মেফিস্টোফেলিস : এদিক দিয়েও তুমি আমাকে বিশ্বাস করে দেখতে পার। আমার সঙ্গে চুক্তিপত্রে আবদ্ধ হতে পার। আমার কৃতিত্ব ও কলাকৌশল তুমি আনন্দের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করবে। মানুষ যা জীবনে কখনও চোখে দেখেনি আমি তোমাকে তাই দেব।
ফাউস্ট : যে হতভাগ্য শয়তান, তাহলেও তুমি আমাকে কিছুই দিতে পারবে না। নিজের কৃতিত্বটাকে বড় করে দেখছ কিন্তু মানবাত্মার কৃতিত্বসমূহকে কখনও তোমার মতো শয়তানে বুঝতে পেরেছে? ভেবে দেখো, তোমার কাছে এমন খাদ্য আছে যে তাতে তোমার কখনও পেট ভরবে না। তোমার হাতে এমন স্বর্ণসম্ভার আছে যা শুধু বারবার আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যায়, যার ছলনাময় উজ্জ্বলতা জয় করা যায় না। কোনওদিন ধরা দেয় না আমাদের কাছে। সেই সোনা ছলনাময়ী কোনও যুবতী কুমারীর মতো আমাদের প্রতারিত করে শুধু। যে যুবতী নারী আমাদেরই বুকে থেকে অন্য কোনও লোকের উপর নিষ্ঠুর দৃষ্টিশর হানে এবং উপরে কপট সম্মানের ভান করে। মনে হয় কক্ষচ্যুত কোনও উল্কা নেমে এসে নাচছে তার চোখের তারায়। আমাকে এমন কোনও গাছ দেখাতে পার যে গাছে প্রতিদিন নূতন পাতা গজিয়ে ওঠে ফলগুলোকে ঢেকে রাখে আর সে গাছের ফলগুলো পাকতে না পাকতেই পচে যায়।
মেফিস্টোফেলিস : তোমার এ দাবির কথা শুনেও ভয় পাই না আমি। আমি তোমাকে তাও দিতে পারি। কিন্তু তার এখনও সময় হয়নি বন্ধু। তখন আমরা আরও শান্তি ও উপাদেয় খাদ্য আশা করতে পারব।
ফাউস্ট : যখন আমি আলস্যভরে নির্জন শয্যায় শুয়ে থাকব তখন তুমি আমায় হয়ত সহজেই মিথ্যা মোহপ্রসারী তোষামোদে আমাকে তুষ্ট ও পার্থিব আনন্দের প্রলোভনে প্রলুব্ধ করতে পার, কারণ তখন আমার স্বাধীন বিচারবুদ্ধি কাজ করবে না। তবে সেই দিনই যেন আমার জীবনের শেষ দিন হয়। তারপর আর আমি বাঁচতে চাই না।
মেফিস্টোফেলিস : ঠিক আছে।
ফাউস্ট : আমি আনন্দে সে মুহূর্ত বরণ করে নেব। তবু একটু দেরি করো। তুমি বড় সুন্দর। তুমি প্রথমে আমাকে এক অনন্ত বন্ধনে আবদ্ধ করো। তারপর আমার মৃত্যুর দিন ঘোষণা করো। আমার মৃত্যুকালীন ঘন্টাধ্বনি বেজে উঠলেই আমার সেবাকার্য হতে মুক্ত হবে তুমি। কালের ঘড়ির কাঁটা ভেঙে যাবে, তার সব গতি স্তব্ধ হয়ে যাবে আমার কাছে।
মেফিস্টোফেলিস : ভালো করে ভেবে দেখো। আমার স্মৃতিশক্তি খুবই ভালো।
ফাউস্ট : এ বিষয়ে তোমার পূর্ণ অধিকার আছে। আমি কিন্তু আমার শক্তির মূল্যায়ন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেছি। হঠকারিতার সঙ্গে এ কাজ করিনি। আমি যাই করি না কেন, আমি আসলে একজন ক্রীতদাস। তোমার না অন্য কার সে বিষয়ে তর্ক করে লাভ নেই। যারই হই, আমি যেন এক ক্রীতদাস।
মেফিস্টোফেলিস : আজ তাহলে ডাক্তারের ভোজসভায় আমি চাকরের বেশে তোমার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকব। তবে একটা কথা, কোনও কিছুর ঝুঁকি না নিয়েই তুমি দু-এক ছত্র লিখে দিতে পার প্রতিশ্রুতি হিসাবে।
ফাউস্ট : অহঙ্কারী কোথাকার! তুমি আমার কাছে দলিল চাইছ, প্রতিশ্রুতি দাবি করছ? কোনও সত্যিকারের মানুষকে চেন না তুমি? তার কথার সত্যতার প্রমাণ কখনও পাওনি? আজ আমি যা বলছি ভবিষ্যতে তার কোনও নড়চড় হবে না। একথা কি যথেষ্ট নয়? তাছাড়া পৃথিবীতে কোনও কিছুই অক্ষয় নয়। নিরন্তর পরিবর্তনের যে স্রোত বয়ে চলেছে তাতে পৃথিবীর অনেক কিছুই পালটে যাচ্ছে। তুমি কি ভাব এই পরিবর্তনের স্রোতের মাঝে আমার প্রতিশ্রুতির বন্ধনটাই শুধু অক্ষয় হয়ে থাকবে? তবু ভ্রান্তি যায় না মন থেকে। সে ভ্রান্তি থেকে কে মুক্ত করবে আমাদের মনকে নিবিড় সত্যোপলব্ধির দ্বারা যাদের অন্তর নির্মল ও সুন্দর হয়ে ওঠে তারা সত্যই ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য। তাদের কাছে কোনও ত্যাগই দুঃখের নয়। মানুষের বলা কথা কি লিখিত প্রতিশ্রুতির কি দাম আছে? কলমের কালি শুকোতে না শুকোতেই প্রতিশ্রুত কথারা মরে যায়। শুধু তাদের প্রেমূর্তিগুলো জেগে থাকে কাগজের উপর। সে হীন শয়তান, চলো কি চাও আমার কাছ থেকে? মর্মর-প্রস্তর, চামড়ার কাগজ, না কাদামাটি? আমি তোমার উপর ছেড়ে দিচ্ছি নির্বাচনের ভার। বলো কি চাও?
মেফিস্টোফেলিস : কেন সঙ্গে সঙ্গে এত বেশি কথা বলে নিজেকে অকারণে উত্তপ্ত করে তুলছ? এই ধরনের চুক্তিপত্র লিখে রাখাই ভালো। এতে কাজ হয়। তবে তোমার নামটা কালির বদলে রক্ত দিয়ে সই করতে পার।
ফাউস্ট : যদি তুমি এতে খুশি হও তাহলে হাস্যকর হলেও এ কাজ আমি করব।
মেফিস্টোফেলিস : রক্ত হচ্ছে সবচেয়ে দামী ও বিরল বস্তুর নির্যাস।
ফাউস্ট : ভয় করো না, এ চুক্তির বন্ধন থেকে নিজেকে ছিন্ন করে নেব আমি। এ প্রতিশ্রুতি আমি বহু চেষ্টা করে করেছি। আমি নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অনেক উঁচু করে দেখবার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার আসল স্থান তোমার পাশে। কোনও দেবতা অপদেবতা আমার ডাকে সাড়া দেয়নি। নিষ্করুণ প্রকৃতি তার সব দ্বার রুদ্ধ করে দিয়েছে আমার সামনে। এতদিনের সঞ্চিত জ্ঞান এসেছে শুধু সীমাহীন বিতৃষ্ণা। চিন্তার সূত্র গেছে ছিঁড়ে। চলো, আমরা দুজনে আমাদের কামনা-বাসনার উচ্ছ্বসিত আবেগকে শান্ত করার জন্য ইন্দ্রিয়পরিতৃপ্তির গভীরে চলে যাই। অজানার অস্পষ্ট কুয়াশা ভেদ করতে করতে প্রতি মুহূর্তে মূর্ত হয়ে উঠবে এক একটি চমক। নর্তনশীল কালের অশান্ত স্রোতধারার ঘূর্ণিজটিল অবস্থার উন্মত্ত আবর্তের গভীরে ডুবে যাব আমরা। সুখ-দুঃখ জয়-পরাজয় ক্রমান্বয়ে সঙ্গ দান করবে আমাদের। অভিশ্রান্তভাবে কাজ করে যাওয়াই হলো মানুষের কাজ।
