ্ত ও অতৃপ্ত ও অশান্ত করে তুলব। যে সে শুধু মদ্যপানের স্বপ্নই দেখে যাবে, কিন্তু মদ্যপান করতেও পারবে না, সে কখনও জলযোগও করতে পারবে না। সে পুরোপুরি শয়তানে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না। কোনও দিকেই পরিত্রাণ নেই তার। শয়তান হোক বা না হোক তাকে জাহান্নামে যেতেই হবে। (জনৈক ছাত্রের প্রবেশ)
ছাত্র : আমি অল্পক্ষণ এখানে এসেছি। যে যশস্বী ব্যক্তির নাম অনেকেই আমার কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে অনেকবার করেছে, আমি তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ও তাঁর সঙ্গে পরিচয় করতে এসেছি।
মেফিস্টোফেলিস : তোমার সৌজন্যে আমি খুশি হলাম। তবে আমি আর পাঁচজনের মতোই এক সাধারণ মানুষ। আচ্ছা, তুমি এর আগে নিশ্চয় কোথাও পড়াশুনো শুরু করেছিলে তোর।
ছাত্র : আমি একজন ভদ্র ও সঙ্গতিসম্পন্ন ঘরের সন্তান। আমি এখানে সাহসের সঙ্গে এসেছি। আমার মা আমাকে ছাড়তে চাইছিলেন না। কিন্তু উন্নততর জ্ঞানলাভের বাসনার বশবর্তী হয়ে চলে এলাম আমি।
মেফিস্টোফেলিস : তাহলে উপযুক্ত জায়গাতেই এসে পড়েছ।
ছাত্র : না, আমি থাকব না, চলে যাব এখান থেকে। আমি শপথ করে বলছি। এই ঘর, এর দেওয়ালগুলো, এর ছাদ সব দেখেশুনে আমার বড় খারাপ লাগছে। এই সংকীর্ণ অনুদার পরিবেশে আনন্দের কোনও অবকাশ নেই। এখানে কোথাও কোনও গাছ বা সবুজের চিহ্ন নেই। পড়ার ঘরে আমি যখন বক্তৃতা শুনব তখন শব্দ দৃশ্য সহযোগে আমি কিছু কল্পনা বা চিন্তা করার কোনও সুযোগ পাব না।
মেফিস্টোফেলিস : অভ্যাসের উপরেই নির্ভর করে সব কিছু। প্রথমে দেখবে অনেক সদ্যোজাত শিশু মাতৃস্তনে মুখ দিতে গিয়ে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করে। মাতৃস্তন পান করতে গিয়ে কাঁদে। পরে অনবরত এই মাতৃস্তনের সন্ধান করে। তেমনি জ্ঞানদেবীর স্তনদুগ্ধ পান কর একবার যদি আস্বাদ পাও তাহলে দেখবে তা ছাড়তে পারবে না। দিনে দিনে বেড়ে যাবে জ্ঞানলাভের আনন্দ।
ছাত্র : আমি সানন্দে লেগে থাকব। নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে আমি জ্ঞানলাভ করে যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তার সঠিক পথটি দয়া করে বলে দিন।
মেফিস্টোফেলিস : তার আগে তুমি প্রথমে বলো কোন বিশেষ বিষয়ে তুমি জ্ঞানলাভ করতে চাও?
ছাত্র : স্বর্গে মর্ত্যে প্রকৃতি জগতে ও মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে যত রকমের বিদ্যা আছে আমি সেই সব বিষয়ে সর্বোচ্চ বিদ্যালাভ করতে চাই।
মেফিস্টোফেলিস : এখানেই তুমি পাবে সঠিক পথের সন্ধান। তবে কঠোরভাবে তোমার মনকে নিবন্ধ করতে হবে এ বিষয়ে।
ছাত্র : দেহ-মন দুটোকেই আমি সমানভাবে নিযুক্ত করব। তবে আমার একটা ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। শুধু গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলোতে আমাকে কিছু স্বাধীনতা দিতে হবে।
মেফিস্টোফেলিস : যে সময় আমাদের ফাঁকি দিয়ে অতি দ্রুত পালিয়ে যায় সেই পলায়মান সময়কে কাজে লাগাতে হবে। আমি জোর করে বলতে পারি, একমাত্র নিয়মানুবর্তিতার দ্বারাই সময়কে জয় করা যায়, আয়ত্তাধীনে আনা যায়। তাহলে বন্ধু, প্রথমে তোমাকে তর্কবিদ্যা পড়তে হবে। এই বিদ্যা শিক্ষা করার ফলে তোমার মন মার্জিত হবে। স্প্যানিশ বুটজুতোর শক্ত করে লাগানো ফিতের মতো সব বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে শিখবে। এলোমেলো বাতাসের মতো এখানে-সেখানে ঘুরে। না বেড়িয়ে সঠিক চিন্তার পথ ধরে অর্থাৎ সঠিক চিন্তনপদ্ধতি অবলম্বন করে তোমার মন এগিয়ে চলতে শিখবে। তখন তোমার মন তোমার অতীত জীবনের কর্মাকর্মও বিচার করে দেখতে শিখবে। মানুষের মনের পশমী জমিটাও হলো কোনও বয়নশিল্পীর দ্বারা সৃষ্ট শিল্পকর্মের মতোই আশ্চর্যজনক। হাজার হাজার সুক্ষ্ম সুতো দিয়ে যেমন একখানা কাপড় তৈরি হয় তেমনি এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য চিন্তাভাবনার সুতো দিয়ে তৈরি হয় মানুষের মনের জমি। দার্শনিকের কাজ হলো কার্যকারণতত্ত্বের মাধ্যমে মনের জমির সুতোগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কটি বিশ্লেষণ করে দেখা। এই সম্পর্ক অপরিহার্য। এক না হলে যেমন দুই আসে না, তেমনি তিন না হলে চার আসে না। তবে দার্শনিক পণ্ডিতরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করলেও বয়নশিল্পীদের মতো সমগ্রতা সাধনে সার্থক হন না। বয়নশিল্পীরা সব সুতো সুন্দরভাবে মিলিয়ে একখানি কাপড় তৈরি করেন। কোনও সুতোকে বাদ দেন না। কিন্তু বিজ্ঞানী ও পণ্ডিতরা বড় একদেশদর্শী। যারা শরীরবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞান চর্চা করেন তারা আবার আত্মার অস্তিত্ব বিশ্বাস করেন না। জোর করে উড়িয়ে দেন। যে আংশিক জ্ঞানকে তিনি আয়ত্ত করেন তাকেই তিনি বড় করে দেখেন। কিন্তু প্রতিটি অংশের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক আছে এবং সে সম্পর্ক না থাকলে কোনও অংশ কখনও সমগ্রে পরিণত হয় না সে সম্পর্ক তারা স্বীকার করেন না। রসায়নবিদ্যা বলে প্রতিটি বস্তুর মধ্যে এক অন্তর্নিহিত স্বরূপ আছে। সেটিকে জানলেই বস্তুর স্বধর্মকে জানা যাবে আর তাহলে সব রহস্যের সন্ধান পাওয়া যাবে। আত্মার কোনও প্রয়োজন নেই।
