মেফিস্টোফেলিস : তোমার জন্য শর্তের বন্ধন থাকবে না। তুমি সব সময় সুখলাভের জন্য চেষ্টা করবে। তবে সে সুখ পাবে কিনা সে বিষয়ে আমার কোনও কিছু বলার নেই। আমার কথা শুধু এই যে, যাই করো সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে। কোনওরূপ দুর্বলতা প্রকাশ করবে না।
ফাউস্ট : তুমি হয়ত শুনে থাকবে আমি নিজের আনন্দের জন্য একথা বলছি না। যে চঞ্চল চপল আনন্দ তীক্ষ্ণতম বেদনার কারণ সেই মধুর অথচ ঘৃণ্য আনন্দের স্বরূপ উদঘাটন করতে চাই আমি। কোনও ব্যর্থতার বেদনাই আমার অশান্ত চিত্তের অনন্ত জ্ঞানপিপাসাকে নিবারিত করতে পারবে না। সৃষ্টির আদি কাল হতে আজ পর্যন্ত যুগে যুগে বিশ্বের মানুষ যে জীবনযাপন করে এসেছে, সে সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা ভোগ করে এসেছে, আমি আমার বোধশক্তির সমস্ত নিবিড়তা দিয়ে তাদের সত্যাসত্য পরীক্ষা করতে দেখতে চাই আপনার আপন সত্তার গভীরে। এইভাবে সূদুর অতীত হতে বর্তমান পর্যন্ত ছোট-বড় মানুষের আত্মার মধ্যে আমার আত্মাটি হবে স্বচ্ছন্দে প্রসারিত। তাদের সঙ্গে আমি হয়ে উঠব একাত্ম।
মেফিস্টোফেলিস : আমার কথা বিশ্বাস করো। আমিও হাজার বছর ধরে এ পরীক্ষা করে এসেছি। ছোট-বড় মানুষের আত্মার মাংসগুলোকে চিবিয়ে এসেছি আমি। পৃথিবীতে এমন কোনও মানুষ নেই যে সুদূর আবহমান কাল থেকে নিয়তির নিয়ন্ত্রণপ্রভাবে নিরন্তর রূপান্তর লাভ না করে আসছে। আমার কথা বিশ্বাস করবে, আমরা যাকে স্বর্গ আর স্বর্গীয় ঐশ্বর্য ও সুষমা বলি তা শুধু ঈশ্বর নিজের ভোগের জন্য সৃষ্টি করেছেন। অন্ধকারের মধ্যে আমাদের ঠেলে দিয়ে দিবা-রাত্রির তরঙ্গদোলায় আমাকে-তোমাকে দুলিয়ে তিনি আলোকাজ্জ্বল স্বর্গপুরীতে বাস করছেন।
ফাউস্ট : তা হোক, তবু আমি।
মেফিস্টোফেলিস : ভালো উত্তরই দান করেছ। তবে একটা ভয়ের কথা আছে। নদীর স্রোতের মতো নিরবধি কালস্রোত প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। এই কালস্রোতের আঘাত থেকে বাঁচতে হলে সেই কলাবিদ্যা শিখতে হবে যে কলাবিদ্যা দীর্ঘস্থায়ী করে রাখে সব কিছুকে। আমি বলছি, তুমি এই মুহূর্তে কোনও কবির কাছে যাও। বন্ধদ্বারা তার অবাধ কল্পনাশক্তিকে প্রতিহত করগে। তার সৃষ্ট কাব্য-সাহিত্যের গুণের কথা বলে দাও। বল সিংহের প্রবল বিক্রম বন্য হরিণের দ্রুতগতি, হঠকারী জ্ঞানীদের উত্তপ্ত রক্তের উচ্ছ্বাস, উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর শীতল সহনশীলতা প্রভৃতি গুণগুলোর দ্বারা সমৃদ্ধ তার কাব্য। কাবে বলবে সে অনেক কিছু করেছে। তবে তার একটা জিনিস করতে হবে। তাকে বলবে সে যেন এমন এক গোপনসূত্র সৃষ্টি করে যা দিয়ে বাঘে-বলদে এক ঘাটে জল খাওয়ানো যায়, যা দিয়ে উচ্চ-নীচে মিলন ঘটানো যায়, মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করা যায়। আর একটা জিনিস শিখবে তার কাছে। তোমার জীবন ও যৌবনের আনন্দকেএকটু অনুশাসিত করে চলতে শিখবে। দেখবে তোমার ভালোবাসা ও ঘৃণার আবেগ যেন সব সময় একটা নিয়ম ও ছন্দ মেনে চলে। আমি কিন্তু মোটেই বড় হতে চাই না। আমি চাই এমন একজন মানুষকে চাক্ষুষ করতে যে পৃথিবীতে সবচেয়ে ছোট।
ফাউস্ট : তাহলে আমি কি পেলাম! আমি যদি সমগ্র মানব জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ মনুষত্বের গৌরবমুকুটে ভূষিত হতে না পারলাম তাহলে আমার জীবনের দাম কি। আমি তো সারাজীবন ধরে তাই চেয়ে এসেছি।
মেফিস্টোফেলিস : দেখো, মোটের উপর তুমি যা তাই আছ, তাই থাকবে। বহিরঙ্গের কিছু রূপান্তর সত্ত্বেও মানুষের জীবনের মূল ধাতুর বিশেষ কোনও পরিবর্তন হয় না। আজ তুমি যদি বড় হবার জন্য মাথায় অনেক পরচুলা পরো আর তোমার জুতোর তলায় অনেক চামড়া লাগাও তাহলে সত্যিই তুমি বড় হবে।
ফাউস্ট : এখন আমার মনে হচ্ছে এতকাল ধরে মানুষের চিন্তার জগৎ পরিক্রমা করে এত জ্ঞানবিদ্যা অর্জন করে কোনও লাভই হয়নি আমার। আমি কিছুই পাইনি। যখন কোনও অলস মুহূর্তে শান্ত নীরব অবকাশে বসে থাকি তখন অনেক চেষ্টা করেও আমার মস্তিষ্কের কোনও গুহ্য প্রদেশে নূতনতর কোনও শক্তির প্রাণকেন্ত্র আমি খুঁজে পাই না। আমি বেশ বুঝতে পারি আমার মানসিক সমুন্নতি এক চুলও বাড়েনি। ঈশ্বরের অনন্ত মহিমার কাছে এক পাও এগিয়ে যেতে পারিনি।
মেফিস্টোফেলিস : বাঃ, এইতো চাই। এখন দেখছি, আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো তুমি নিজের বাস্তব অবস্থার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারছ। জীবনের আনন্দে সব ফুরিয়ে যেতে না যেতেই আমরা তোমাকে আরও জ্ঞানী করে তুলব। তোমার হাত আছে পা আছে আর আছে যত সব অশুভ শক্তিনিচয়। এই সব দিয়ে অনেক কাজ করতে পারবে তুমি। আমার কাছে যদি ছটা বড় আরবী ঘোড়া থাকে তাহলে আমার মনে হবে আমার বিশটার পা আছে তার তাই দিয়ে অনেক জোরে ছুটতে পারব। কিন্তু তুমি তোমার অবাধ কল্পনাশক্তিকে বিদায় দাও। জাগতিক কাজকর্মে মন দাও। আমার কথা শোনো, আমার মতে কোনও কল্পনপ্রবণ ব্যক্তি হলো অনুর্বর মরু প্রান্তরে কোনও অশুভ শক্তির দ্বারা ভুল পথে পরিচালিত কোনও পশুর মতো যে পশু অদূরবর্তী কোনও সবুজ গোচরণ ভূমিতে না গিয়ে উষর তৃণহীন প্রান্তরে ঘরে বেড়াতে থাকে।
ফাউস্ট : কাজটা তাহলে কিভাবে শুরু করব?
মেফিস্টোফেলিস : আরও বড় ক্ষেত্রে আমরা এ সত্য যাচাই করে দেখতে চাই। এই শহীদ হবার জায়গা নয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি এইভাবে নিজেকে ও অনুরাগী ভক্ত ও ছাত্রদের সামনে দীর্ঘ বক্তৃতা করে জ্ঞানবিদ্যার বড়াই করাটাই কি বিজ্ঞতার পরিচায়ক? এটাই কি প্রকৃত জীবনযাপনের আদর্শ? তোমার জীবনের যে জ্ঞান সবচেয়ে বড় সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ তা তোমার কোনও ছাত্রের কাছে বলার কোনও সাহস হবে না তোমার। কখনই না। কারও পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছ?
