মেফিস্টোফেলিস : তথাপি মৃত্যু এমনই একজন অতিথি যাকে শত কারণও সত্ত্বেও কোনো মানুষ অকুণ্ঠভাবে স্বাগত জানাতে পারে না।
ফাউস্ট : যে ব্যক্তি সত্যিই ভাগ্যবান, ভাগ্যদেবী যার উপর সুপ্রসন্ন হয়ে যার গলায় জয়ের মালা পরিয়ে দেন, সে ব্যক্তি নর্তনক্লান্ত অবস্থায় কোনও কুমারী যুবতীর সপ্রেম বাহুদ্বারা আলিঙ্গিত হয়। কিন্তু আমি কি জীবনের এই সব ভোগসুখ হতে বঞ্চিত রয়ে যাব? আমার অধীনস্থ অপদৈব শক্তি কি আমাকে এই সব ভোগ্য বস্তুত কিছু এনে না দিয়েই বিদায় নেবে?
মেফিস্টোফেলিস : কিন্তু সেদিন রাত্রিতে কোনও লোক কাছে পেয়েও মদ ছোঁয়নি।
ফাউস্ট : পরের গোপন কথা শোনা ও গোপন কাজ দেখায় তুমি আনন্দ পাও দেখছি।
মেফিস্টোফেলিস : আমি অবশ্য সর্বজ্ঞ নাই, তবু অনেকের অনেক কথাই আমি জানি।
ফাউস্ট : যেন কোনও পরিচিত এক মধুর কণ্ঠস্বর আমার মনকে যত সব অন্তর্দ্বন্দ্ব আর চিন্তার অশান্ত আলোড়ন হতে মুক্ত করে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে। শৈশবসুলভ কত বিশ্বাস ও আশা জাগিয়ে তুলছে তার মাঝে। তথাপি যে সব মিথ্যা আশার ছলনা আমার আত্মাকে স্বপ্নের ফাঁদে ফেলে পীড়িত করতে চায় তাদের আমি ধিক্কার দিই। মিথ্যা আশা বা স্বপ্নের উজ্জ্বল ছলনাজাল আমাদের মনকে শুধু এক নিবিড় বেদনার অন্ধকার গুহার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে। তাতে কোনও ফল হয় না। যে উচ্চাভিলাষ আমাদের মনকে বিভ্রান্ত করে তোলে আমি তাদের অভিশাপ দিই। যে সব ভুল আপাত উজ্জ্বল প্রলোভন আমাদের সূক্ষ্ম ও পরিমার্জিত অনুভূতির উপর আলোড়ন সৃষ্টি করে আমি তাদের ধিক্কার দিই। ধিক সেই সব নাম, যশ ও জয়ের স্বপ্নকে ভবিষ্যতে যা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আমাদের আয়ত্তাধীন বা অধিকৃত বস্তুরূপে অথবা আত্মীয় বা আপনজনরূপে যারা আমাদের প্রীত করতে চায় আমি তাদেরও ধিক্কার দিই। যে নিয়তি প্রভূত ধনরত্নের লোভ দেখিয়ে আমাদের উন্মত্ত কর্মচঞ্চলতার মধ্যে ঠেলে দেয় আমি তাকে যেমন ধিক্কার দিই, তেমনি আবার যে নিয়তি আমাদের আলস্যকে প্রশয় দেয়, তাকেও ধিক্কার দিই। উত্তম আঙ্গুরের যে মদ মানুষের মনকে তুরীয় লোকে নিয়ে যায়, মানুষের মনে প্রেমবোধ জাগায়, সে মদকেও ধিক। আশা ধর্মবিশ্বাস ধৈর্য সব কিছুকেই ধিক্কার দিই।
অদৃশ্য অপদেবতাদের সমবেত সঙ্গীত
ধিক ধিক তোমাকে! এই সুন্দর জগৎকে ধ্বংস করে দিয়েছ তুমি। তোমার মতো একটি অপদেবতার প্রচণ্ড দেহশক্তিসঞ্জাত আঘাতে যে জগত আজ বিধ্বস্ত। সে জগতের ছিন্নভিন্ন ধ্বংসাবশেষ শূন্যে বয়ে নিয়ে চলেছি আমরা। জগতের যে সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে, যে সৌন্দর্য আর কখনও ফিরবে না, সে সৌন্দর্যের জন্য দুঃখ না করে পারছি না। মানবজাতির হে শক্তিমান ভবিষ্যৎ বংশধরেরা, তোমার আবার নূতন করে সেই সুন্দর জগৎকে গড়ে তোলো। তোমাদের হাতে সুন্দরভাবে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠুক সে জগৎ। সেই অপরূপ সৌন্দর্যের জগৎ তোমরা তোমাদের বুকের মধ্যে গড়ে। তোলো। স্বচ্ছ নতুন বোধশক্তি সহকারে নতুন জীবন শুরু করো। দিকে দিকে ধ্বনিত হয়ে উঠুক নবজীবনের গান।
মেফিস্টোফেলিস : এরা সব নির্ভরযোগ্য এক-একটি শক্তি, এরা সবাই আমার সেবা করে। ওদের কথা শোনো। প্রতিটি কর্মে ও চিন্তায় ওদের পরামর্শ মেনে চললো। এই দ্বন্দ্বময় জগতে, তোমার নির্জন নির্বান্ধব জগতে তোমার বুদ্ধিবৃত্তি পদে পদে তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও ওরা তোমার ঠিকভাবে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। যে বেদনা যে যন্ত্রণা এতদিন ধরে তোমার বুকের ভিতরটা শকুনির মতো ছিঁড়ে খাচ্ছিল, সে বেদনা সে যন্ত্রণা চলে যাবে। আর পাঁচজনের মতো তুমিও একজন মানুষ। কিন্তু সে জনতাকে তুমি ঘৃণার চোখে দেখো তার মাঝে তোমাকে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না। আমি এমন কোনও মহান ব্যক্তি নই, তবু তুমি আমাকে সৎ নির্ভরযোগ্য এক বন্ধু হিসাবে বিশ্বাস করতে পার। আমি স্বেচ্ছায় সব সময় তোমার পাশে থেকে তোমাকে জীবনের পথে চালিত করব। যদি তুমি আমার কাজে তুষ্ট হও তাহলে আমি আজ থেকে সারা জীবন যত্ন ও সততার সঙ্গে তোমার সেবা করে যাব।
ফাউস্ট : তার জন্য আমার কি দিতে হবে তোমায়?
মেফিস্টোফেলিস : এখনও অনেক সময় আছে। এই মুহূর্তে তার জন্য জেদ করো না।
ফাউস্ট : না, না, সব শয়তানরাই আত্মকেন্দ্রিক। তারা অকারণে মানববিদ্বেষী হয় এবং কাউকেই সাহায্য করতে চায় না। তুমি কি চাও তা স্পষ্ট করে বলো। আমার ভয় হচ্ছে, এই ধরনের শয়তান ভৃত্য হতে অনেক বিপদ আসে।
ফাউস্ট : আমি ক্রীতদাসের মতো অক্লান্তভাবে তোমার সেবা করে যাব। তোমার প্রতিটি আদেশ পালন করে যাব। পরে যখন অন্যলোকে আবার আমাদের দেখা হবে, আমাদের মিলন ঘটবে, তুমি এমনি করে আমার সেবা করে যাবে।
ফাউস্ট : তোমার এই অন্যলোক কোনও বিকার সৃষ্টি করতে পারবে না। তুমি যদি এই জগৎ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দাও তাহলে সেই পরলোকে রইল বা না রইল একই কথা। এই জগতে আমাদের সকল আনন্দ-বেদনারই একটা কারণ বা উৎসদেশ আছে। সূর্য তার গতিপথে আমাদের যে আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়। এই জগৎ থেকে আমার জীবন যখন বিচ্ছিন্ন হবে চিরতরে তখন পরলোকে কি ঘটবে না ঘটবে তাতে আমার কিছু যাবে-আসবে না। আমি তখন কিছুই শুনতে বা দেখতে পাব না। তখন সেই পারলৌকিক জীবনে আমি ঘৃণা ভালোবাসা কি চাইব? পরজন্মে উচ্চ বা নীচ কোন বংশে জন্মগ্রহণ করব তা এখন ভাবার কোনও অর্থ হয় না।
